বিশেষ নিবন্ধ

জুটির লড়াই: মোদি-শাহ বনাম রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
সমৃদ্ধ দত্ত

নেহরু-প্যাটেল থেকে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। বাজপেয়ি-আদবানি থেকে মোদি-শাহ। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম চিত্তাকর্ষক প্রবণতা হল একটি করে রাজনৈতিক জুটির আবির্ভাব হওয়া এবং তাঁদের একজোট হয়ে দেশ পরিচালনা অথবা রাজনীতিকে প্রভাবিত করা।  স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৭৭ বছরে বারংবার দেখা গিয়েছে এরকম নানাবিধ রাজনৈতিক যুগলবন্দি। 
যাঁদের নাম বলা হল, তাঁদের পাশাপাশি ভারতে একাধিকবার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক অভিঘাত নিয়ে এসেছে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক জুটি। সবথেকে বিপজ্জনক জুটি কয়েক বছরের জন্য দেখা দিয়েছিল সাতের দশকে। ইন্দিরা গান্ধী-সঞ্জয় গান্ধী। তাঁরা আদৌ প্রথম থেকে রাজনৈতিক জুটি ছিলেন না। কিন্তু ১৯৭৪ সালের পর থেকে অন্ধ মাতৃস্নেহে ইন্দিরা গান্ধী সঞ্জয় গান্ধীকে অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে অতি অধিকার দিয়ে ফেলায় তার পরিণাম পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে ভোগ করেছেন। এই জুটি ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যা যা করেছেন অথবা করার চেষ্টা করেছেন, সেগুলির মধ্যে যেমন বহু ভালো উদ্দেশ্য ছিল, তেমনই আবার ভারতের ভাগ্য বদলে দিয়ে স্থায়ীভাবে স্বৈরতন্ত্র কায়েমের প্ল্যানও নেওয়া হয়েছিল। অন্যতম উদারহণ হল, জরুরি অবস্থা চলাকালীন একবার ১৯৭৬ সালের শেষার্ধে সঞ্জয় গান্ধী নিজের মাকে বলেছিলেন, এসব নির্বাচন টির্বাচন বাতিল করে দিতে। সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় ব্যবস্থা বন্ধ করে পার্লামেন্টকে সংবিধান সভায় পরিণত করা হোক। আর ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে আজীবনের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে দিন। একটি রিপোর্টও তৈরি হয়েছিল। যে রিপোর্ট লিখেছিলেন এ আর আন্তুলে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। এতটা বাড়াবাড়ি করতে চাননি। বরং কিছু এক অজ্ঞাত কারণে ১৯৭৬ সালের শেষ থেকেই তিনি নির্বাচনের একটা তোড়জোড় করছিলেন। কারণ, তাঁকে তাঁর অফিসাররা বলেছিলেন, দেশবাসী নাকি তাঁর কাজে সাংঘাতিক খুশি। অতএব ভোট হলে তিনি বিপুলভাবে জয়ী হবেন। অতএব বিরোধীদের জেল থেকে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ভারতের গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলার অপরাধে ভারতবাসী তাঁকে পরাস্ত করে। 
আবার জননেতা নয় কেউই, ব্যক্তিগত গ্ল্যামার অথবা ক্যারিশমায় দলকে জিতিয়ে দেবেন একাই, এরকম জনপ্রিয়তাও নেই কারও, তথাপি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক জুটির নাম নরসিমা রাও-মনমোহন সিং। তাঁরা দুজনে ১৯৯১ সালে এমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সংখ্যালঘু সরকার হয়েও। ভারতের অর্থনীতির দরজা খুলে দিয়েছিলেন উদারীকরণের হাওয়ায়। বস্তুত আজ আমরা আন্তর্জাতিকতা ও প্রযুক্তির যতরকম আধুনিক সুবিধা পাচ্ছি, তার জন্মদাতা মনমোহন সিং-নরসিমা রাওয়ের জুটি। 
১৯৪০ সালের জুলা‌ই মাসে বম্বে এসে জওহরলাল নেহরু কংগ্রেস কর্মীদের সম্মেলনে কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, সর্দার প্যাটেলের বিরুদ্ধাচারণ আমি সহ্য করব না। সর্দারের সঙ্গে সবরকম সহযোগিতা করবেন আপনারা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্য পেতে হলে ভারতের দরকার প্যাটেলের নেতৃত্ব। 
আবার তারও আগে ১৯৩৬ সালের আগস্টে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের পর গান্ধীজিকে বল্লভভাই প্যাটেল চিঠি লিখে বলেছিলেন, এই যে ইস্তাহার তৈরি হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ জওহরলাল করেছেন। এটা এক বিশেষ কৃতিত্ব। ওয়ার্কিং কমিটির কাজটা জওহরলাল এমনই অসাধারণ করেছেন ঩যে, আমাদের কারও তাঁর আনা বিষয়গুলিকে মেনে নিয়ে একমত হতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। 
দেশের ১৩ রাজ্যের প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি চেয়েছিল প্যাটেল হন দলের সভাপতি। কিন্তু গান্ধীজি চেয়েছিলেন নেহরুকে। একদিকে মৌলানা আজাদকে প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করানো হল। আবার প্যাটেলকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল প্রায় গান্ধীজির প্ল্যানে। কেন? কারণ, প্যাটেল সভাপতি হওয়ার অর্থ অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান ও স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হবেন প্যাটেল। যা গান্ধীজি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন নেহরুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। প্যাটেলকে দেখতে চেয়েছিলেন দেশের সুরক্ষা সমন্বয় এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার সেনাপতি রূপে। প্যাটেল কি ক্ষুণ্ণ হননি? নিশ্চয়ই হয়েছেন। কিন্তু মেনে নিয়েছেন বাপুর ইচ্ছা। জওহরলালের প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ও মিত্রতা সামান্য কমেনি। 
বাজপেয়ি ছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির উদার নীতির মুখ। আর আদবানি ছিলেন কট্টরপন্থী আরএসএস, জনসঙ্ঘ, বিজেপির আদি অকৃত্রিম এজেন্ডা প্রতিষ্ঠাকারী। বহু বার তাঁদের মধ্যে নীতি নির্ধারণ নিয়ে মতান্তর হয়েছে। কিন্তু সম্পর্ক তিক্ত হয়নি। সর্বশেষ যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল ২০০২ সালে। গুজরাত দাঙ্গার দায় মাথায় নিয়ে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করুন। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির মনোবাসনা ছিল এরকমই। কিন্তু গুজরাতের সেই মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ বন্ধু ছিলেন অরুণ জেটলি। আর আদবানি ছিলেন রাজনৈতিক গুরু। দিল্লি থেকে আমেদাবাদ যাওয়ার পথে  জেটলি আদবানিকে বুঝিয়েছিলেন যে, এভাবে নরেন্দ্র মোদিকে পদত্যাগ করতে বলা হলে বিরোধীরা অনেক বেশি সুবিধা পেয়ে যাবে। আর হঠাৎ গুজরাতে একটা শূন্যতা তৈরি হবে। তাই এটা সঠিক হবে না। আদবানিও এতটা কঠোর হতে চাননি। কিন্তু বাজপেয়ি এই নরম মনোভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। তবু বাজপেয়ি ও আদবানির পারস্পরিক সম্পর্কে মালিন্য আসেনি। 
২০০২ সাল থেকে গুজরাত দেখেছে, ২০১৪ সাল থেকে ভারত দেখছে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের জুটির কার্যকলাপ। দেশ পরিচালনায় তাঁদের নীতি নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় কেউ খুশি, কেউ ক্রুদ্ধ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই জুটির মধ্যে কোনও বিভেদ আসেনি। সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ হল, তাঁদের কোনও চ্যালেঞ্জারই ছিল না ১০ বছরে। বিরোধীরা ছিল ছত্রভঙ্গ। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাই তাঁদের বারংবার রুখে দিয়েছেন। নবীনবাবু ছিলেন ওড়িশায়। তাঁর প্রতিরোধ এবার ভেঙে পড়ল। সবথেকে বেহাল দশা কংগ্রেসের। 
দেশবাসীর একাংশ ধরেই নিচ্ছিল যে, বিজেপির ‘কংগ্রেস মুক্ত ভারত’ স্লোগান এবার হয়তো কিছু বছরের মধ্যেই বাস্তবায়িত হয়ে যাবে। অতি আত্মবিশ্বাস কখনও ঔদ্ধত্যের জন্ম দেয়। তৃণমূলস্তরে কাজ করে আসা নরেন্দ্র মোদি কীভাবে এই দম্ভ ও দর্পের ফাঁদে পড়লেন, সেটা এক রহস্য। তিনি যে তার ফলাফল পেলেন এবারের লোকসভা ভোটে, সেটা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য হলেও তার থেকেও অনেক বৃহৎ এক রাজনৈতিক নব ইতিহাসের জন্ম হতে চলেছে। সেটি হল, অপরাজেয় মোদি-শাহ জুটির চ্যালেঞ্জার হিসেবে ২০২৪ সালে আবির্ভূত হয়েছে আর একটি জুটি। রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। 
যে রাহুল গান্ধীকে পাপ্পু বলে অভিহিত করে হাসিঠাট্টা করে এসেছে বিজেপি নেতাকর্মীরা, আজ তিনি আচমকা কঠোর পরিশ্রমের আশাতীত সাফল্য পেলেন। ৪ হাজার কিলোমিটার পদযাত্রা। ভারতসফর। ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ্য করেও দাঁতে দাঁত চেপে মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকেছেন। রাহুল গান্ধীকে দেখে যে শিক্ষাটি প্রতিটি ভারতবাসীর আত্মস্থ করা দরকার, সেটি হল, শতবার পরাস্ত হয়ে, অসংখ্য ব্যর্থতার শিকার হয়ে, চরম ব্যঙ্গ আর সমালোচনায় বিদ্ধ হলেও ফোকাস থেকে সরে না আসা। এবং ময়দান ছেড়ে না পালানো। অর্থাৎ পরিশ্রমের বিকল্প নেই। 
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দেশজুড়ে প্রচার করেছেন। কিন্তু তাঁর পাখির চোখ ছিল একটিই। আমেথি জয় করে আবার গান্ধী পরিবারের হৃতসম্মান ফিরিয়ে আনা। ২০১৯ সালে আমেথিতে রাহুল গান্ধী পরাস্ত হন স্মৃতি ইরানির কাছে। তারপর থেকে বহু অপমান অসম্মান সহ্য করেছে গান্ধী পরিবার বিজেপির কাছে। এবার একজন সাধারণ কংগ্রেস নেতাকে আমেথি থেকে জিতিয়ে এনে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাহুল গান্ধীরা মধুর প্রতিশোধ নিলেন। উত্তরপ্রদেশের ফুরসৎগঞ্জ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের আমেথির গ্রামে  তাঁর প্রচার সভা দেখতে গিয়ে মে মাসে অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিলাম উত্তরপ্রদেশের অসহনীয় তাপপ্রবাহের মধ্যে। জগদীশপুর পঞ্চায়েত থেকে আসা দেহাতি মহিলারা প্রিয়াঙ্কার হাত ধরে কেঁদে ফেলে বলেছিলেন, ইন্দিরাজিকে আবার দেখতে পেলাম তোমার মধ্যে। ইন্দিরাজিকে প্রধানমন্ত্রী দেখেছি। মরার আগে তোমাকেও দেখতে চাই! 
নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের সবথেকে বড় সমস্যা হল তাঁদের তূণে আর বেশি অস্ত্র নেই। সিংহভাগ ব্যবহার করা হয়ে গিয়েছে এবারের লোকসভা ভোটে। ধর্ম, এজেন্সি, জনকল্যাণ, হিন্দু মুসলমান। একসঙ্গে এত অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বহু রাজ্যে। আবার পক্ষান্তরে কংগ্রেস তথা রাহুল-প্রিয়াঙ্কার উত্থানে একটা নতুন আকর্ষণের জন্ম হয়েছে। সর্বোপরি মোদিকে যে হারানো যায়, মোদি যে দুর্বল হতে পারেন, মোদি যে গরিষ্ঠতাহীন সরকার চালাতে বাধ্য হতে পারেন, এসবই আজ থেকে এক মাস আগে ভাবাই যেত না। চোখের সামনে এখন কিন্তু সেই সবই ঘটছে। অতএব লক্ষণীয়, মোদি-শাহের ইমেজ অনেকটাই দুর্বল তথা নিম্নগামী হয়েছে। আর রাহুল-প্রিয়াঙ্কার ইমেজ ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। মোদি-শাহের সব ফর্মুলা ফ্লপ করেছে। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার ফর্মুলা সাফল্য পেয়েছে। 
কেরলের ওয়েনাড় থেকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী লোকসভার উপ নির্বাচনে জিতে এলে এই রাজনৈতিক যুগলবন্দি আরও শক্তিশালী হবে। পার্লামেন্টের মধ্যে একদিকে মোদি-শাহ। আর তাঁদের ঠিক উল্টোদিকে বিরোধী আসনে বসে আছেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। সরকারে মোদি-শাহ। বিরোধিতায় রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। এই গোটা দৃশ্যাবলী এক নতুন টানটান রাজনৈতিক ইতিহাসের অধ্যায় নির্মাণ করবে। জুটি বনাম জুটি। 
যে গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক সন্ন্যাস ও নির্বাসনই ছিল মোদি ও শাহের প্রধানতম উচ্চাভিলাষ, আজ সেই গান্ধী পরিবারের নবতম দুই সদস্য, রাজনৈতিক যুগলবন্দি হিসেবে মোদি ও শাহের কেরিয়ারে সবথেকে বড় ধাক্কা দিয়েছেন। আগামী পাঁচ বছর মোদি-শাহ দুর্বলতর চ্যাম্পিয়ন। আর রাহুল-প্রিয়াঙ্কা শক্তিশালী চ্যালেঞ্জার। এরকম চূড়ান্ত আকর্ষণীয় রাজনৈতিক সংগ্রামের সাক্ষী বহু বছর ভারত হয়নি। 
29d ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

গুরুজনের থেকে অর্থকড়ি লাভ হতে পারে। স্বার্থান্বেষী আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলুন। মনে চাঞ্চল্য।...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার৮২.৮১ টাকা৮৪.৫৫ টাকা
পাউন্ড১০৬.৫৫ টাকা১১০.০৬ টাকা
ইউরো৮৯.৫৫ টাকা৯২.৭১ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
দিন পঞ্জিকা