


ডাইনোসরের সমসাময়িক! অথচ আজও পৃথিবীতে টিকে আছে। গভীর সমুদ্রের সেই জীব সম্পর্কে জানালেন সোমা চক্রবর্তী।
সৃষ্টি ও ধ্বংস প্রকৃতির এক বিচিত্র লীলা। যেখানে সৃষ্টি, ধ্বংস সেখানে অনিবার্য। তবুও অস্তিত্ব রক্ষার প্রচেষ্টায় সকল জীবকুল সদা ব্যস্ত। ডারউইনের ভাষায়, ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’। এই প্রচেষ্টায় অনেক বড়ো বড়ো প্রাণী সফল না হলেও একটি ছোটো প্রাণী কিন্তু সফল হয়ে গিয়েছে। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আজও সে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে এই প্রকৃতির বুকে। নটিলাস। যখন ডাইনোসররা নিশ্চিহ্ন হল, যখন বনভূমি কয়লায় পরিণত হল, বরফ বারবার আচ্ছাদিত করল মহাদেশগুলোকে, তখনও নটিলাস টিকে ছিল এই
পৃথিবীর বুকে।
সুপ্রাচীন জীবজগতের সর্পিল খোলসযুক্ত এই প্রাণীটি যেন এক জীবন্ত ‘টাইম ক্যাপসুল’। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগের কথা, জলভাগে জন্মায়নি হাঙর, স্থলভাগে ছিল না কোনো পোকামাকড় কিংবা চতুষ্পদী প্রাণীদের পদচারণা, সেইসময়ও মহাসাগরের শীতল জলে, সমুদ্রের গভীরতম অংশে নীরবে সাঁতার কেটেছে নটিলাস। গ্রহাণুর আঘাতে বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের সময়ও সে টিকে থেকেছে।
নটিলাসের সুন্দর খোলসটি গ্যাস ভরা প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। এটি প্রকৃতির এমন এক অনবদ্য নিদর্শন, যা নটিলাসকে দিয়েছে ‘অলৌকিক’ কিছু ক্ষমতা। যেকোনো পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সমুদ্রের গভীরে সে যেমন ডুব দিতে পারে, তেমনই ভেসেও থাকতে পারে, আবার উপরেও উঠতে পারে। শুধুমাত্র এই খোলসটির কারণেই এই কাজগুলো করতে তাকে কোনো অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয় না। পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝে নিতে স্কুইড ও অক্টোপাস যখন গতি, বুদ্ধিমত্তা ও ছদ্মবেশের আশ্রয় নিয়েছিল, সেই সময় নটিলাস এক স্বতন্ত্র পথ বেছে নিয়েছিল। ফলত, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, পরিবেশ যেমনই হোক না
কেন নটিলাস অপরিবর্তিত ছিল এবং আজও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
অদ্ভুত এই প্রাণীটির তীক্ষ্ণ আঠালো খাঁজকাটা পৃষ্ঠযুক্ত ঠোঁটের চারপাশে দু’টি বলয়ের আকারে সাজানো ৯০টি শুঁড় আছে। এর সাহায্যে অন্ধকারেও তারা শিকারকে আঁকড়ে ধরতে পারে। শরীরের বিপাকক্রিয়াটি বড়ো ধীর হওয়ায় অতি স্বল্পখাদ্যেই জীবন ধারণ করতে পারে নটিলাস। চোষকবিহীন শুঁড়ের সাহায্যে খাদ্য বস্তুগুলোকে অনুভব করে নেয় অতি সহজেই। এদের খাদ্য তালিকায় থাকে সামুদ্রিক ছোটো প্রাণী।
সময় বদলেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলায় চ্যাম্পিয়ন নটিলাস এখন মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের সম্মুখীন। গভীর সমুদ্রে খনন, নানান সামুদ্রিক জিনিস সংগ্রহ, সমুদ্র জলের উষ্ণায়ন— এসব কিছু সহ্য করতে করতে জীবনের জয়গান গাওয়া নটিলাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, বেঁচে থাকা বা অস্তিত্ব রক্ষা মানে শুধু বড়ো হওয়া নয়, দ্রুততম হওয়া নয় বা বুদ্ধিমান হওয়া নয়। বাঁচার মতো বাঁচতে গেলে সহনশীল হতে হবে। ধরতে হবে ধৈর্য, অবলম্বন করতে হবে মৌনতা।