বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

অশ্বমেধের ঘোড়া বনাম এক নারীর লড়াই
সমৃদ্ধ দত্ত

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ৫০ বছরে পা দিল। ৫০ বছর ধরে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান এক চমকপ্রদ ঐতিহাসিক রেফারেন্স। বিশেষত পুরুষতান্ত্রিক ভারতীয় রাজনীতিতে এক নারী হিসেবে ক্রমে শীর্ষে পৌঁছনো প্রায় বিরল। আবার নরেন্দ্র মোদির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক জীবন ৩৯ বছরের। তবে তিনিও ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত। তাঁদের দুজনেরই রাজনৈতিক সাফল্য চমকপ্রদ। তাঁরা দুজনেই একক ক্ষমতা ও শক্তিতে মাস লিডার হয়ে উঠেছেন। তাঁদের কারও উত্থানের পিছনে পারিবারিক পেডিগ্রি 
অথবা পদবির ভূমিকা ছিল না। নিজের শক্তিতেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন। তাঁরা দুজনেই বিরোধীদের কাছে ঠিক যতটা নিন্দিত, ভক্তদের কাছে ততটাই জনপ্রিয়। রাজনৈতিক জীবনের বহু উত্থান পতন চড়া‌ই উতরাই পেরিয়ে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নরেন্দ্র মোদির কাছে অবশেষে হাজির হয়েছে ২০২৪ সাল। ভারতের দুই প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই দুই রাজনীতিকের লড়াই ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সবথেকে কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছে রাজনীতি এবং ইতিহাস সচেতন নাগরিক সমাজের কাছে। তাঁদের দুজনের কাছেই এই লোকসভা ভোট এক অগ্নিপরীক্ষা। 
নরেন্দ্র মোদি ১০ বছরের মধ্যে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন। বলা যেতে পারে তাঁর অশ্বমেধের ঘোড়া আসছে দেখতে পেলে রাজ্যে রাজ্যে প্রতিপক্ষদের মধেয এক চরম শঙ্কার সৃষ্টি হয়। অথচ এহেন অশ্বমেধের ঘোড়া বারংবার একজন নারীর কাছে এসে থেমে যাচ্ছে, স্তিমিত হচ্ছে। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোট থেকে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট। চারটি বৃহৎ সংসদীয় ভোটেই মোদির প্রভাব ও জনপ্রিয়তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গরিষ্ঠতা এবং আসন সংখ্যায় পরাস্ত করতে পারেনি। ২০২৪ সালের এই লোকসভা ভোটে মোদি যদি আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনায় কম আসন পেয়েই থেমে যান, সেটা বঙ্গবিজেপির কাছে তো বটেই, মোদির কাছেও এক বড়সড় হতাশাই নিয়ে আসবে। সেই হতাশা ২০২৬ সালের জন্য তাঁর দলের পক্ষে ইতিবাচক নয়। 
বয়সে চার বছরের বড় হলেও নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক কেরিয়ারের সময়সীমা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনায় কম। ১৯৭৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার একটি কলেজে প্রবেশ করেই ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। ছাত্র পরিষদের নেত্রী। মহিলা কংগ্রেসের রাজ্য নেত্রী হয়ে যান সাতের দশকেই। পক্ষান্তরে, ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘে যোগদান করে সামাজিক  কাজ শুরু করলেও, প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি আসেন ১৯৮৫ সালে। তাঁকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের পক্ষ থেকে পাঠানো হয় পাঁচ বছর বয়সি একটি রাজনৈতিক দলের সংগঠনের কাজে। সেই দলের নাম ভারতীয় জনতা পার্টি। 
তার আগে কি মোদি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার আগে এবং পরে তিনি ছিলেন অন্যতম এক সক্রিয় সঙ্ঘ কর্মী। এমনকী জরুরি অবস্থার সময় তিনি প্রায় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। মাথায় পাগড়ি পরে কখনও নরেন্দ্র সিং নাম নিয়েছেন, কখনও বা প্রকাশ নাম নিয়ে পুলিসের চোখে ধুলো দিয়ে জেলযাত্রা থেকে রক্ষা পেয়েছেন। যে ক’জন বিরোধী নেতা সেই সময় জেলের বাইরে ছিলেন তাঁদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করার কাজটিও করতেন নরেন্দ্র মোদি। সুতরাং কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য না হলেও তিনি রাজনীতির আবর্তেই ছিলেন। তবে প্রত্যক্ষভাবে ১৯৮৫ সালে বিজেপির সঙ্গী হওয়ার পর তিনি দ্রুত লালকৃষ্ণ আদবানির একটি তরুণ টিমের সদস্য হয়ে যান। ১৯৮৬ সালের পর আদবানি ঝকঝকে এবং করিতকর্মা যে যুব টিম তৈরি করেছিলেন নিজের অনুগামী হিসেছে, সেই দলে ছিলেন, অরুণ জেটলি, বেঙ্কাইয়া নাইডু, সুষমা স্বরাজ, গোবিন্দাচার্য, প্রমোদ মহাজন এবং নরেন্দ্র মোদি।
অর্থাৎ সঙ্ঘ থেকে বিজেপিতে এসেই দলের শীর্ষ নেতার নেকনজরে পড়ে যাওয়া। মোদির পরবর্তী এক দশকে শুধুই উত্থানের কাহিনি। গুজরাতে ছিলেন দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা। শংকর সিং বাঘেলা এবং কেশুভাই প্যাটেল। কিন্তু মোদি হয়ে উঠেছিলেন নিজের ক্যারিশমা আর জনপ্রিয়তা দিয়ে তৃতীয় পাওয়ার সেন্টার। তাঁর উত্থান আটকাতে এই সিনিয়র নেতারা প্রবল চেষ্টা করেছেন। দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে সাধারণ সম্পাদক করে। কিন্তু ২০০১ সালে তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী করে পাঠাতে হয় গুজরাতে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তিনি রাজনীতির কেরিয়ারে সর্বোচ্চ লক্ষ্য পূরণ করেছেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী হওয়া। 
অবিকল একই চিত্রনাট্য তার আগে থেকেই দেখেছে বাংলার কংগ্রেস রাজনীতি। রাজ্যে সোমেন মিত্র অথবা দিল্লিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়দের পাশাপাশি সম্পূর্ণ পৃথক এক ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কংগ্রেসের অন্দরে। কংগ্রেসের আন্দোলন মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অতএব যুব কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা সকলেই মমতাপন্থী হয়ে যান।
নরেন্দ্র মোদি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? মোদি যত শক্তিশালীই হন, তিনি বিজেপির ছত্রচ্ছায়ায় থেকে গিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরাট ঝুঁকি নিয়ে নিজের দল গড়েছেন। এবং নতুন দল গঠনের মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যান একক ক্ষমতায়। মোদি তিন বারের মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তিন বারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পদ মমতার পাওয়া হয়নি। অন্তত এখনও পর্যন্ত! 
ভারতীয় রাজনীতিতে ৫০ বছর ধরে কোনও নারীর টিকে যাওয়া বিশেষ চোখে পড়ে না। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৫৯ সালে কংগ্রেসের সভানেত্রী পদে এসে সক্রিয়ভাবে কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত পিতার রাজনীতি ও প্রশাসনিক ছায়াসঙ্গিনী। ১৯৮৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। কেরিয়ার ২৬ বছরের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি অনেক নারী উঠে এসেছিলেন। জয়ললিতা, মায়াবতী, বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া, শীলা দীক্ষিত, সুষমা স্বরাজ। যাঁরা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। বিশেষত মায়াবতী ও জয়ললিতা প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কিন্তু কালক্রমে প্রত্যেকেই বিভিন্ন কারণে আর ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে নেই। সোনিয়া গান্ধীর ১৯৯৯ সালে আগমন রাজনীতিতে। আজও তিনি সক্রিয়। কিন্তু তাঁর সময়কালে দুবার ক্ষমতায় আসা দল আজ ক্ষয়ের খাদের কিনারায়। 
 সাত বারের এমপি, একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, দুবার রেলমন্ত্রী, তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বর্তমানে তাবৎ সক্রিয় রাজনীতিকদের পার্থক্য হল, তিনি সবথেকে ভালো জানেন যে, একটি সরকার কীভাবে পরিচালিত হয়। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ 
প্রক্রিয়া কেমন। নয়ের দশক থেকে তিনি এসব সরকারের ভিতর থেকে দেখেছেন। ১০ বছর পর আজ মোদিও তাই। গুজরাত এবং ভারত সরকার পরিচালনা করে তিনিও সরকার চালানোর চাবিকাঠি জেনে গিয়েছেন। 
প্রশাসনিকভাবে এই দুজন সম্পূর্ণ সফল কি না সেই তর্ক ও বিতর্ক চলবে। তাঁদের বহু দুর্বলতা ও ব্যর্থতা রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁদেরই একমাত্র একটি ক্যাপটিভ অডিয়েন্স আছে।  ভক্ত এবং নিবেদিত ভোটার।  এই দুজন আর কাউকে দেখিয়ে ভোট 
চান না। নবীনবাবু বিজু পট্টনায়কের পুত্র। 
স্ট্যালিন করুণানিধির রেখে যাওয়া রাজ্যপাটের উত্তরাধিকার। তেজস্বী যাদব লালুপ্রসাদ যাদবের উত্তরসূরি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নরেন্দ্র মোদিরা নিজেদের দেখিয়ে ভোট চান। তাঁরাই ক্রাউড পুলার। তাঁরাই প্রধান সেনাপতি। তাঁরাই স্টার ক্যাম্পেনার। তাঁদের কোনও হাইকমান্ড ঩নেই। তাঁরাই দল। তাঁরাই নীতি নির্ধারক। 
তাই ক্রমেই মোদি বনাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াই সবথেকে আকর্ষক হয়ে উঠেছে ২০২৪ সালের ভোটে। ১৯৮৪ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অসংখ্য পুরুষ প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে চলেছেন। তাঁর চোখের সামনে সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেসের বহু সেনাপতির অবসান ঘটেছে। তিনি রয়ে গিয়েছেন। অতএব তাঁকে আন্ডারএস্টিমেট করা চরম নির্বুদ্ধিতা। বারংবার সেই প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে।
যে বাংলা  শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জন্মস্থান, সেখানে আজ পর্যন্ত বিজেপি এক নম্বর দল হতে পারল না, এটা বিজেপির দীর্ঘকালের এক অনুতাপ। আবার মোদি রাজ্যে রাজ্যে বিজয়কেতন উড়িয়ে চলেছেন, অথচ বাংলা নামক একটি রাজ্যের এক নারীর কাছে বারংবার থমকে যাচ্ছেন, এটাও তাঁর নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারের জন্য সম্মানহানি। বাংলা কি তাঁর অধরাই থেকে যাবে? সুতরাং তিনি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছেন। 
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এতদিন ধরে যে শক্তি প্রদর্শন করে এসেছেন, সেটা রক্ষা করাই তাঁর চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ মোদি বনাম মমতা যুদ্ধে মমতাই জয়ী হয়েছেন বারংবার, এই ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া। কিন্তু শুধুই তাই নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এই লোকসভা ভোট বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তাঁর প্রধান লক্ষ্য, দেশের আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে সবথেকে বেশি আসন পাওয়া। সেক্ষেত্রে ক্ষমতায় যেই আসুক, আগামী পাঁচ বছর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পাবে। আর মোদির শেষ প্রচেষ্টা তাঁর অবসরের আগে একবার অন্তত যেন বাংলা জয় করা সম্ভব হয়! 
নরেন্দ্র মোদির অশ্বমেধের ঘোড়া বনাম এক নারীর লড়াইয়ে এবার জয় কার হবে? 

12th     April,   2024
 
 
অক্ষয় তৃতীয়া ১৪৩১
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ