দেশের আকাশে নতুন নক্ষত্র তিনি। এই বঙ্গ তাঁকে নিয়ে গর্বিত নিজের মাটির কন্যে বলে। তিনি মহিলা ক্রিকেটদলের বিশ্বকাপ জয়ের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রিচা ঘোষ। লিখছেন সায়নদীপ ঘোষ।
দেশের আকাশে নতুন নক্ষত্র তিনি। এই বঙ্গ তাঁকে নিয়ে গর্বিত নিজের মাটির কন্যে বলে। তিনি মহিলা ক্রিকেটদলের বিশ্বকাপ জয়ের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রিচা ঘোষ। লিখছেন সায়নদীপ ঘোষ।
আমি জানতাম, ফাইনালে উঠলে আমাদের আর কেউ রুখতে পারবে না..।’ ম্যাচ শেষে জনৈক সাংবাদিককে কথাগুলো যখন তিনি বলছিলেন, ততক্ষণে অকাল দীপাবলি শুরু হয়েছে তাঁর মহল্লায়। ‘তাঁর’ অর্থাৎ এই মুহূর্তে বাংলার অন্যতম আইকন ক্রিকেটার রিচা ঘোষের। থুড়ি, এখন তো তিনি শুধু ক্রিকেটার নন, রাজ্য সরকারের প্রস্তাবে এই রাজ্যের ডিএসপি ও রাতারাতি ‘বঙ্গভূষণ’।
নবি মুম্বইয়ের ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব প্রায় ২১৭৬ কিমি মতো। তবে গত ২ নভেম্বর মধ্যরাতে (হিসেবমতো ৩ নভেম্বর) ডি ওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে যখন বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে উড়ন্ত ক্যাচ তালুবন্দি করলেন হরমনপ্রীত, তখন এই শিলিগুড়ি যেন উঠে এল নবি মুম্বইয়ে। কেন উঠে এল? তার জন্য ফিরে যেতে হবে বছর কয়েক আগের শিলিগুড়িতে।
শিলিগুড়ির বাঘাযতীন অ্যাথলেটিক ক্লাবে ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন গোপাল সাহা। টিম তৈরি হল। তবে শেষ মুহূর্তে দেখা গেল যে দুই দলের মধ্যে একজন উইকেটকিপার কম পড়ছে। তাহলে ম্যাচ হবে কীভাবে? এমন অবস্থায় একমাত্র ছাত্রী রিচা ঘোষের হাতে দস্তানা তুলে দিলেন গোপাল স্যার। সেটাই ছিল সুভাষপল্লির ‘হার্ড’ হিটারের হাতেখড়ি। সেদিন হয়তো অনেকেই বলেছিলেন, মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি? এর উত্তরই নবি মুম্বইয়ের স্টেডিয়াম থেকে দিলেন রিচা। সমাজের তুমুল ভুরু কুঁচকে থাকা প্রশ্নের গায়ে লেগে থাকা যাবতীয় সংশয় দূর করে দিয়েছেন বাংলার এই কন্যা। ভারতের ঝুলিতে এনে দিয়েছেন প্রথম মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, হম কিসিসে কম নেহি! সেমিফাইনালে জয়ের পর বলেছিলেন ‘শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ব’। লড়লেনও তাই। ২৪ বলে ঝোড়ো ৩৪ রানের ইনিংসটি যেন ভারতকে এগিয়ে দিল ৩০০-র দিকে আরও কয়েক কদম। কম বলে বেশি রান তোলার জন্য বাংলার এই পাওয়ার হিটারের উপর আস্থা রাখে ভারত। সেই আস্থার মর্যাদা দিয়েছেন ২২ বছরের এই বঙ্গতনয়া।
তবে সাফল্য এই প্রথম নয়। মহিলাদের সিনিয়র ভারতীয় দল এই প্রথম বিশ্বকাপ পেলেও বাঙালি হিসেবে দু’টি বিশ্বকাপের দাবিদার রিচা। এর আগে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছেন। ডব্লুপিএল জয় করেছেন। তাঁর সাফল্যের খতিয়ান দেখে প্রধানমন্ত্রীও অবাক! ভারতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে মোলাকাতের সময় বলেই ফেললেন,‘রিচা তো যেখানেই যায়, জিতে যায়!’ এতকিছুর পরেও দলকে প্রথম বিশ্বকাপ পাইয়ে দেওয়ার আনন্দ রিচার কাছে আলাদা!
২২ গজের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের লড়াই। সমাজের সঙ্গে লড়াই। নিজের সঙ্গে লড়াই। সেটাই দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে বারবার। এই জয় একা রিচার নয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজের সঙ্গে লড়াই করা প্রত্যেকটি নারীর জয়। ধারাবাহিক লড়াইয়ের ফসল। সফল না হলে আবার আমজনতার গুণের কদর পাওয়া খুব মুশকিল! এখানেই রিচার বিশ্বজয় করার কাহিনি লোকগাথা, উপকথা ছাপিয়ে এক অলৌকিক রূপকথায় উড়াল দিয়েছে।
কথায় বলে, ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’। শিলিগুড়ির এই তরুণীর ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। একসময় নিজে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন রিচার বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ। জেলাস্তরে বিস্তর খেলাধুলা করেছেন। কিন্তু বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন সত্যি হয়নি। তাই হয়তো মেয়ের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চান। চার বছরের রিচাকে প্রথম খেলার মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন মানবেন্দ্রবাবু। আম্পায়ার বাবা তাঁর মেয়েকে খেলায় ভর্তি করতে নিয়ে গিয়েছেন— এখানে সত্যিই অবাক হওয়ার কোনও কারণ নেই। তফাত আসলে অন্য জায়গায়। বাঘাযতীন অ্যাথলেটিক ক্লাবে মেয়েরা সাধারণত টেবিল টেনিস বা ব্যাডমিন্টন খেলতে যায়। সেখানে খুদে রিচার পছন্দ ক্রিকেট। যাকে চিরকাল পুরুষদের খেলার তকমা দেওয়া হয়েছে। তখন গোপাল সাহার অ্যাকাডেমিতে কোনও মহিলা ক্রিকেটার ছিল না। অগত্যা ছেলেদের সঙ্গেই খেলা শুরু করলেন রিচা। ক্রিকেটে আঘাত লাগার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এসব জানার পরেও মেয়েকে তাঁর প্রথম প্রেম থেকে আলাদা করলেন না মানবেন্দ্র। একটি মুহূর্তের জন্যেও ভাবলেন না, এই খেলায় বড়সড় চোট লাগতে পারে। আসলে সুস্থ শরীর যে সুস্থ মন তৈরি করে। সেই বিশ্বাস থেকেই মানবেন্দ্রর এই সিদ্ধান্ত। কঠিন যুদ্ধে পাশে থাকলেন রিচার মা। এখানেই তো অর্ধেক লড়াইটা জয় করে ফেলেছিলেন শিলিগুড়ির তরুণী উইকেটকিপার। বহু অভিভাবক মেয়ের পছন্দের জিনিসটা শুরুতেই নষ্ট করে দেন। কখনও লোকলজ্জার ভয়ে। কখনও আবার বিয়ের কথা ভেবে। তাই রিচার মা-বাবার এই সাহসী সিদ্ধান্তকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। যে কোনও খেলায় কোচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই উঠে আসে শিবশঙ্কর পালের প্রসঙ্গ। তাঁর প্রশিক্ষণেই সফল ফিনিশার হয়ে উঠেছেন রিচা। শিবশঙ্করবাবুর কথায়, ‘রিচা হার্ড হিটিং ওপেনার হিসেবেই খেলা শুরু করেছিল। আমিই ওকে পাঁচ নম্বরে খেলতে বলি। বলেছিলাম খেলা শেষ করে আসতে হবে। প্রশিক্ষণের সময়ে পাওয়ার হিটিংয়ের উপর বিশেষ জোর দেয় রিচা। মূলত ছেলেদের সঙ্গেই প্র্যাকটিস করে। চোট পেলেও মাটি কামড়ে পড়ে থাকত সবসময়।’
কথার ফাঁকেই রিচাকে নিয়ে এক মজার ঘটনা বললেন শিবশঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, ‘একবার অনুশীলনের সময় ছয় মেরেছিল রিচা। বলটা গাড়ির কাচ ভেঙে দিয়েছিল। গাড়ির মালিককে গিয়ে বলেছিলাম, মেয়েটির সঙ্গে ছবি তুলে রাখুন। রিচা ঘোষ ভারতকে বিশ্বকাপ এনে দিলে গল্প করতে পারবেন!’ এখন কি সেই গাড়ির মালিক রিচাকে খুঁজছেন? কে জানে!
ক্রিকেটই রিচার প্রথম ভালোবাসা। চার বছর বয়সে প্রথম ব্যাট হাতে তুলে নিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপে ইন্ডিয়া ক্যাপ পরা। বারবার ছুটেছেন কলকাতায়। কোভিড পর্বে বাড়ির সামনের গলিতে নেট লাগিয়ে মেয়েকে প্র্যাকটিস করাতেন বাবা। সেসব কষ্টই ২ নভেম্বর ফুল হয়ে ফুটল।
তবে ফুল তো একা থাকে না। সঙ্গে থাকে কাঁটাও। রিচাকেও প্রচুর বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। করোনাকালে বাড়িতে ছুটিতে এসেছেন রিচা। ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের জন্য বাবার সঙ্গে গিয়েছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে। কিন্তু সেদিন কার্যত অপমানিত হয়ে ঘরে ফিরে আসতে হয়েছিল বাবা-মেয়েকে। এক চা দোকানিকে দিয়ে মুখের উপর স্টেডিয়ামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অপমান আরও জেদি করে তুলেছিল মেয়েটিকে।
বিশ্বজয়ের পর বিমানের চাকা বাগডোগরা ছুঁতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সকলে। নিরাশ করেননি বঙ্গতনয়া। সুসজ্জিত কনভয় নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অভিনন্দন জানিয়েছেন জনস্রোতকে। বিমানবন্দর থেকে সেই স্রোত বয়ে গেল সুভাষপল্লির বাড়ি পর্যন্ত। সবার মুখে এখন একটাই স্লোগান, ‘জয় রিচা, জয় বাংলা!’
সুভাষপল্লির এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের সাফল্যে কতকিছুই না পালটে গেল! রাতারাতি বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নিল উত্তরবঙ্গের এই শহর। রিচার আইডল মহেন্দ্র সিং ধোনি। দলেও তাঁকে অনেকে ডাকেন ‘ছোটা মাহি’ বলে। ধোনির মতোই সপাট রিচাও। কলকাতায় রাজ্য সরকারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে ‘ধোনির মতো অনেক দুধ খাও?’— এমন প্রশ্নে হেসে বলেন, ‘একসময় খেতাম, পরে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স হওয়ায় আর খাই না।’ বিশ্বজয়ের সোনার মেডেল কোথায় থাকবে? এই উত্তরে জোর গলায় বলে ওঠেন, ‘বাড়িতে। একেবারে সবার সামনে।’
এই মেয়ের অধ্যবসায়ও থেকে যাবে সবার সামনে। যার কাছে নতজানু হবে এই উপমহাদেশের পরবর্তীকালের মহিলা ব্রিগেড।