Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

হারানো রান্নার গল্প

চলছে রান্নাবান্নার গল্প আর রেসিপি নিয়ে বিভাগ হারানো রান্নার গল্প। এই বিভাগে একটি পদ বিষয়ে একটা গল্প শোনান রন্ধন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শুভজিৎ ভট্টাচার্য, সঙ্গে থাকছে সেই রান্নাটির রেসিপি। আজকের পর্বে দু’টি পদ, ইলিশের উল্লাস ও ইলিশের ননীবাহার।

হারানো রান্নার গল্প
  • ১২ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

চলছে রান্নাবান্নার গল্প আর রেসিপি নিয়ে বিভাগ হারানো রান্নার গল্প। এই বিভাগে একটি পদ বিষয়ে একটা গল্প শোনান রন্ধন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শুভজিৎ ভট্টাচার্য, সঙ্গে থাকছে সেই রান্নাটির রেসিপি। আজকের পর্বে দু’টি পদ, ইলিশের উল্লাস ও ইলিশের ননীবাহার।

Advertisement

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত বাঙালি। এছাড়াও পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন তাঁরা। এই বাঙালি জাতিকে একই সূত্রে বেঁধেছে একটি মাছ— ইলিশ। এই মাছ কেন্দ্র করে বাঙালির আবেগের শেষ নেই। কত সাহিত্য রচনা হয়েছে এই মাছ ঘিরে। আর এই মাছটি তো অমর হয়ে রয়েছে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর কালজয়ী কবিতা ‘ইলিশ’-এর মাধ্যমে। ইলিশ বাঙালির ঐতিহ্যের অঙ্গ। ইলিশের এই রেসিপিটি বহু প্রাচীনকালে রেডিও মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময় রেডিওতে বেলা দে রান্নার রেসিপি শেখাতেন। সেই রেসিপি থেকেই নেওয়া এই রান্না। তবে এর আবার রন্ধন পদ্ধতির কয়েকটি ধরন রয়েছে। কেউ রসুনের বদলে চাকা করে কাটা পেঁয়াজ ব্যবহার করেন। অনেকেই হয়তো ভাবছেন ইলিশ মাছে পেঁয়াজ রসুনের ব্যবহারে তার স্বাদ মার খাবে। কিন্তু না, এই রান্না এমনই যা ভিন্ন স্বাদের হলেও অনবদ্য।  

ইলিশের উল্লাস

উপকরণ: ইলিশ মাছ ৭৫০ গ্রাম (৫-৬ টুকরো), ভিনিগার ৬ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়ো স্বাদ মতো, সর্ষে বাটা ৪ টেবিল চামচ, শুকনো লঙ্কা ৮টা, রসুন ১২-১৪ কোয়া, নুন স্বাদ মতো, সর্ষের তেল ৭ টেবিল চামচ।

পদ্ধতি: মাছের টুকরো শুধু নুন দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিন। এরপর শুকনো লঙ্কা, রসুন, হলুদ, নুন আর সর্ষে বাটা একসঙ্গে মিক্সিতে বেটে নিয়ে একট মিশ্রণ তৈরি করুন। এই মিশ্রণে জল দেবেন না, ভিনিগার দিয়ে বেটে নিন। এই যে বাটার সময় ভিনিগারের ব্যবহার, এটাই ইলিশের উল্লাস রেসিপির বিশেষত্ব। বাটা হয়ে গেলে মিশ্রণে একেবারে যৎসামান্য জল মিশিয়ে নিন। এবার একটা ছড়ানো কানা উঁচু পাত্র নিন। আঁচে বসানোর আগেই সেই পাত্রে এই মিশ্রণ ঢেলে দিন। এরপর তাতে তেল মিশিয়ে দিন। এবং তা হাতের সাহায্যে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। তেলের সঙ্গে মশলার মিশ্রণ মিশে গেলে তাতে মাছ দিয়ে দিন। এবং তা এই মশলার মিশ্রণে উল্টেপাল্টে মাখিয়ে নিন। এরপর পাত্রটি আঁচে বসান ও ঢাকা দিয়ে দিন। কিন্তু গোটা রান্নাই হবে খুব কম আঁচে। ঢাকা পাত্রে ভাপেই রান্না হয়ে যাবে মাছ। আর তাতেই খোলতাই হবে এর স্বাদ। ঝোল একটু গামাখা হলে এবং মাছ সেদ্ধ হলে নামিয়ে সাদা ভাত সহযোগে পরিবেশন করুন।

এবার আসি ইলিশের আর একটি রান্নায়। ইন্দ্রাণী দে নামটা আমাদের কাছে পরিচিত নয়। কিন্তু তাঁর বংশপরিচয় অবশ্যই আমাদের আজকের পর্বের দ্বিতীয় রেসিপিটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকানিবাসী ইন্দ্রাণীর বাবা, স্বর্গীয় অনামীপ্রসাদ রায়চৌধুরী ছিলেন গাজিপুর জেলার কাসিমপুর পরগনার শেষ জমিদার। তিনি আবার ছিলেন খুবই খাদ্যরসিক ও সুরাঁধুনি। তাঁর কাছেই শেখা একটি রান্নার কথা ইন্দ্রাণী আমাদের জানালেন। নামটিও ভারী সুন্দর, ইলিশের ননীবাহার। রান্নাটি ইলিশ মাছ দিয়ে তৈরি বটে, কিন্তু এতে রয়েছে বিদেশি নানা উপকরণ। দেখতেও তা সাদাটে। আমাদের রান্নার সঙ্গে বিদেশি উপকরণের মিলমিশে নানা ধরনের ফিউশন তৈরি হয়েছিল একটা সময়। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ঘরানার রান্নার সম্পূর্ণই সেই মিলমিশের গল্প বলে। কিন্তু সেইসব পদের বাইরেও এমন অনেক রান্না তৈরি হয়েছে যা হয়তো শুধুই মানুষের মনে থেকে গিয়েছে, কোনও ভিন্ন অধ্যায় তৈরি করতে পারেনি। ইলিশের ননীবাহার এমনই একটি পদ।  চলুন সেই রন্ধন প্রণালী আপনাদের শিখিয়ে দিই।

ইলিশের ননীবাহার

উপকরণ: ইলিশ মাছ ৭ টুকরো, দুধ ২০০ মিলি, নুন স্বাদমতো, গোলমরিচ স্বাদ অনুযায়ী, মাখন ৩০ গ্রাম, ফ্রেশ ক্রিম ২৫০ মিলি, কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি মাঝখান থেকে লম্বালম্বি চিরে নেওয়া। 

পদ্ধতি: প্রথমে মাছে নুন আর গোলমরিচ মাখিয়ে নিন। তা অল্পক্ষণ রেখে দিন। তারপর একটা ছড়ানো অথচ কানা উঁচু প্যানে মাখন গরম করে গলিয়ে নিন। এবার তাতে কাঁচা লঙ্কাগুলো দিয়ে দিন। একটু ফাটতে শুরু করলে তাতে মাছগুলো এপিঠ ওপিঠ করে হালকা ভেজে নিন। মনে রাখবেন ইলিশ মাছ কিন্তু কড়া করে ভাজবেন না। তাহলে মাছের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। এইভাবে মাছ ভেজে নিয়ে তার উপর দুধ ঢেলে দিন। দুধ খানিকটা ফুটে গেলে দিয়ে দিন ফেটিয়ে রাখা ফ্রেশ ক্রিম। ইন্দ্রাণীর বাবা অবশ্য ক্রিমের ব্যবহার জানতেন না। বরং আগের দিন গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে রেখে সেই দুধের মালাই বা ননী ব্যবহার করতেন রান্নায়। সেই থেকেই রান্নার এমন নামকরণ। এরপর স্বাদমতো নুন ও গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। এবার আঁচ সামান্য বাড়িয়ে পাত্রটি ঢাকা দিয়ে রান্না হতে দিন মিনিট পাঁচেক। তারপর ঢাকা খুলে আঁচ বন্ধ করে তা পরিবেশন করুন গোবিন্দভোগ চালের ভাতের সঙ্গে।  

সম্পর্কিত সংবাদ