Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য আইনি প্রতিকার কোন পথে?

কেউ কেউ ভাবেন, সম্পর্কের কোনও এক্সপায়ারি ডেট হয় না। কেউ আবার ভিন্ন পথের পথিক। মনে করেন, কমোডিটির মতো সম্পর্কেও এক্সপায়ারি ডেট হয়।

মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য আইনি প্রতিকার কোন পথে?
  • ৯ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দোকানি প্রতারণা করেছেন এক্সপায়ারি ডেটের পণ্য দিয়ে। ক্ষতি হয়েছে গ্রাহকের। কী করবেন? পরামর্শে কলকাতা হাই কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী রাজর্ষি রায়চৌধুরী।

Advertisement

 

কেউ কেউ ভাবেন, সম্পর্কের কোনও এক্সপায়ারি ডেট হয় না। কেউ আবার ভিন্ন পথের পথিক। মনে করেন, কমোডিটির মতো সম্পর্কেও এক্সপায়ারি ডেট হয়। মনে মনে মরে যায় রোজ কত কত মন! মনকে আইন ও নিয়ম দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু সামগ্রীকে এক্সপায়ারি ডেট-এর সীমা দিয়ে বাঁধার আইন রয়েছে। সেখানেই প্রয়োজন পড়ে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং ক্রেতার আইনি সুরক্ষার দিকটি। 
ধরা যাক, দোকানে গেলেন। প্রতিদিন সকালের পাউরুটি বা দুধের প্যাকেট কিংবা প্যাকেটবন্দি টক দই কিনলেন। এসব পণ্য খুব তাড়াতাড়ি এক্সপায়ার করে যায়। প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে সেই তারিখের কথা। অনেকেই সেসব না মিলিয়ে পণ্য কিনে আনেন। ফলে খাওয়ার পর পেটের সমস্যা নয়তো অন্য অসুখে জেরবার। শুধু খাবার জিনিস বলেই নয়, যে কোনও প্রয়োজনীয় জিনিসেই এই তারিখ সীমাবদ্ধ থাকে। বিশেষ করে, ওষুধ, অপারেশনের সরঞ্জাম, বেবিফুড, রান্না ও খাওয়ার সামগ্রী, লোশন, ক্রিম, প্রসাধনী দ্রব্য ইত্যাদি কেনার সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন হয়। এক্সপায়ারি ডেট-এর ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব বর্তায় ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর ও দোকানির উপর। 
ভারতীয় ক্রেতাদের সুরক্ষা দিতে ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি ঠেকাতে ক্রেতার আইনি সুরক্ষার প্রসঙ্গ ভারতীয় সংবিধানে আছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতাও এই আইনকে সুরক্ষিত করে। 

 প্রাসঙ্গিক ভারতীয় আইন
গ্রাহক সুরক্ষা আইন, বা কনজিউমার 
প্রোটেকশন ল, ২০১৯: 
এই আইন অনুসারে, ধারা ২ (৬) অনুসারে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ পরিষেবা’ বা ‘ত্রুটিপূর্ণ পণ্য’ হিসেবে ধরা হবে। ধারা ১৭ ও ১৮ অনুসারে, এই ধরনের পণ্য বিক্রয়কে ‘অন্যায্য বাণিজ্যিক প্রথা বা আনফেয়ার ট্রেড প্যাকটিস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারা ২১ অনুসারে, জেলা, রাজ্য বা জাতীয় ভোক্তা ফোরাম বিক্রেতাকে জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়। 
শুধু এই আইন করেই নয়, বেশ কিছু নীতি-নিয়ম কার্যকর করেও এই ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধ করার বিধান রয়েছে। 
লিগ্যাল মেট্রোলজি (প্যাকেজড কমোডিটিজ) রুলস, ২০১১: 
৬ /১ (ডি) বিধি অনুসারে প্রতিটি প্যাকেটজাত পণ্যে ‘বেস্ট বিফোর ’ বা ‘ইউজ বাই’ কথাটি থাকতে হবে। বিধি ১৮(২) অনুসারে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কেউ বিক্রয় করলে আইন অনুসারে তাঁকে প্রথমবারের জন্য ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হবে পারে। এই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটলে পরবর্তীবারে কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও মানদণ্ড আইন, ২০০৬: খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা করলে তার মান ও নিরাপত্তার দিকটিও বিক্রেতাকে খতিয়ে দেখতে হয়। মাঝেমাঝেই খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর থেকে আকস্মিক পরীক্ষা ও হাজিরার নিয়ম রয়েছে। তখন অফিসাররা খতিয়ে দেখেন খাবারের মান ও সুরক্ষার দিকটি। শুধু দোকান নয়, হোটেল-রেস্তরাঁর মালিকরাও বাধ্য খাবারের মান ও নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে সতর্ক থাকতে। খাদ্য নিরাপত্তা ও মানদণ্ড আইন অনুসারে, এই আইনের ২৬ নং ধারায় মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রয়কে ‘অসুরক্ষিত খাদ্য’ হিসাবে গণ্য করা হয়। ধারা ৫৯ অনুসারে, অপরাধীর ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও কারাদণ্ড হতে পারে। 
এ তো গেল আইন ও নিয়মের বাঁধন। কিন্তু এসব আইনি প্রতিকার পেতে গেলে ক্রেতা কী করবেন? দোকানে গিয়ে ধরা যাক, ঠকে গেলেন। প্রতারিত হয়ে এক্সপায়ারি ডেটের জিনিস কিনে চলে এলেন। তাহলে কী করবেন? 

 করণীয় কী
নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বেলায় সাধারণত গৃহস্থ ও দোকানি কেউই কথায় কথায় আইন-আদালতের চক্রে পড়তে চান না। তাই বিক্রেতাকেই প্রথমে জানান জিনিসটির এক্সপায়ারি ডেট চলে গিয়েছে। দ্রব্যটি দোকানে নিয়ে যান ও বদলে দিতে বলুন। প্রয়োজনে রসিদ, পণ্যের প্যাকেট (যেখানে তারিখ লেখা আছে), ছবি বা ভিডিও আছে, তা দোকানির কাছে পৌঁছে দিন। এতেই দোকানি জিনিসটি বদলে দেবেন। কিন্তু যদি এরপরেও দোকানি জিনিসটি বদলে দিতে অস্বীকার করেন ও অকারণ হেনস্থা করেন সেক্ষেত্রে আইনের রাস্তা খোলা থাকে। ন্যাশনাল কনজিউমার হেল্পলাইন বা জাতীয় গ্রাহক হেল্পলাইনে অভিযোগ জানান। অভিযোগ করুন ১৮০০-১১-৪০০০ বা consumerhelpline.gov.in-এ। প্রতিটি জেলার নিজস্ব হেল্পলাইন নম্বর আছে। সেখানেও অভিযোগ দাখিল করে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। সাধারণত ওই খাবার খেয়ে বা জিনিসটি ব্যবহার করে কারও শারীরিক ক্ষতি হলে তাঁর ক্ষতির বিবরণ দিয়ে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নথি দেখিয়ে জেলা কনজিউমার ফোরামে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। প্রতি জেলারই নিজস্ব কনজিউমার ফোরাম রয়েছে।

 অতিরিক্ত সুরক্ষা
জিনিস কিনে ঠকে গেলে বা প্রতারিত হলে পুলিস স্টেশনেও যোগাযোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ন্যায় সংহিতায় (পূর্বের আইপিসি ৪২০ ধারা) এফআইআর করার বিধান রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও প্রসাধনীর ক্ষেত্রে ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট, ১৯৪০ অনুযায়ী জেল ও জরিমানা কিংবা জেল অথবা জরিমানা সবরকম শাস্তিই হতে পারে।

 খেয়াল রাখুন
দ্রব্য কিনে ঠকে যাওয়ার পরে আইন-আদালত করার চেয়ে, আগেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। জিনিস কেনার আগে এক্সপায়ারি ডেট দেখে নিন। দোকানির জিনিস বদলে দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেক্ষেত্রে সহযোগিতা করুন।
মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ