


সুখেন বিশ্বাস: বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য সন্দেশ! মিষ্টি হোক বা পত্রিকা। অতিথি আপ্যায়নে তার যেমন জুড়ি নেই, তেমনি শিশু-কিশোরদের সরল মনে সরস মজা দেওয়াতেও। ১১৩ বছরেও উজ্জ্বল রায়বাড়ির সেই ‘সন্দেশ’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে যখন ‘তিন কন্যা’ সিনেমা ও ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ তথ্যচিত্র নির্মাণের ব্যস্ততা তুঙ্গে, তখনই সত্যজিৎ রায়ের মনে হয়েছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘সন্দেশ’ আবার প্রকাশ করা উচিত। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘... ‘সন্দেশ’ বন্ধ হয়ে যায় ১৯৩৩ কিংবা ’৩২ এ। আমার একটা মনে ইচ্ছা ছিল ‘সন্দেশ’ যদি আর একবার বের করা যায়, তাহলে মন্দ হয় না। তারপর প্রস্তাবটা আসে আমার বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। ... তারপরেই ১৯৬১ সালের মে মাসে ‘সন্দেশ’ বের হয়। ... আমি কোনোদিন লিখব এটা ধারণা ছিল না। কোনোদিন যে আমি গল্প, কবিতা লিখব একথা আমার মনেও হয়নি। ... সন্দেশ বের হওয়ার পর সন্দেশের পাতায় যাবে এই মনে করে আমি প্রথমে লিখতে শুরু করি, তাও অনুবাদ। বিদেশি ননসেন্স কবিতার অনুবাদ। তারপরে গল্প। কিন্তু একবার যখন শুরু করলাম তখন আর থামার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। আমি ক্রমাগত লিখে গেলাম।’ প্রথম দু’বছর কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সত্যজিৎ। তবে সেই সময় ‘সন্দেশ’ প্রকাশে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেখিয়েছিলেন সুপ্রভা দেবী স্বয়ং।
১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় ‘পথের পাঁচালী’। সেই শুরু তাঁর আন্তর্জাতিক যাত্রা। এরপর আরও পাঁচটি বিশ্বমানের ছবি। ‘অপরাজিত’, ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘অপুর সংসার’ ও ‘দেবী’। চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি তখন চিত্রনাট্যকারও। ‘তিন কন্যা’ ছবিতে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দু’টি পালক। প্রযোজক ও সংগীতকার। এইরকম ব্যস্ত সময়ে তিনি এসেছিলেন ‘সন্দেশ’ সম্পাদনায়। আর তার সুবাদেই আমরা পেলাম লেখক সত্যজিৎ রায়কে। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশের পাশেই চিরস্থায়ী আসন করে নিল প্রদোষচন্দ্র মিত্র অর্থাৎ ফেলুদা। তিনি লেখা শুরু না করলে আমরা কোথায় পেতাম কল্পবিজ্ঞানের নায়ক প্রোফেসর শঙ্কুকে? কিংবা বৈঠকী গল্পের নায়ক তারিণী খুড়োকে? পত্রিকার নানা লে-আউট ও অলংকরণই বা দেখতাম কোথায়? লুইস ক্যারোল ও এডওয়ার্ড লিয়রের লেখা ছড়া অনুবাদ বাঙালি পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের নতুন নতুন মজার গল্প। ভিন্নমাত্রার একানব্বইটি ছোটোগল্প লিখেছিলেন সত্যজিৎ। সেই সব গল্পের নামও বিচিত্র। ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’, ‘পটলবাবু ফিল্মস্টার’, ‘অনাথবাবুর ভয়’, ‘অসমঞ্জবাবুর কুকুর’ ...।
‘সন্দেশ’ পত্রিকার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯১৩ সালে, যে বছর রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন। প্রথম সংখ্যা থেকেই এই পত্রিকার বিষয় ভাবনায় ছিল নতুনত্ব। শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রচ্ছদ, অলংকরণ, পাতা জোড়া ছবি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আমৃত্যু ‘সন্দেশে’র পৃষ্ঠাসংখ্যা রেখেছিলেন ৩২। তাঁর সম্পাদনাকালে পত্রিকাটিতে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়নি। প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে উপেন্দ্রকিশোর লিখেছিলেন, ‘আমরা যে সন্দেশ খাই, তাহার দুটি গুণ আছে। উহা খাইতে ভালো লাগে আর উহাতে শরীরে বল হয়। আমাদের যে পত্রিকাখানি ‘সন্দেশ’ নাম লইয়া সকলের নিকট উপস্থিত হইতেছে, ইহাতেও যদি এই দুই গুণ থাকে—অর্থাৎ ইহা পড়িয়া যদি সকলের ভালো লাগে আর কিছু উপকার হয় তবেই ‘সন্দেশ’ নাম সার্থক হইবে।’
উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পরে ‘সন্দেশ’ সম্পাদনার ভার পড়ে পুত্র সুকুমার রায়ের উপর। পত্রিকায় তাঁর লেখালিখির পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছিল অলংকরণের বিষয়টি। ছবি হিসাবে স্থান পেয়েছিল গভীর সমুদ্রের গাছপালা, বিচিত্র রকমের প্রজাপতি, অদ্ভুত সব জীবজন্তু। উপেন্দ্রকিশোরের আমলে ‘সন্দেশ’ ছিল পারিবারিক পত্রিকা, কিন্তু সুকুমারের সম্পাদনায় সেটি পরিবারের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে কিশোরদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। এই বিষয়ে সত্যজিৎ রায় নিজেই লিখেছেন, ‘বাবার সন্দেশের চেহারাটা ঠাকুরদার সন্দেশের থেকে অনেক আলাদা হয়ে গেল। শিশুদের পত্রিকা থেকে হঠাৎ কিশোরদের পত্রিকা হয়ে উঠল।’
‘সন্দেশ’ সম্পাদনাকালে যে দু’জনকে পাশে পেয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর— তাঁরা সুকুমার রায় ও সুবিনয় রায়। প্রথম পর্যায়ে সুকুমারের মৃত্যুর পর এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স দেউলিয়া হলে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার হাল ধরেছিলেন সুবিনয়। সম্পাদনার পাশাপাশি তিনিও হয়ে উঠেছিলেন সন্দেশের অন্যতম লেখক। লেখকদের মনে ছবি আঁকা ও লেখার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলার জন্যেই তিনি সূচনা করেছিলেন চিত্র প্রতিযোগিতা। এখনও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ইত্যাদি প্রতিযোগিতার যে ধারা দেখা যায়, তা ‘সন্দেশে’র চিত্র প্রতিযোগিতার ফল বলেই অনেকে মনে করেন।
অনেক সম্পাদককে দেখা গেছে পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটা লেখকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ‘সংবাদ প্রভাকর’, বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’, রবীন্দ্রনাথ ‘সাধনা’, ‘ভারতী’ প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি লেখক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। এঁদের কাজই ছিল বিভিন্ন ধরনের লেখা দিয়ে পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যা ভরিয়ে তোলা। ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদক হিসাবে উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সুবিনয় প্রত্যেকেই নিজস্ব লেখক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন। তাঁরা ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় লিখতেন, অন্যান্য কাজে যুক্ত থাকতেন। সেই গুণীজনেরা বাংলা সংস্কৃতিতে ‘সন্দেশী’ নামে পরিচিত।
সত্যজিৎ নিজে উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমারের মতো লেখক গোষ্ঠী তৈরি করেননি। তবে লেখক হিসাবে রায়বাড়ির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সুখলতা রাও, পুণ্যলতা চক্রবর্তী, সুবিমল রায়, লীলা মজুমদার, নলিনী দাশ প্রমুখ। আমন্ত্রিত লেখক ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, অন্নদাশংকর রায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়রা। সত্যজিৎ ‘সন্দেশ’ সম্পাদনাকালে অনেক নতুন লেখককে সুযোগ দিয়েছেন। অনেক তরুণ লেখক তাঁর হাতে পরিপূর্ণতা পেয়েছেন। এই পর্যায়ে যে সমস্ত লেখা সম্পাদকীয় দপ্তরে আসত, সত্যজিৎ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সেগুলির গুণগত মান বিচার করে তবেই ছাপাতেন। প্রয়োজনে ভুলটা ধরিয়ে লেখককে দিয়েই সংশোধন করাতেন।
উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমারের মতোই সত্যজিতের কাজ ছিল পত্রিকার অলংকরণ, প্রচ্ছদ ইত্যাদি করা। ছোটোদের পত্রিকায় প্রচ্ছদ ও অলংকরণ যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক। তাই ১৯৬১ সালের প্রথম সংখ্যায় (মে) তিনি এঁকেছিলেন একটা ক্লাউন এক পায়ে ভর দিয়ে অন্য পা তুলে এক গাল হাসছে। তার হাতে এক হাঁড়ি সন্দেশ—হাঁড়ি থেকে গোল গোল সন্দেশ উপচে পড়ছে। শুধু অভিনব প্রচ্ছদ নয়, অন্যের লেখার সঙ্গেও ছবি আঁকতেন, অলংকরণ করতেন সত্যজিৎ। পরপর তিন বছর ভারত সরকার থেকে ছাপা ও অঙ্গসজ্জার উৎকর্ষের জন্য প্রশংসাপত্র পেয়েছিল ‘সন্দেশ’। অনেক সময় ব্যস্ততার মধ্যে নিজে না পারলে তিনি নির্দেশ দিতেন কীভাবে প্রচ্ছদ, লে-আউট বা পাতা সাজাতে হবে। উপেন্দ্রকিশোরের আমল থেকেই ‘সন্দেশ’ আর্থিক সংকটে ভুগছিল। তাই বলে উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমার সম্পাদিত পত্রিকাকে সত্যজিৎ কখনো খাটো করে দেখেননি। তবে তিনি বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে আর্থিক সংকট মোচনের চেষ্টা করেছেন। ‘সন্দেশ’-এর রজত জয়ন্তী উৎসবে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘আমাদের জোরটা হচ্ছে লেখায়, বাইরের চেহারায় নয়। গ্রাহক-গ্রাহিকারা যদি দেখে যে রংচঙে কাগজের চেয়ে এই সাদা-কালো পত্রিকার লেখার মান উঁচু, তাহলে তারা ‘সন্দেশে’র দিকেই ঝুঁকবে।’
সুকুমারের মতো সত্যজিৎও নিত্যনতুন বিষয়ে শিশু-কিশোরদের উৎসাহিত করেছেন। এই জন্য নতুন নতুন বিভাগ খুলেছিলেন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ধাঁধা, ছড়া, কল্পবিজ্ঞান, গোয়েন্দা কাহিনি ছাড়াও ‘আশ্চর্য প্রাণী’ নামে মাসে মাসে লেখা বেরিয়েছে। এক্ষেত্রে সত্যজিৎ, সুকুমারের মতো দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গ্রন্থ পড়ে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে সহজ, সরল বাংলায় লিখেছেন। এই সময় ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় দু’টি নতুন ধারার সূচনা হয়। একটি ‘প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর’, অন্যটি ‘হাত পাকাবার আসর’। প্রথম পর্যায়ে প্রকৃতি সম্পর্কে ধ্যান-ধারণা ছাড়াও হাতে কলমে প্রকৃতিকে জানা বা বোঝার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে শিশু-কিশোররা ভালো লেখা ও ছবি আঁকার জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করে যাবে। এই দু’টি পর্যায়ের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের উৎসাহিত করাই ছিল সত্যজিতের মূল লক্ষ্য। এ ছাড়াও ‘সন্দেশ’-এ সত্যজিৎ ‘ভুল ছবি’ ছাপিয়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ভুলগুলো খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতা শুরু করিয়েছিলেন। সুকুমার বা উপেন্দ্রকিশোরের মতো সত্যজিতেরও লক্ষ্য ছিল শিশু-কিশোরদের মধ্যে ঔৎসুক্য বাড়ানো। গল্পকে কেন্দ্র করে ‘কমিক স্ট্রিপ’ তৈরি সেই কারণেই। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, উপেন্দ্রকিশোর সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ প্রকাশের প্রথম দিনটির কথা। লীলা মজুমদার লিখেছেন, ‘সন্দেশ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি হাতে করে উপেন্দ্রকিশোর ২২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে বসবার ঘরের দরজার কাছে হাসিমুখে দাঁড়ালেন। অমনি ঘরময় একটা আনন্দের সারা পড়ে গেল। সেই সময় সেই ঘরে যে ক’জন মানুষের উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল, তারা কেউই বোধহয় জীবনে কখনো সে সন্ধ্যার কথা ভুলতে পারবে না। ‘সন্দেশ’-এর প্রকাশন শিশু সাহিত্যের জগতে একটা নতুন দিনের উদ্বোধন করে দিয়েছিল হঠাৎ যেন এক দিনের মধ্যে বাংলার শিশু সাহিত্যের সমস্ত দৈন্য ঘুচে গিয়ে সে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠল।’
কেন লেখালিখির জগতে, কেনই বা ছোটোদের জন্যে লেখা। এই বিষয়ে সত্যজিৎ অপর্ণা সেনকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘... ছোটবেলায় যে সব গল্প পড়েছি, বা মার কাছে শুনেছি—কোনান ডয়েল-টয়েল ইত্যাদি—খুব অল্প বয়সেই আমি শার্লক হোমস পড়েছি, বোধ হয় স্কুলে থাকতে থাকতে—তারপর নিজে আমি Boy’s Own Paper-এর গ্রাহক ছিলাম, সেটা একটা ছোটোদের ম্যাগাজিন ছিল এই ভাবেই আর কি—।’ ১৯৬১ থেকে টানা একত্রিশ বছর ধরে বাপ-ঠাকুরদার স্বপ্নের পত্রিকাকে তিনি যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তা সহজাতই বটে।
প্রকাশের পর থেকে একাধিকবার ‘সন্দেশ’ বন্ধ হয়েছে, আবার নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে। সেই দিক থেকে সত্যজিতের সম্পাদনা পর্বকে বলা যায় চতুর্থ পর্যায়। প্রথমেই বলেছি সুকুমার রায়ের মৃত্যুর পর সন্দেশ সম্পাদনার ভার পড়েছিল কাকা সুবিনয় রায়ের উপর। সেই সময় ১০০ নং গড়পার রোডের দোতলায় সন্দেশ ছাপা হত। দুপুরবেলায় বাড়ির ছাপাখানায় ঘুরে বেড়াতেন সত্যজিৎ। নিঝুম দুপুরের রহস্যময় ছাপাখানার শব্দ আলো-আঁধারের খেলা তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আকর্ষণ করত। প্রেসের তারপিন তেলের গন্ধ আর আলো-আঁধার পেরিয়ে প্রেসকর্মী রামদহিনের কাছে চলে যেতেন তিনি। যত আবদার, সবই যেন রামদহিনের কাছে। মাঝে মাঝেই কাগজে হিজিবিজি এঁকে প্রেসকর্মী রামদহিনকে বলতেন, ‘রামদহিন, এটা সন্দেশে বেরবে?’ রামদহিন তক্ষুনি মাথা নেড়ে বলে দিতেন, ‘হ্যাঁ, খোকাবাবু হ্যাঁ।’ ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড়ো হয়েছেন। তাঁদের পরিবারের অনেকেই, বিশেষত লীলা মজুমদার, নলিনী দাশ প্রমুখ সাহিত্য-সৃজনে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে ছাপাখানার সঙ্গে পরিচিতি, জন্ম থেকেই ব্লক মেকিং, ছবি তোলার কাজ সবই গড়পারের বাড়িতে দেখেছেন। ‘যখন ছোট ছিলাম’ বইতে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘যে বাড়িতে আমার জন্ম, সেই একশো নম্বর গড়পার রোডে আমি ছিলাম আমার পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর অনেক বাড়িতে থেকেছি, আর সবই দক্ষিণ কলকাতায়, কিন্তু গড়পার রোডের মতো তেমন একটা অদ্ভুত বাড়িতে আর কখনো থাকিনি।’ মাঝে মধ্যে অর্থাভাব বা অন্য কারণে অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হলেও ‘সন্দেশ’ ‘সন্দেশ’ই। এর কোনো বিকল্প নেই। ‘সন্দেশ’ প্রকাশের আগে ও পরে কোনো পত্রিকাই শিশু মনের মুক্তি দেয়নি। কিংবা শিশু মনের গভীর অনুভূতিকে খুঁজে বার করেনি। শিশুরা যে বড়োদের ক্ষুদ্র সংস্করণ, এটাই সেই সময়ের পত্রিকা-সম্পাদকরা বুঝেছিলেন। শিশুদের যে সম্পূর্ণ আলাদা মন, চিন্তা-চেতনা আছে, তাদেরও যে আলাদা জগৎ আছে এটা কেউই বুঝতে পারেনি। ব্যতিক্রম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনিই প্রথম অনুভব করেন শিশুদের পত্রিকার জন্য দরকার শিশুসুলভ মানসিকতা। শুধু বিষয় নয়, অলংকরণ-প্রচ্ছদ পরিকল্পনা সব কিছুই যে শিশুমনের হওয়া উচিত তা প্রথম বুঝেছিলেন তিনি। তারই বহিঃপ্রকাশ ‘সন্দেশ’।
সত্যজিতের আগে শুধু উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সুবিনয়রা নয়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার, নলিনী দাশ, বিজয়া রায়ও বিভিন্ন সময়ে ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা করেছেন। এখন সম্পাদক সন্দীপ রায়। রায়বাড়ির কেউ কোনোদিন পত্রিকা বিক্রির মানসিকতা নিয়ে সাহিত্য রচনা বা পত্রিকা সম্পাদনা করেননি। এই বিষয়ে লীলা মজুমদার জানিয়েছেন, ‘উপেন্দ্রকিশোরের সময় সন্দেশ থেকে এক পয়সা লাভ হত না। ছোটদের পত্রিকা বা বই থেকে লাভের কথা তাঁরা ভাবতেও পারতেন না। ওই সুন্দর কাগজ, বহু রাঙা ছবি, সাদা-কালো ছবি, চমৎকার মলাট, নিজের ছাপাখানায়, নিজের খরচে প্রকাশিত হত। দাম ছিল তিন আনা।! পত্রিকার জন্য উপেন্দ্রকিশোর নিজের ট্যাঁকের পয়সা খরচ করেছেন। ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স বিক্রি হয়ে গিয়েছে। সুকুমার রায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন, তবুও হাল ছাড়েননি। তিনি তো পত্রিকার কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভগ্ন শরীরে পত্রিকার লে-আউট, প্রচ্ছদ, প্রুফ সংশোধন সর্বোপরি প্রত্যেক সংখ্যার জন্যে নতুন লেখা তৈরি করেছেন। এমনকি মৃত্যুশয্যাতেও। আর সত্যজিৎ? প্রথমবার হার্ট অ্যাটাকের সময় কথা বলা, পড়াশোনা সবই নিষেধ ছিল। তবুও নলিনী দাশকে একটা ছোটো কাগজে লিখে জানিয়েছিলেন, ‘নববর্ষ সংখ্যার লে-আউট কিন্তু আমি নিজে হাতে করব।’
লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক