কলেজ স্ট্রিটে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল-এর পিছনের রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগলেই পৌঁছাবেন আর এক রাস্তায়। কলকাতা কর্পোরেশনের খাতায় সে রাস্তার নাম রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট। তারই ৬/৩ নম্বরে ছিল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস। বিশ্ব জুড়ে তখন যুদ্ধ পরিস্থিতি। উত্তাল দেশ-নগর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবহের মধ্যেই ১৯১৭ সালে নন্দলাল দত্ত তৈরি করলেন এই বোর্ডিং হাউস। কেবল থাকার জন্যই নয়, বোর্ডারদের খাওয়াদাওয়ারও ব্যবস্থা ছিল সেখানে। প্রথম থেকেই এই বোর্ডিং হাউসের রান্নার বেশ সুখ্যাতি। চারপাশে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের ছাত্র-শিক্ষকদের ভিড়ে খাওয়ার জায়গা গমগম করত। হোস্টেলের একঘেয়ে খাবার মুখে না রুচলেই তাঁরা এসে ভিড় জমাতেন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের খাবার ঘরে। ১৯১৯ সালে মুঙ্গের থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করতে এলেন সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। উঠলেন এই বোর্ডিং হাউসে। এখানে বসেই শুরু হল তাঁর ‘ব্যোমকেশ’-এর খসড়া লেখা। পরবর্তীতে এখানে থেকেছেন কবি জীবনানন্দ দাশও। এই বোর্ডিং হাউসের খাবার তিনিও পছন্দ করতেন। আটের দশকে উঠে গেল বোর্ডিং। কলেজ স্ট্রিট এলাকার সাবেক স্মৃতি বুকে দাঁড়িয়ে রইল বাড়িটি। ১৯৯১ সালে এই বোর্ডিং হাউসের বাড়িতেই পাইস হোটেল ‘মহল’ শুরু করলেন নন্দলালের নাতি সন্দীপ দত্ত। এবার আর থাকা নয়, শুধুই খাওয়ার ব্যবস্থা। তবে রান্নার সুখ্যাতি একই রইল! এখনও প্রতিদিন শতাধিক লোকের পাত পড়ে এখানে। বইপাড়ার কর্মী থেকে ছাত্রছাত্রী, মেডিকেলের ডাক্তার থেকে রোগীর পরিজন, স্থানীয় অফিসের হোমড়াচোমড়া বস থেকে ফুটের ব্যবসার কেরানি, সকলেরই শ্রেণিহীন সহাবস্থান এই পাইস হোটেলে। মহল-এর দুই বিখ্যাত পদের রেসিপি দিলেন এখানকার ২২ বছরের পুরানো কর্মী, রাঁধুনি বুলু মণ্ডল।
বাটা মশলার মাংসের ঝোল
উপকরণ: খাসির মাংস ১ কেজি, পেঁয়াজ বাটা ৪০০ গ্রাম, কুচানো পেঁয়াজ ৩০০ গ্রাম, আদা বাটা ৮০ গ্রাম, রশুন বাটা ৪০ গ্রাম, হলুদ বাটা ৪০ গ্রাম, শুকনো লংকা বাটা ৪০ গ্রাম, জিরে বাটা ৩০ গ্রাম, ধনে বাটা ৩০ গ্রাম, ছোটো এলাচ গোটা ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, দারচিনি ৪টি কাঠি, তেজপাতা ১টি, নুন-চিনি স্বাদমতো, আলু ৫০০ গ্রাম। সর্ষের তেল ১৫০-২০০ মিলি।
প্রণালী: মাংস ধুয়ে নুন ও হলুদ মাখিয়ে ম্যারিনেট করে রাখুন। আলুর গায়েও নুন-হলুদ মাখিয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে তুলে রাখুন। ওই তেলেই তেজপাতা ও গোটা গরমমশলাগুলো দিয়ে দিন। একটু গন্ধ বেরতে শুরু করলেই কুচানো পেঁয়াজ যোগ করুন। অল্প নুন দিন। পেঁয়াজ অল্প লালচে হয়ে এলেই তার মধ্যে বাটা পেঁয়াজ যোগ করুন। এরপর একে একে আদা বাটা, রশুন বাটা, শুকনো লংকা বাটা যোগ করুন। একটু নেড়ে মশলা কষিয়ে তাতে জিরে বাটা, হলুদ বাটা ও ধনে বাটাও যোগ করে দিন। এবার ভালো করে মশলা কষাতে থাকুন। তেল ছাড়া অবধি অপেক্ষা করুন। এই সময় নুন ও চিনি মেশান। ফের একটু কষিয়ে এর মধ্যে ম্যারিনেট করা মাংস যোগ করুন। এবার মশলার সঙ্গে মাংস কষাতে শুরু করুন। প্রয়োজন বুঝলে অল্প অল্প করে গরম জল যোগ করুন। একসময় তেল উপরের দিকে ভালো করে ভেসে উঠবে। তখন ভেজে রাখা আলু যোগ করুন। কতটা ঝোল রাখবেন সেই বুঝে গরম জল যোগ করুন। মাঝারি আঁচে ঢাকা দিয়ে সেদ্ধ হতে দিন। ভালো মানের মাংস হলে ৪৫ মিনিট আঁচে রাখলেই সুসিদ্ধ হয়ে যাবে। ‘মহল’ এই রান্নায় টক দই বা টম্যাটোর ব্যবহার করে না। ঢাকা খুলে মাংস ও আলু সেদ্ধ হয়ে গিয়েছে দেখলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে খেতে দিন।
স্টিমড কাতলা
সহজপাচ্য, স্বাদু এই রান্নাটি রাঁধতে সময় কম লাগে। কাতলার পেটি দিয়ে বানালে স্বাদ বেশি খোলতাই হয়। তবে বাড়িতে পেটি বা গাদা যেকোনো টুকরো দিয়েই রাঁধতে পারেন।
উপকরণ: কাতলা মাছের পেটি ১০ টা, পোস্তবাটা ৫০ গ্রাম, কালো সর্ষে ২৫ গ্রাম, সাদা সর্ষে ২৫ গ্রাম, কাঁচালংকা বাটা ২০ গ্রাম, নারকেল বাটা ৫০ গ্রাম, টক দই ১০০ গ্রাম, কালোজিরে ১ চামচ, সর্ষের তেল ১০০ মিলি, নুন স্বাদ অনুযায়ী, হলুদ ১ চামচ।
প্রণালী: কাতলা মাছ ভালো করে ধুয়ে নুন-হলুদ ও অল্প সর্ষের তেল দিয়ে মাছ মেখে আধ ঘণ্টা রেখে দিন। মাছের গায়ে তেল মাখিয়ে নিলে তেলে মাছ বেশি ফাটে না ও ওলটানো সহজ হয়। এবার কড়ায় তেল গরম করে মাছ তেলে দিয়ে একটু সাঁতলেই নামিয়ে নিতে হবে। মাছ না ভেজে করাই এই রান্নার দস্তুর। তবে বাড়িতে করলে অল্প তেলে সাঁতলে নিতে পারেন। এবার শিলনোড়ায় সর্ষে ও কাঁচালংকা নুন সহ মিহি করে বেটে নিন। একইভাবে পোস্ত ও কাঁচালঙ্কাও নুন সহ মিহি করে বাটবেন। এবার কড়ায় মাছ সাঁতলানো তেলের মধ্যেই কালোজিরে ফোড়ন দিন। এবার তাতে প্রথমে সর্ষে বাটা দিন। একটু নাড়িয়ে পোস্ত বাটা যোগ করুন। একটু নেড়েই নারকেল বাটা ও ফেটানো টক দই যোগ করুন। ভালো করে নেড়েচেড়ে নিয়ে তার উপর মাছের টুকরোগুলো দিয়ে দিন। উপর থেকে মাছের গায়ে আরও একটু সর্ষে-পোস্ত বাটা দিন। কতটা ঝোল রাখবেন, সেই অনুযায়ী গরম জল যোগ করুন। এই সময় নুন চেখে দেখে প্রয়োজনে আর একটু নুন যোগ করে দিতে পারেন। এবার ঢিমে আঁচে দমে বসিয়ে দিন মিনিট ২০-২৫-এর জন্য। নামানোর আগে উপর থেকে লেবুর রস ও কাঁচা তেল অল্প ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। এই রান্নায় কাঁচা পোস্তর একটু গন্ধ থাকে। সেটিই এই পদকে আরও মোহময় করে তোলে।
মনীষা মুখোপাধ্যায় ছবি: শুভজিৎ মণ্ডল