বাংলার এমন এক মিষ্টি, যাকে নিয়ে জামাই ঠকানোর গল্প কমবেশি সকলের জানা। এবার এই মিষ্টি নিয়েই একটা অন্য ঘটনা লিখি বরং! জলভরাকে কেন্দ্র করে আস্ত একটা বিমান অবতরণ করেছিল বারাকপুরে! তখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্বে প্রণব মুখোপাধ্যায়। দিল্লিতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে। প্রণববাবুর ইচ্ছে, সেখানে বাংলার মিষ্টির ঐতিহ্য বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবেন।
সেদিন বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন শৈবাল মোদক। সূর্য মোদকের প্রপৌত্র। হঠাৎ, অপরিচত নম্বর থেকে ফোন। ওপ্রান্ত থেকে বলছেন, আমি মেজর বলছি, বারাকপুর থেকে। আমার ৩৫০ পিস জলভরা সন্দেশ লাগবে। ভালো করে প্যাকিং করবেন। দিল্লিতে পাঠানো হবে। শৈবালবাবু রাজি হয়ে গেলেন। পাঠানোর দিন আগত। চমৎকার প্যাকেজিং করেছেন। সকালে মেজর সাহেবের ফের ফোন। বললেন, আপনার মিষ্টি রেডি? কত পেমেন্ট করতে হবে? শৈবালবাবু আমতা আমতা করে বললেন— রেডি কিন্তু নিয়ে যাবেন কী করে? মেজর সাহেব একটু গম্ভীর সুরে বললেন, তা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। শুধুমাত্র আপনার মিষ্টি নিয়ে যেতে কিছু আগেই একটা প্লেন ল্যান্ড করেছে বারাকপুরে। বাকরুদ্ধ শৈবালবাবু ধপাস করে বসে পড়লেন চেয়ারে।
এই দোকানেরই আরেক মিষ্টি মোতিচুর। মোরান সাহেবের বাগানবাড়িতে কবিগুরু এলেই এই মিষ্টির অর্ডার চলে যেত সূর্যকুমার মোদকের দোকানে। সেই সময় দুধ ও ক্ষীর দিয়ে সাদা ধবধবে লাড্ডুর মতো একটা মিষ্টি তৈরি করেছিলেন তিনি। কবিগুরুর চাহিদামতো মিষ্টির ডালি সাজিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সূর্য। ওই সাদা ধবধবে লাড্ডুর মতো মিষ্টিটি কবিগুরু মুখে নিতে যাবেন তখনই হাতের মধ্যেই গুঁড়ো হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ গুরুদেব বলে ফেলেন, ‘মুক্তো যেন চুর চুর করে ভেঙে পড়ল। এ তো মোতিচুর!’ দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে এই দোকান নিজেদের ঐতিহ্যে অমলিন। এখন জলভরা সন্দেশের গায়ে জিআই তকমা লেগেছে। সৌজন্যে সূর্য মোদকের উত্তরসূরী শৈবাল মোদক। আজ সেই দোকানের দুই রেসিপি রইল।
জলভরা সন্দেশ
জামাই ঠকাতে গিয়ে যে মিষ্টির উৎপত্তি, তা আজও বাংলার কুটুম ও জামাইদের পাত অলংকৃত করে সগৌরবে।
উপকরণ (এক পাকের হিসেবে): সম্পূর্ণ জল ঝরানো ছানা ২ কেজি, চিনি ৬০০ গ্রাম অথবা নলেন গুড় ৪০০ গ্রাম, মিহি করে এলাচ গুঁড়ো ৮ চা চামচ, খাঁটি গাওয়া ঘি ১২ চা চামচ, চিনির সিরাপ, গোলাপ জল পরিমাণ মতো, মধু সামান্য।
প্রণালী: প্রথমে একটা বড় থালায় ছানা, চিনি এবং এলাচ গুঁড়ো একসঙ্গে ভালোভাবে মেখে একটা মণ্ড বানিয়ে নিন। সেটা এবার গরম কড়াইয়ে দিয়ে কম আঁচে পাক করতে হবে। কম করে ৪৫ মিনিট কড়াইয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে। মণ্ডটি মোটামুটি নরম হয়ে গেলে নামিয়ে রাখুন। ঠাণ্ডা হতে কিছুটা সময় দিন। ততক্ষণে তালশাঁসের আদলে তৈরি ছাঁচে ভালো করে ঘি মাখিয়ে নিন। এবার ওই ঠাণ্ডা সন্দেশের মণ্ড থেকে কেটে ছাঁচে দিয়ে আঙুল দিয়ে গর্ত করে দিন। সেই গর্তে গোলাপ জল মিশ্রিত চিনির সিরাপ বা মধু ভরে দিন পরিমাণ মতো। তার সন্দেশটা ছাঁচে চেপে খুলে বের করে নিন। তৈরি হয়ে গেল জলভরা সন্দেশ। এখানে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, তা হল এক পাক মানে ২ কেজি ছানার মণ্ড। আর এক কেজি মণ্ডতে সবচেয়ে কনিষ্ঠ জলভরা সন্দেশ তৈরি হয় ২০টি। আর প্রমাণ সাইজ করতে হলে সর্বোচ্চ ১১টি বানাতে পারেন।
মোতিচুর
নাম দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এই মিষ্টি বাঙালির অতিথি আপ্যায়নকে আরও সুললিত করেছে।
তৈরি করার আগে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ—
বাজারে মোতিচুর লাড্ডু বলে যাকে আমরা চিনি সেটা সূর্য মোদকের মোতিচুর নয়। কিংবা কবিগুরুর ভালোবাসার মোতিচুরও নয়। মাত্র দু’টি উপকরণ দিয়ে ময়রা-মহিমার ছাপ রেখে গিয়েছেন সূর্য।
উপকরণ (এক পাকের হিসেবে): খাঁটি জল ঝরানো ছানা দু’ কেজি, চিনি ৮০০ গ্রাম, এছাড়া লাগবে খাঁটি গাওয়া ঘি ৫-৬ চা চামচ।
প্রণালী: গরম কড়াইয়ে প্রথমে ছানা দিন। সেটা নাড়তে নাড়তে পুরো চিনি ঢেলে দিতে হবে। এবার নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওলট-পালট করতে থাকুন। কিছুক্ষণ পর দেখবেন চিনির সিরাপে ছানার ছোট ছোট দানা ভাসতে থাকবে। সেগুলি একটা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে পৃথক একটি কাঠের পাত্রে রাখুন। প্রয়োজন মতো সামান্য গাওয়া ঘি ছানার দানাগুলিকে মেখে নিতে হবে। তারপর হাতের তালুতে লাড্ডুর আকারে নিয়ে দলা পাকাতে পাকাতে তৈরি করে ফেলুন সূর্য মোদকের মোতিচুর। আকার আপনার পছন্দের মতো। দু’কেজি ছানাতে ১৮-২০টি মোতিচুর লাড্ডু হতে পারে।
শুভজিৎ অধিকারী