


সোমজা দাস: গ্রামটার নাম একটু খটোমটো, বারবার ভুলে যায় করবী। কাল রাতেও অনন্তবাবু ফোন করে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। ভদ্রলোক জেলাস্তরের বেশ প্রভাবশালী নেতা। বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু দু’-একবার গিয়ে মুখটা দেখিয়ে আসবেন। জিতব আমরাই।’
করবী তখনও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। বলেছিল, ‘আমি রাজনীতির কিছুই বুঝি না অনন্তবাবু। কীভাবে কী...।’
অনন্তবাবু আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘আহা, আপনি শুধু গিয়ে দাঁড়াবেন ওদের সামনে। সম্ভব হলে আপনার ফিলিমের একটা কি দুটো গান গেয়ে শোনাবেন। বাকিটা আমাদের উপর ছেড়ে দিন।’
‘গান? আমি তো গান জানি না!’
‘জানতে হবে না। কোনো হিট গান দু’ কলি যেমন-তেমন করে গাইলেই ওরা খুশি। ফিলিমের নায়িকাকে জলজ্যান্ত সামনে থেকে দেখবে, আবার কী চাই! একটা দামি দেখে শাড়ি পরবেন। ভালো করে সেজেগুজে যাবেন।’
‘দামি শাড়ি! কিন্তু সেরকম করলে ওরা আমাকে ওদের লোক বলে মনে করবে কেন?’
করবীর বালখিল্য প্রশ্নে বুঝি বিরক্ত হলেন অনন্তবাবু। বললেন, ‘নিজেদের লোক প্রয়োজন হলে তো লোকাল নেতাদেরই কাউকে টিকিট দেওয়া হত। হাইকমান্ড যখন আপনাকে টিকিট দিয়েছেন, তার একটা কারণ তো আছে। শুনুন ম্যাডাম, আপনার কেন্দ্রের আন্ডারে যে ক’টা গ্রাম পড়ছে, পুরোটাই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। ভীষণ গরিব এখানকার মানুষেরা। ওদের জীবনে প্রায় কিছুই নেই। খাবার নেই। আলো নেই। রাস্তা নেই। অথচ সিনেমা হল আছে। কেন জানেন? সিনেমা ওদের স্বপ্ন দেখায়। যা যা ওরা পেতে পারে না, তাই দেখে তিন ঘণ্টা হলের অন্ধকারে ভুলে থাকে। আপনি ওদের সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। ওদের মতো হতে চাইলে আপনাকে আর পছন্দ হবে না ওদের। বুঝলেন কি না?
বুঝেছিল করবী। মেনেও নিয়েছিল। সত্যি বলতে কি, রাজনীতিতে আসার কোনোরকম ইচ্ছে কোনোকালেই ছিল না তার। বরং বিগত প্রায় কুড়ি বছরের অভিনয় জীবনে রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সান্নিধ্য এড়িয়েই এসেছে বরাবর। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা অন্যরকম। নিতান্ত দায়ে পড়েই...।
দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট চেপে ধরল করবী। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। আরেকবার কাজল বুলিয়ে নিল চোখে। নামি ফ্রেঞ্চ ব্র্যান্ড। এক টানেই চোখের যাবতীয় ক্লান্তি লুকিয়ে ফেলতে পারে। কনসিলারে ঢেকে যায় কালসিটে। দামি সানগ্লাসটা চাপিয়ে নেয় করবী তার উপর।
।। দুই ।।
‘মোট তিনটে জনসভা আছে ম্যাডাম। আপনি শুধু যাবেন। পনেরো-কুড়ি মিনিট করে একেক জায়গায় থাকলেই হবে। বাকিটা আমাদের ছেলেরা সামলে নেবে। তারপর ধরুন, গ্রামের রাস্তায় একটু ঘুরলেন। হাত-টাত নাড়লেন। এখানে একটা বাড়িতে দুপুরের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে...।’
‘আবার খাওয়া দাওয়া কেন? আমি বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসেছি।’
‘ওটুকু তো করতেই হবে ম্যাডাম। মানে আপনাকে আর কী বোঝাব...হে হে... সিনেমায় তো অ্যাক্টিং করেনই। মনে করুন এটাও অ্যাক্টিং। বেশি খেতে হবে না। একটু বসবেন আসনে। একটা কিছু তুলে মুখে দিলেন। ছবি টবি তোলা হল। ব্যস!’ বললেন অনন্তবাবু। এই এলাকায় ভদ্রলোকের যে বেশ দাপট আছে, তা এখানে এসে ভালোই বুঝতে পারছে করবী। বিশাল চারতলা বাড়ি, পুরোটাই মার্বেলে মোড়া। এই অজ পাড়াগাঁয় এমন প্রাসাদ দেখে বেশ অবাকই হল। মুখে প্রকাশ করল না যদিও।
পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছে করবীকে একবার শুধু চোখের দেখা দেখবার জন্য। যে দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে সে, তাদের সম্পর্কে কিছু ভালো কথা, বিরোধী দলের অপদার্থতা নিয়ে আরও কয়েক পঙ্ক্তি শব্দ খরচ করতে হল। সামনের সারির জনতা উশখুশ করছে। অনন্তবাবু পাশ থেকে ফিসফিস করে বললেন, ‘গান করুন ম্যাডাম। গান।’
করবীর মুখ গম্ভীর হল মুহূর্তের জন্য। পরের মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে তার সবচেয়ে আকর্ষনীয় হাসিটা ভাসিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনারা আমার ছবি দেখতে ভালোবাসেন?’
প্রবল কোলাহল। সমবেত চিৎকার—হ্যাঁ, হ্যাঁ।
‘‘তাহলে আপনাদের জন্য আমার ছবি ‘শক্তিরূপিণী’ থেকে দুটো লাইন বলছি,’’ বলে একটু চুপ করে রইল করবী। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তারপরেই সম্পূর্ণ বদলে গেল তার শরীরী ভাষা, এমনকি গলার স্বরও। বলে উঠল, ‘আমরা মেয়েরা মা দুর্গার অংশ। চাইলে লক্ষ্মী হতে পারি, আবার চণ্ডীও হই প্রয়োজন পড়লে। মেয়েদের দুর্বল ভাবার ভুল কোরো না সাহেব। তাতে তুমি নিজেই ঠকবে।’
করতালিতে ভেসে গেল জনসমুদ্র। সবাই আপ্লুত। মুগ্ধ। কিন্তু কে জানে কেন খুব ক্লান্তি লাগছে করবীর। মাথার ভেতরে ঝড় চলছে। করবীর স্বামী অপরেশ একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁদের প্রোডাকশন হাউস ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’-এর একটি ছবির শ্যুটিং চলাকালীন মাস ছয়েক আগে ছবির নায়িকা মৈত্রেয়ী গ্রিনরুমে হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করে। মৈত্রেয়ীর সঙ্গে সেই সময়ে অপরেশের সম্পর্ক নিয়ে মিডিয়ায় জোর চর্চা হয়েছিল। সেসব মুখরোচক কাহিনির সবটা যে মিথ্যে নয়, তা খুব ভালো করেই জানত করবী। জেনেশুনে চুপ করে থাকাই দস্তুর এসব ক্ষেত্রে। নিজেকে বোঝানো, এরকম তো হয়েই থাকে। অপরেশ ছিল নির্বিকার। মৈত্রেয়ীর মৃত্যুর চেয়েও ওকে বেশি ভাবাচ্ছিল তার হাউসের ভবিষ্যৎ এবং নিজের বদনাম।
‘ইমেজটাই এখন বড়ো হল তোমার কাছে?’ জিজ্ঞাসা করেছিল করবী, ‘এসবে জড়ানোর আগে ভাবোনি?’
‘চুপ! একদম চুপ!’ লাফিয়ে এসে চেপে ধরেছিল অপরেশ তার চুলের মুঠি। তারপর হিসহিস করে বলেছিল, ‘প্রোডাকশন হাউস আমার একার নয়। ব্যাবসায় টাকা তোমারও খাটছে করবীরানি। তাই বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না। গেলে আমার একার যাবে না, মনে রেখ।’
অন্য সময় হলে ইলেকশনে লড়ার প্রস্তাবটাকে অন্যান্যবারের মতোই হেসে উড়িয়ে দিতে পারত করবী। কিন্তু এবারে পারেনি। অপরেশ বুঝিয়েছিল, ‘এটা আমাদের সুযোগ। একবার জিতে গেলে সব তদন্ত-টদন্ত ধামাচাপা পড়ে যাবে। হ্যাঁ বলে দাও ওদের।’
‘তুমি জানো, আমি রাজনীতির কিছুই বুঝি না। ভালোও লাগে না।’
‘বেশি ন্যাকামো কোরো না তো! একটা কথা বুঝে নাও। তুমি এখন একজন ফুরিয়ে যাওয়া অ্যাকট্রেস। লাইমলাইট যদি চাও, এখন একটু এফর্ট দাও।’
অনেক কথা জলোচ্ছ্বাসের মতো ঝাঁপিয়ে এসেছিল ঠোঁটের আগায়। নিজেকে সংযত করেছে করবী। উত্তর দিতে ইচ্ছে হয়নি বলে, নাকি প্রবল ঘৃণায়, তা সে নিজেও জানে না। চাইলে সংসার ভাঙতেই পারত। কিন্তু ‘ইমেজ’-এর চিন্তা তো তারও ছিল। তাছাড়া যে সংসারটা বহুদিন ধরেই একটা লোকদেখানো কাঠামো ছাড়া আর কিছু নয়, সেটাকে নতুন করে ভাঙতে বসা শুধুই শক্তিক্ষয় বলে মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে কিংবা হয়তো স্বার্থও ছিল। ফুরিয়ে যাওয়া অভিনেত্রীর নামের পাশে বড়ো হাউসের ব্র্যান্ডনেমটার দরকার ছিল তারও।
।। তিন ।।
সভা শেষ করে গ্রামের রাস্তায় নামল করবী। রাস্তার দু’পাশে জনতার ভিড়। কতদিন পরে এত মানুষ শুধু তাঁকে দেখতে এসেছে। ভালো লাগে করবীর। তাঁর পাশে পাশেই হাঁটছেন অনন্তবাবু। একে ওকে নাম ধরে ডেকে কুশল প্রশ্নাদি করছেন। সঙ্গে পা মেলাচ্ছে আরও জনা পঞ্চাশ বিভিন্ন বয়সের পার্টিকর্মী।
একটা মাটির বাড়ির সামনে এসে থেমে গেল ভিড়টা। অনন্তবাবু বললেন, ‘এখানে ম্যাডাম। এই বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া হবে।’ একটু থমকাল করবী। বাড়ি বলতে মাটির একচালা ঘর একখানা, টালির ছাদ। এক কোণে বাঁধা একটা গোরু। বাছুরটা মাটিতে বসে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে অতিথি অভ্যাগতদের দিকে। যেন বলছে— তোমরা কে গো? এখানে কেন?
একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে গিয়ে গলা তুলে হাঁক পাড়ল, ‘মঙ্গলা! এই মঙ্গলা! কোথায় রে?’
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা বাচ্চা মেয়ে। করবীকে দেখে চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। বলল, ‘মা ভেতরে আছে। রান্না কচ্ছে। তুমরা আসো।’
করবীকে নিয়ে অনন্তবাবু এগলেন। পেছনে পেছনে ঢুকল ভিড়টা। মাটির বারান্দা তকতকে করে নিকোনো। ঘোমটা টানা এক মহিলা বেরিয়ে এল। মুখে সহজ হাসি। করবীও হাসল। বলল, ‘ভালো আছেন তো? এভাবে এসে আপনাদের বিপদে ফেললাম।’
‘না, না’, অস্ফুট ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠল মঙ্গলা নামের বউটি।
‘না বললে হবে? আমি এখানে এসেছি তোমাদের অভাব, অভিযোগ শুনতে। সেসবের নিষ্পত্তি করতে। উলটে তোমাকেই এখানে রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে আমার জন্য।’
কথাটা বলেই একটু থমকাল করবী। সে কবে এভাবে কথা বলতে শিখল! ফাঁপা অনুভূতি, শব্দের দেখনদারি। অথচ সেই বলাটুকুর সঙ্গে অন্তরের সত্যিকারের যোগ তো নেই কোনো। মঙ্গলা হাসল একটু। চোখের কোণের চামড়ায় হাঁসের পায়ের মতো আঁকিবুকি। মনে হল, ছোটোখাটো চেহারা বলে দেখতে যত কমবয়সি বলে মনে হচ্ছিল, বয়স ততটাও কম নয়। বলল সে, ‘আপনি আসেন দিদি। ভেতরে আসেন।’
বারান্দার উপরে বিছানো চাটাই। তিনজনের বেশি বসার মতো স্থান সংকুলান নেই। বাকিরা দাঁড়িয়েই রইল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট জ্বলছে একের পর এক। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে মশলার গন্ধ। কিছু স্থানীয় সংবাদপত্রের রিপোর্টার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও হাজির হয়েছে। তাদের প্রশ্নের উত্তর যতটা সম্ভব গুছিয়ে দিল করবী। অনন্তবাবুর মুখে কান এঁটো করা হাসি। একটু কাছে ঘেঁষে এসে গলা নামিয়ে বললেন, ‘ভালো হচ্ছে। চালিয়ে যান।’
লোকটার এই গায়ে পড়া ব্যাপারটা ভালো লাগছে না করবীর। উঠে দাঁড়িয়ে ‘আমি একটু দেখে আসি ভেতরে’ বলে রান্নাঘরের দিকে এগল সে। মেঝের উপর পিঁড়ি পেতে বসে রান্না করছিল মঙ্গলা। করবীকে ঢুকতে দেখে বলল, ‘এখানে খুব গরম। আপনার কষ্ট হবে। হয়ে গেছে রান্না। শুধু পটলভাজাটা বাকি। হলেই দিয়ে দিচ্ছি খেতে।’
‘খাওয়ার জন্য তাড়া নেই আমার,’ হেসে বলল করবী। তুমি ওঠো দেখি। আমি ভাজি।
মঙ্গলা আপত্তি করতে গিয়েও চুপ করে গেল। করবীর দিকে এগিয়ে দিল হাতে ধরা খুন্তিটা।
খুশি হল করবী। সেই বিয়ের পর পর যখন নতুন সংসার, খুব শখ ছিল নিজে হাতে রান্না করার। অপরেশ একটা ছোটো প্রোডাকশন হাউসে অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করে। করবী নিজে অভিনয়ে আসবে ভাবেনি তখনও। সাজিয়ে গুছিয়ে সংসারটাই করতে চেয়েছিল। রান্নার বই দেখে নতুন নতুন রান্না শিখত। সবই যে ভালো হত তা নয়, তবে অপরেশ খুশি হত ভারী। জীবনটা তখনও আজকের মতো জটিল হয়ে যায়নি।
আজ কতদিন পর রান্না করছে সে। সামান্য পটলভাজা বই তো নয়! তবু ভালো লাগছে। মঙ্গলার এই ছোট্টো ঘর, এই নিকোনো উঠোন, বেড়ার ধারের পেয়ারা গাছখানি যেন বড়ো মনোরম। পটলগুলো উলটে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘যে মেয়েটিকে দেখলাম, তোমার মেয়ে?’
মাথা নাড়ল মঙ্গলা।
‘ওর বাবা কোথায়?’
‘নেই।’
কড়ার উপর হাতটা থেমে গেল করবীর। মঙ্গলার সিঁথিতে সিঁদুর নেই, আগেই লক্ষ করা উচিত ছিল। বলল, ‘ওহ, আমি বুঝিনি। কিছু মনে কোরো না।’
খিলখিল করে হেসে উঠল মঙ্গলা। বলল, ‘না না, ওর বাবা বেঁচে আছে। এখানে থাকে না। আমি থাকতে দেই নাই।’
‘কেন?’
‘মদ খেত খুব। নেশার ঘোরে গ্রামের একটা মেয়ের গায়ে হাত দিছিল। আর ঢুকতে দেই নাই বাড়িতে।’
‘বাড়ি থেকে বের করে দিলে? ভয় করল না?’
‘ভয়?’ মঙ্গলার কণ্ঠস্বরে প্রগাঢ় নির্লিপ্তি। বলল, ‘তা ভয় করত। বিয়ের পর থেকে খুব মারত লোকটা। মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিছে কতবার। আমিও ভাবতাম, স্বামী হয়। মারতেই পারে এট্টু। তারপর একদিন আর ভয় কল্ল না। সেদিন বুঝলাম, ভয় আসলে ওই লোকটাকে ছিলই না কোনোদিন। অভ্যাস। এই ঘর, উঠান, উনুন-হাঁড়িকুড়ি-রান্নাঘর, এই সব অভ্যাসকে হারাতে ভয় পেয়েছিলাম। আর ভয় ছিল লোকে কী বলবে! এখন আমি খেতমজুরির কাজ করি। ঘরের পেছনে এট্টুখানি জমিতে সবজি চাষ করি নিজে। হাঁস-মুরগি পালি। গোরু আছে। ডিম, দুধ, সবজি বেচি হাটে। আমাদের মা-বেটির চলে যায়। লোকটা নতুন সংসার করেছে। সেই বউকেও নাকি মারে খুব।’
‘একা থাকতে ভয় করে না?’
ফিক করে হাসল মঙ্গলা। মুখে বলল না কিছু। করবী জিজ্ঞাসা করল, ‘হাসলে যে?’
করবীর হাত থেকে খুন্তিটা নিয়ে পটলভাজাগুলো বাটিতে তুলতে তুলতে মৃদুস্বরে বলল মঙ্গলা, ‘একা তো সবাই দিদি। আপনিও। আমিও।’
করবী উঠে দাঁড়াল। চৌকাঠের সামনে দাঁড়াতে পেছন থেকে ডাকল মঙ্গলা।
‘দিদি...।’
ঘুরে তাকাল করবী। মঙ্গলা নিঃশব্দে তার রোদচশমাটা এগিয়ে দিল।
পরদিন খবরের কাগজে ছবি ছেপেছিল করবী সান্যালের। মঙ্গলার রান্নাঘরে বসে মাটির উনুনে রান্না করছে। কড়াইয়ের বস্তুটি পটলও হতে পারে। পোলাও হলেও আপত্তি করবে না কেউ। শুধু করবী জানে, এর পরেরবার গেলে মঙ্গলার বাড়িতে আর খেতে যাবে না সে ভুলেও। ওর সামনে দাঁড়ালে দামি কাঞ্জিভরম, রোদচশমা, বিদেশি ব্র্যান্ডের কাজল আর কনসিলারের আভরণ খসে পড়ে তার। নগ্নতাকে ভারী ভয় করবীর।