Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

প্ররোচনার ফাঁদে না পড়ার কৌশল

কথায় কথায় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করে ফেলেন, রেগে যান খুব! অন্য কারও প্ররোচনায় বারবার ভুল করেন। এবার থেকে আর করবেন না। কোন উপায়ে নিজেকে সামলাবেন? জানালেন মনস্তত্ত্ববিদ।

প্ররোচনার ফাঁদে না পড়ার কৌশল
  • ২৩ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ধরা যাক, আপনি একটি বাসে বা ট্রেনে সফর করছেন। সহযাত্রীর এমন কিছু কথা বা কাজ আপনাকে চূড়ান্ত বিরক্ত করছে, যাতে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেকক্ষণ ধরে হয়তো আপনার মত বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু শুনছেন বা এমন কিছু আচরণ দেখছেন, যা আপনার কাছে আশাপ্রদ নয়। প্রথমেই বেশ কড়া করে দু’কথা শুনিয়ে দিলেন। কথায় কথা বাড়বে, সেটাই প্রাকৃতিক নীতি। হলও তা-ই। এবার তা থেকেই ঝগড়া, বিবাদ ও মতান্তরের চূড়ান্ত। ছোট্ট বাস বা ট্রেন সফরে অকারণে একরাশ অশান্তি! শুধু নিত্য বাস-ট্রেনের সফর নয়, নিজের বাড়ি, অফিসের পরিসর, প্রতিবেশীদের আড্ডা, আত্মীয় মহলে নানা আলোচনা কিন্তু প্ররোচনা তৈরি করতে পারে। নিজের মত ও বিশ্বাসের সঙ্গে, নিজস্ব বিচারের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাত ও সংঘর্ষই বেঁচে থাকার লড়াই। সেখানে ছোটো বড়ো প্ররোচনায় পা দিয়ে অল্পেই রেগে যাওয়া অকারণ সময়ক্ষয়। 

Advertisement

এটুকু পড়েই অনেকে বলবেন, রাগ মানেই ‘অকারণ’? না, রাগের কার্যকারণ অকারণ নয়। বরং রাগও একটা আবেগ। তার প্রয়োজনীয়তাও আছে। অন্যায় দেখলে রাগ হওয়াই মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের লক্ষণ। কিন্তু মুশকিল হয়, যখন সেই রাগ উলটে মানুষটির ক্ষতি করে। শুধু রাগই নয়, প্ররোচনা মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। কখনো কখনো হঠকারী সিদ্ধান্তের দিকেও ধাক্কা মেরে এগিয়ে দেয়। তাই প্ররোচনাকে দূর থেকে দেখেই চিনতে হবে। বুঝতে হবে পরিস্থিতি। কিন্তু এ কাজ খুব সহজ নয়। কীভাবে সামলাবেন এই প্ররোচনার বিপদ? জানালেন মনস্তত্ত্ববিদ ডঃ সুপর্ণা রেজ। তাঁর কথায়, ‘অনেকেই বলেন প্ররোচনা বাইরে থেকে আসা ইরিটেশন। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে ব্যাপারটা পরিবেশগত। কোনো শিশু যদি ছোটোবেলা থেকে দেখে যে বাড়িতে মা-বাবা কথায় কথায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, চিৎকার করছেন, কোনো কথাই হজম করতে পারছেন না, সামান্য বিরুদ্ধ পরিস্থিতি হলেই প্রতিবাদ করছেন, তখন শিশুও প্রতিক্রিয়াশীল ও প্ররোচনায় সাড়া দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে বড়ো হয়।’
প্ররোচিত হয়ে রেগে গেলে সেই রাগ বা হতাশা আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে উত্তেজিত করে। এতে শরীরে স্ট্রেস বাড়ে। তাই প্ররোচিত হয়ে কী বলছি, কী করছি কিছুরই হিসেব থাকে না। 
ইচ্ছাকৃত প্ররোচনা
অনেক সময় বিপরীতের মানুষটি ইচ্ছে করেই প্ররোচিত করেন। কোন কথার ভাঁজে প্ররোচনা লুকিয়ে তা কেউ বুঝতে পারেন না, কেউ আবার সব কথাতেই সন্দেহের বশে প্ররোচনা খুঁজে পান। তাই কোনটি প্রকৃতই প্ররোচনা, সেটি বুঝতে হবে। জীবনের অভিজ্ঞতা ও মানুষ চেনার বোধ এক্ষেত্রে সাহায্য করবে। তবে ভালো করে অন্যের কথা শোনা ও বোঝার সঙ্গে সেই কথা নিয়ে ভাবার অভ্যাস রপ্ত করলেও এটি বোঝা যায়। 
কোন পথে মুক্তি
মানসিক প্রস্তুতি: যে কোনো পরিস্থিতি, তা যত বিরূপই হোক না কেন, তার সঙ্গে যুঝতে শিখতে হবে। কোন কোন ধরনের কথা আপনাকে প্ররোচিত করতে পারে, সেগুলিকে আগে চিহ্নিত করুন। এটুকু বুঝলে সেসব কথায় শান্ত থাকার কাজে অনেকটা এগিয়ে থাকা যাবে।
• স্থান পরিবর্তন: এর পরেও রাগ হবে, বিরক্তি জন্মাবে। যতক্ষণ পারবেন, ধৈর্য ধরে বিরোধীর কথা বা আচরণ বুঝুন, শুনুন। একান্ত তা সীমা ছাড়াচ্ছে মনে হলে, চিৎকার-চেঁচামেচি না করে জায়গা পরিবর্তন করুন বা সেই জায়গা থেকে অন্যদিকে চলে যান। অন্য কারও সঙ্গে অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলুন। আপনার বিশ্বাস ও মতামত যেমন অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার যুদ্ধে নামবেন না, তেমনই অন্যের মতকেও শিরোধার্য করবেন না। সৌজন্য ও শালীনতায় মুড়ে নিজের বিশ্বাস ও মত জানান। বিপক্ষ সেই সৌজন্য বজায় না রাখলে সেখান থেকে সরে যান। 
• মন খুলে কথা: এমন কারও সঙ্গে সাক্ষাতে বা ফোনে সেসময় কথা বলুন, যিনি আপনার মত ও বিশ্বাসের সঙ্গে সহাবস্থান রাখেন। তাঁকে পুরো ঘটনা খুলে বলুন। তাঁর ভার্চুয়াল মানসিক সমর্থনও আপনাকে অনেকটা মানসিক শান্তি দেবে। 
• অবজ্ঞা করুন: আজকাল দেখবেন, ট্রেনে উঠেই অনেকে কানে ইয়ারবাড বা ইয়ারফোন গুঁজে দেন। এই যে সাময়িক সময় চারপাশের অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া বা কথায় কর্ণপাত না করে নিজের মতো করে সময় কাটানো এটা প্ররোচনা এড়ানোর অন্যতম সেরা অস্ত্র। চেষ্টা করতে পারেন। যেসব মানুষ প্ররোচিত করেন, দরকারে তাঁদের এড়িয়ে চলুন। 
• ভেবে কথা বলুন: কারও প্ররোচনায় পা দিয়ে ভুল কথা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রয়োজনে সময় নিন। ভেবে জানাবেন বলুন। প্ররোচনাকারী যা শুনতে চান, তা বলিয়ে নেওয়ার একটা চাপা অভিসন্ধি থাকে। তাই কোনো প্রস্তাব তাৎক্ষণিক ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা থেকে বিরত থাকুন। বিষয়টি বুঝতে ও প্ররোচনাকারীর উদ্দেশ্য বুঝতে প্রশ্ন করুন। মন ও মাথা কোনো একটি সিদ্ধান্তে আটকে না রেখে খোলা মনে বিষয়টা বুঝুন তারপর সিদ্ধান্ত নিন। 
• ‘না’ বলুন: যে কাজে মনের সমর্থন পাচ্ছেন না বা বিপদ হতে পারে বলে মনে করছেন, সেই কাজে সরাসরি সাহস করে না বলুন। এতে কে অখুশি হল কে আপনাকে খারাপ ভাবল, এসব মাথায় আনবেন না। সৌজন্য ও বিনয়ের সঙ্গে না বলায় ক্ষতি নেই।
• মেডিটেশন: যে কোনো আবেগ নিয়ন্ত্রণে মেডিটেশন বড়ো হাতিয়ার। প্রতিদিন মেডিটেশন অভ্যেস করুন। ধ্যান বা মেডিটেশন মনকে অনুশাসনে বাঁধে। মন শান্ত হলে বাইরের প্ররোচনা খুব একটা কাজ করে না। তাই ধ্যান বা মেডিটেশনের অভ্যাস আয়ত্ত করুন। এতে মন ও মাথা শান্ত থাকে। কাজেও ছন্দ ফেরে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ