


রাজা ভট্টাচার্য: শুনছ! আরে কোথায় গেলে?’ অঞ্জলি বললেন, ‘দেখ কাণ্ড! দরকারের সময় আর এই মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না!’
কোল থেকে খুব সাবধানে তিন বছরের মেয়েকে খাটের উপর নামিয়ে দিলেন বটুক। শরীর দ্রুত আরও খারাপ হচ্ছে। সিগারেট কোম্পানিতে এজেন্টের কাজ করেন তিনি। ফলে এই শরীর নিয়েও বিস্তর ছোটাছুটি করতে হয় তাঁকে। পুরো পাটনা, তার আশপাশের শহর আর গ্রামে অনবরত ছুটে বেড়াতে হয়। এদিকে এই চুয়াল্লিশ বছর বয়সেই শরীর সঙ্গ দিতে চায় না। বাচ্চা মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করাটাও যেন একটা কঠিন পরিশ্রমের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেয়ে ভারতী অবশ্য সরসর করে খাট থেকে নেমে দৌড়ে গেল মায়ের কাছে। বাইরের ঘরের জানলার পাশে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন অঞ্জলি। মেয়েকে দেখে বললেন, ‘তোর বাবা কোথায় গেল রে?’
‘খাটে বসে আমাকে আদর কচ্ছিল। এখন নামছে। আসছে, দাঁড়াও।’
মেয়ের বলার ভঙ্গি দেখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল অঞ্জলির মুখে। এই বয়সেই পাকা বুড়ির মতো গম্ভীর হয়ে কথা বলে। হবে না? কার মেয়ে দেখতে হবে তো! সব কিছুই আগেভাগে।
একটু পরেই বটুক এসে দাঁড়ালেন দরজায়, ‘বল। ডাকছিলে আমায়?’
‘হ্যাঁ। একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে আজকের কাগজে। দেখেছ?’
‘কই, না! আমি তো শুধু ফার্স্ট পেজেই একটু চোখ বোলালাম। তার মধ্যে মেয়ে উঠে পড়ল, আমিও ভিতরে চলে গেলাম।’
এরকম অবসর বটুকের জীবনে কমই আসে। অন্যদিন সকালেই বেরিয়ে যেতে হয় তাঁকে। তাতেও অবশ্য সংসার চলে কোনোমতে। অভাব যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না।
বাঁকিপুর গার্লস হাই স্কুলে কথাবার্তা বলেছেন অঞ্জলি। শিক্ষিকার চাকরিটা বোধহয় হয়ে যাবে। ওটা হলে তবু সংসারে একটু সুসার হবে। নইলে উনি একা আর টানতে পারছেন না। এবার যদি এই...
‘এটা ভালো করে দেখ। সরকার থেকে বাসের পারমিট দিচ্ছে। আজ কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে।’
‘কই, দেখি?’ হাত বাড়িয়ে পেপারটা নিলেন বটুক। ছ’নম্বর পাতার নীচের দিকে বেরিয়েছে বিজ্ঞাপনটা, তাই তাঁর চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। এখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পুরোটা পড়লেন। সরকার থেকে বিভিন্ন রুটে বাস চালানো হবে। তার জন্য পারমিট দেওয়া হবে পাটনার পরিবহণ দপ্তরের অফিস থেকে। আগ্রহীদের উপযুক্ত কাগজপত্র সমেত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
পুরো বিজ্ঞাপনটা মন দিয়ে পড়ে চোখ তুলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন বটুক। তারপর সামান্য দিশাহারা গলায় বললেন, ‘পারমিট পাওয়ার পর কী করতে হবে, সে সব তো কিছু লেখা নেই। বাস কিনতে হবে? সে তো অনেক টাকার ব্যাপার। তারপর রোজকার খরচও প্রচুর। তেল আছে, দুটো-তিনটে লোক রাখতে হবে...।’
অঞ্জলি বাধা দিয়ে বললেন, ‘সে সব তো পরের কথা। নিশ্চয়ই সরকার থেকেই লোনের ব্যবস্থা থাকবে। আর এই ব্যবসায় প্রচুর লাভ। কত লোক বাসের ব্যবসা করে বড়োলোক হয়ে গেল! লোন শোধ করে দিতে কোনো সমস্যা হবে না। তুমি একবার গিয়েই দেখ না, কী বলে তারা!’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও বটুক বললেন, ‘আচ্ছা। আজ তো রোববার। অফিস-কাছারি সব বন্ধ থাকবে। কালকেই যাচ্ছি আমি।’
আসলে সরকারি অফিসে যাওয়া মানেই সারাটা দিন নষ্ট। এজেন্টের কাজ করে যাকে দিন চালাতে হয়, তার পক্ষে একটা গোটা দিন নষ্ট করা মুখের কথা নয়। সেদিনের মাইনেটা কাটা যাবে। সেই একদিনের মাইনেটাও এখন বটুকের কাছে বিরাট ব্যাপার। বিশেষত মেয়ে হওয়ার পর খরচ বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই। অঞ্জলি অবশ্য অসম্ভব বুঝেসুঝে, মেপেজুকে সংসার চালায়। একটাও ভালো শাড়ি নেই ওর, যা পরে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারে। অবশ্য কোনো অনুষ্ঠানে তাঁদের কেউ ডাকেও না, সেটা একটা বাঁচোয়া। কিন্তু কাজে-কর্মে তো বেরতেই হয়। তখনই সমস্যা।
তবু আজ অনেকদিন পর একটা আশার আলো দেখতে পেলেন বটুক। পরদিন সত্যিই অফিসে যাওয়ার বদলে একটু ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে ঠিক বেলা এগারোটার সময় তিনি পৌঁছে গেলেন পরিবহণ দপ্তরের অফিসে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন লোক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একটা বন্ধ ঘরের দরজার সামনে। খোঁজখবর নিয়ে বটুক জানতে পারলেন, এটি খোদ কমিশনারের ঘর। তাঁর অঙ্গুলি-হেলনেই ভাগ্যবানদের করায়ত্ত হবে সেই দুর্মূল্য পারমিট। আশপাশের নীচু গলার ফিসফাস থেকে বটুকের বুঝতে অসুবিধা হল না, বাসের রুটের পারমিট পাওয়া আর সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মালিক হয়ে যাওয়া প্রায় একই রকম ব্যাপার। লাইনে অন্য যাঁরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁরা সকলেই বিহারের লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যবসায়ী। সবার হাতেই একটা করে ফাইল। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, এঁরা তৈরি হয়েই এসেছেন। জানেন— এই কাজের জন্য কোন কোন কাগজপত্রের প্রয়োজন হবে। বটুকের এ’সব কিছুই জানা নেই। তিনি খালি হাতেই চলে এসেছেন। লাইনের অন্যান্য মানুষেরা তাঁর দিকে একটু অবাক হয়ে আড়চোখে তাকাতে লাগলেন।
প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষার পর ভিতর থেকে একজন আর্দালি বেরিয়ে এসে একে একে দর্শনার্থীদের ডাকতে লাগলেন। বটুক ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
একটু পরে তাঁরও ডাক পড়ল। আজ প্রথম কোনো সরকারি দপ্তরের বড়ো সাহেবের মুখোমুখি হলেন বটুক। আর ভিতরে ঢুকেই তাঁর চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল।
মস্ত বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে অসম্ভব দামি চেয়ারটায় পায়ের উপর পা তুলে যিনি বসে আছেন, তাঁর পরনে নিখুঁত নিভাঁজ স্যুট। টাইটা পর্যন্ত যথাস্থানে রয়েছে। ঝকঝকে ইংরেজিতে ভদ্রলোক বললেন, ‘ইয়েস জেন্টালম্যান, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ? হোয়্যার ইজ ইওর ফাইল?’
একটা নিঃশ্বাস ফেললেন বটুক। দেশ স্বাধীন হয়েছে সাত বছর আগে। দেশের দায়িত্বে এখন রয়েছেন ভারতীয়রাই। অথচ এই মুহূর্তে বটুকের সামনে বসে রয়েছেন একজন নিখুঁত সাহেব। শুধু তার গায়ের রংটি কালো— এইটুকুই যা পার্থক্য।
এত চেষ্টার পরেও কিছুই পালটাল না তাহলে? এখনও তাঁকে ইংরেজিতেই উত্তর দিতে হবে?
বটুক বললেন, ‘আমি তো কোনো ফাইল আনিনি! কোনো কাগজের কথা তো বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল না!’
বড়োসাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল। সামান্য বিরক্ত গলায় তিনি বললেন, ‘এই কাজের কোনো অভিজ্ঞতা আছে আপনার? অন্য কোনো ব্যবসা...।’
‘নো!’ বললেন বটুক, ‘নট অ্যাট অল।’
‘কী আশ্চর্য! তাহলে আপনি এসেছেন কেন?’
‘এক্সপিরিয়েন্স লাগবে, এমন কিছুও তো লেখা ছিল না!’
‘বয়স কত আপনার?’
‘চুয়াল্লিশ।’
‘তা কিছু তো করেন! এখন কী করেন আপনি?’
‘সিগারেট কোম্পানিতে এজেন্টের কাজ করি। সেটাও এই বছর ছয়েক হল।’
‘তার আগে কী করতেন?’
মুহূর্তের জন্য বটুকের চোখে ফুটে উঠল একটা লম্বাটে ঘর। সামনে লোহার নির্মম গরাদ। তার বাইরে বারান্দা। তারও ওপাশে, অন্য আর একটা লম্বাটে প্রকাণ্ড ইমারতের ছাদের উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘন নীল, প্রায় কালো রঙের জল। সমুদ্রের অনন্ত জলরাশি। আর সেই ঘরে, লোহার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তাঁর গলা থেকে হাত, আর কোমর থেকে পা পর্যন্ত মোটা শিকল। নড়তে চড়তে গেলে ঠং ঠং করে শব্দ হয়। পিঠে বড়ো বড়ো দগদগে ঘা। ওগুলো চাবুকের দাগ থেকে হয়েছে। সর্বাঙ্গে বিষ-ব্যথা। নারকোলের ছোবড়া থেকে দড়ি বানিয়ে বানিয়ে দু’হাতেও ঘা। সেগুলো থেকে পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে। ক্রমাগত কাশছেন তিনি... আর প্রত্যেক কাশির দমকের সঙ্গে ঝনঝন করে উঠছে শিকল।
‘আমি... আমি তো সেই উনিশ বছর বয়েস থেকেই জেলে। তাই তার আগে সে’ভাবে কিছু করিনি।’
‘জেল খেটেছেন?’ চমকে উঠলেন অফিসার সাহেব, ‘কী সাংঘাতিক! কী করেছিলেন? চুরি না ডাকাতি?’
আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন তিনি। আজকাল খুব হচ্ছে এটা। এবার তাঁর চোখে ভেসে উঠছে অন্য একটা দৃশ্য। সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলি হল। দোতলায় দর্শকের আসনে বসে আছেন তিনি। একটু পরেই পেশ করা হবে ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট। ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে দুটো বোমা বিস্ফোরণ হল সংসদের ঠিক মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায়। মুহূর্তে ধোঁয়ায় ভরে গেল বিশাল হলটা। পালাচ্ছে সবাই প্রাণ হাতে নিয়ে। আর তিনি দু’হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন রাশি রাশি ইশতেহার, সেই সঙ্গে চিৎকার করে চলেছেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ! বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!’ পালানো যেত। অনায়াসেই সেই ভীত সন্ত্রস্ত পলায়মান জনতার ভিড়ে মিশে পালিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু পালাবেন বলে তো আসেননি তাঁরা!
‘একা করেছিলেন? না সঙ্গে আরও কেউ ছিল?’
সংবিৎ ফিরে এল বটুকের। ফিসফিস করে বললেন, ‘ছিল তো! আরও ছিল সবাই।’
‘নাম কী আপনার? পুলিশ কেস থাকলে...।’
‘আমার নাম বটুকেশ্বর। বটুকেশ্বর দত্ত।’ মৃদু গলায় বললেন বটুক।
ভুরু কুঁচকে গেল কমিশনারের। এই নামটা কেমন যেন পরিচিত বলে মনে হচ্ছে তাঁর। কোথায় যেন শুনেছেন। কোন সূত্রে নামটা শুনেছেন? নাহ্, মনে পড়ছে না।
‘এনি ওয়ে, কীসের কেস ছিল?’
‘আমি... আমি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলাম। সেই ব্যাপারেই...।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, এবার বুঝেছি।’ বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লেন কমিশনার সাহেব, ‘সেই ব্যাপারে জেলে যেতে হয়েছিল।’
আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন বটুকেশ্বর। তাঁর চোখে গাঢ় অবিশ্বাস। এরা তাঁকে ভুলে গিয়েছে! তাঁর নামটা পর্যন্ত জানে না এরা! এই ক’বছরের মধ্যেই নামটা পর্যন্ত...!
‘কোনো ডকুমেন্ট আছে আপনার কাছে? কোনো কাগজ বা সার্টিফিকেট? আপনি যে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন, তার কোনো প্রমাণপত্র?’
আবার মাথা নাড়লেন বটুকেশ্বর। না। দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে কালাপানি ঘুরে এসেছে, যার ছোঁড়া বোমার শব্দে কেঁপে উঠেছিল শুধু পার্লামেন্ট বিল্ডিং নয়, গোটা ভারতবর্ষ। আন্দামান থেকে যে টিবি রোগ নিয়ে ফিরে এসেছিল অসহ্য অত্যাচারের ফল হিসেবে, তারপর সেই অবস্থাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অসহযোগ আন্দোলনে, ফলে আবার জেল!
প্রমাণ জোগাড় করে রেখে যে এসব করার কথা ছিল, তা তাঁর জানা ছিল না সেদিন। কই, ভগৎ সিং বা শুকদেব, চন্দ্রশেখর আজাদ বা রাজগুরু— ওরা এমন কিছু বলেননি তো! ওঁরা যে গান গাইতে গাইতে, স্লোগান দিতে দিতে, হাসিমুখে ফাঁসিকাঠে ঝুলে পড়লেন— তাঁর প্রমাণ রেখে গিয়েছিলেন? পার্কের ভেতরে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মারা গিয়েছিলেন চন্দ্রশেখর। তার প্রমাণ রাখা আছে তো? যতীন দাস যে না খেয়ে মারা গেলেন... নইলে যে এরপর লোকে সে-সবও ভুলে যাবে!
‘না। কোনো ডকুমেন্ট তো দেয়নি কেউ! কোনো জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় কোনো সার্টিফিকেট তো পাইনি!’ অসম্ভব ম্লান হাসলেন বটুকেশ্বর, ‘খেয়ালই করিনি, একদিন স্বাধীন দেশের কোনো ভারতীয় কমিশনারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ দিতে হবে— আমি, শ্রীবটুকেশ্বর দত্ত, কালাপানির সাজা খেটে এসেছি। আমিই ভগৎ সিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পার্লামেন্ট ভবনে... মনেই ছিল না, এসবের প্রমাণ রাখা উচিত। বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে দেখছি!’
ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালেন কমিশনার, ‘কী বললেন? কার পাশে দাঁড়িয়ে? কার নাম বললেন আপনি? আরে শুনিয়ে সাহাব...।’
বটুকেশ্বর ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছেন দরজা খুলে। কমিশনার ঝড়ের বেগে উঠে পড়লেন। জঘন্য একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। ইনিই যে সেই...।
বাইরে এসে অবশ্য তিনি আর দেখতে পেলেন না সেই ভাঙাচোরা চেহারার অকালে বুড়িয়ে যাওয়া লোকটাকে। একদল ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীর ভিড় ঠেলে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে লোকটা।