


কে বলে মেয়েরা অঙ্ক বা বিজ্ঞানে কমজোরি? বরং তাঁরাও দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গবষেণার নানা ক্ষেত্র। আজ, জাতীয় বিজ্ঞান দিবসে রইল কলকাতার দুই মহিলা বিজ্ঞানীর কথা।
১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম রমন এফেক্ট আবিষ্কারের কথা প্রকাশ্যে আনেন ডঃ সি ভি রমন। ১৯৩০-এ এই কাজের স্বীকৃতিতে এশিয়ার প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে নোবেলও পান। ভারতীয় বিজ্ঞান মন্ত্রকের সিদ্ধান্তে ১৯৮৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই দিনটি ‘জাতীয় বিজ্ঞান দিবস’ হিসাবে পালিত হয়। ভারতের বিজ্ঞানসাধনায় স্বাধীনতার আগে থেকেই মহিলারাও কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। অসীমা চট্টোপাধ্যায়, রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়কে আমরা ভুলি কী করে! তাই এই বিজ্ঞান দিবসেও উঠে এল দুই বিজ্ঞানসাধিকার কথা।
প্রথমজন বসু বিজ্ঞান মন্দিরের ডঃ তানিয়া দাশ। কাছের এক বন্ধুকে ব্লাড ক্যান্সারে মারা যেতে দেখে যাঁর জীবনে গবেষণার পথ পরিবর্তিত হয়ে যায়! বন্ধুকে কথা দিয়েছিলেন, গবেষণা ও বিজ্ঞানী হয়ে ওঠাই জীবনের গন্তব্য হলে বেছে নেবেন ক্যান্সার নিয়ে কাজ। কথা রেখেছেন তিনি। এখন ক্যান্সারের ইমিউনোলজি নিয়েই তাঁর মূল গবেষণা। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর শরীরের অনক্রম্যতা বাড়িয়ে তুলে সেই থেরাপি দিয়ে কীভাবে তাঁর রোগগ্রস্ত কোষকে সুস্থ করে তোলা যায়, তানিয়ার গবেষণার বিষয় এটিই। বিজ্ঞানচর্চার কথা উঠে আসতেই স্মৃতিতে ভিড় করে এল শৈশব। ‘ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চেষ্টা করিনি। বরং মৌলিক বিজ্ঞানকে ভালোবেসে এগিয়েছি তার হাত ধরেই। ছোট থেকেই বায়োসায়েন্স, কেমিস্ট্রি খুব টানত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করার পর চলে গিয়েছিলাম আমেরিকা। ওখানেই পোস্ট ডক্টরেট করি। মানবদেহের কোষেরা একে অন্যের সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলে, কী কী সিগন্যাল পাঠায় তা নিয়েই গবেষণা চলছিল।’ তারপর দেশে ফিরে আসেন তানিয়া। যোগ দেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিকেল বায়োলজি (সিএসআইআর)-তে। পরে বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দিলেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরে। পুরনো কথা বলতে গিয়ে ফের স্মৃতিমেদুর তানিয়া। বললেন, ‘জার্মান বন্ধুটি চলে যাওয়ার পর থেকেই ওর মৃত্যু আমাকে খুব পীড়া দিয়েছিল। ঠিক করেছিলাম, যদি গবেষক-অধ্যাপক হিসেবেই কাজে যোগ দিই, তাহলে ক্যান্সারই হবে আমার বিষয়।’ সেই থেকেই ক্যান্সারের ইমিউনোথেরাপি নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। কীভাবে ক্যান্সারের কোষকে মেরে ফেলা যায়, তা খুঁজতে শুরু করেন। নজর দেন খাবারের পাতের দিকে। কী কী খাবার থেকে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা যায়, তা দিয়েই কাজ শুরু করেন। তারপর স্টেম সেল থেরাপি, ইমিউনোথেরাপির দিকে বাঁক নেয় গবেষণার পথ। বহু ছাত্রছাত্রীকে হাতে করে তৈরি করেছেন তিনি।
এবার যে বিজ্ঞানীর কথা জানাব, তিনি একেবারে উল্টো পথের পথিক। পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী হলেও ফাঁকিবাজিতে ছিল তাঁর তুঙ্গে নামডাক। মজার ছলে এখনও বলেন, ‘বিস্তর ফাঁকি দিয়েছি স্কুলে, যেগুলো শোনার পর আমার এখনকার ছাত্র-ছাত্রীরা মোটেই আমার কথা আর শুনবে না!’ তিনি শ্রেয়া চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজির অধ্যাপক। শ্রেয়া গবেষণা করেন ইনফ্লেমনের বিজ্ঞান নিয়ে। কী সেটি? জানালেন নিজেই। ‘শরীরের কোথাও কেটে গেলে শরীরের ভিতরে কিছু ইনফ্লেমশন তৈরি হয়। সেটি একদিক থেকে ভালো, কারণ এতে শরীরের ইমিউনিটি পাওয়ার সক্রিয় থাকে। কিন্তু যদি এই ইনফ্লেমশ বাড়তেই থাকে, তাহলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হেরে যায়। আমার গবেষণা এই ইনফ্লেমশনের বিজ্ঞান নিয়েই।’
পাঠভবনের শ্রেয়া ছোট থেকেই মেধাবী। কিন্তু পড়াশোনাকে কখনওই ‘সিরিয়াস বিষয়’ বলে মনেই হয়নি। ফল মিলেছিল হাতেনাতে। উচ্চ মাধ্যমিকে আশানুরূপ ফল হল না। ফলে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সিতে পড়া হল না। কিন্তু এই না হওয়াই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল একপ্রকার। সায়েন্স পড়তে না চাওয়া কন্যেকে বাবা বোঝালেন। ভরতি হলেন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে, ফিজিওলজি নিয়ে। তবে সেখানকার নামী অধ্যাপকদের নজরদারি ও অনুশাসন খুব একটা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ দিল না। ফলে রেজাল্ট হল তাক লাগানো। বিএসসি, এমএসসি সবেতেই দুর্দান্ত ফল। পুরস্কৃতও হলেন। সেখানেও মজার ঘটনা, হেসে বললেন, ‘বেছে বেছে মাস্টার্সে এমন একটা স্পেশাল পেপার নিই,যাতে সবচেয়ে কম পড়তে হয়! পরিবেশবিদ্যা! আসলে আমার সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা ভালো লাগে না। বরং গবেষণায় এসে স্বাধীন পড়াশোনাই আমাকে টেনেছে বেশি। তাই গবেষণা করতে ভালোবাসি।’ বসু বিজ্ঞান মন্দিরে পিএইচডি করার সুযোগ এল। তারপর সিএইচআইআর-এ পোস্ট ডক্টরেক্ট। বিদেশের ইউনিভার্সিটি থেকেও এসেছিল ডাক। অনেকেই বলেছিলেন ওখানে না গেলে কিছু হবে না। কিন্তু ঘরকুনো শ্রেয়ার লক্ষ্য ছিল দেশে থেকেই পড়াশোনা করব। তাই-ই করে দেখিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক-অধ্যাপক। উচ্চশিক্ষায় বিদেশে না গিয়েও যে দেশীয় পড়াশোনায় অনেক উঁচুতে ওঠা যায় তা প্রমাণ করেছেন তিনি!
মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে বরাবরই আশাবাদী তানিয়া ও শ্রেয়া। স্বপ্ন দেখেন, এই দেশ একদিন বিজ্ঞানেও শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা আনবে নারীদের হাত ধরেই।
মনীষা মুখোপাধ্যায়