


হারাধন চৌধুরী: দুই শতক আগের কথা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জুনিয়র ক্লার্ক বা রাইটারদের আবাসন নির্মাণ করা হল। তিনতলা রেসিডেনশিয়াল ডরমিটরি। আড়াইশো বছর (১৭৭৭) আগে স্কটিশ স্থপতি থমাস লিয়ন এর নকশা তৈরি করে দেন। কলকাতা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র ডালহৌসি স্কোয়ার (বর্তমান বি-বা-দী বাগ) এলাকায়, লালদিঘির পাড়ে সেজে উঠল এক বড়ো লালবাড়ি। নামকরণ হল রাইটার্স বিল্ডিংস। পরতে পরতে গ্রিক-রোমান শৈলীর অতুলনীয় সৌন্দর্য! মূল ভবনের কাজ শেষ হয় ১৭৮০ নাগাদ। ১৮৭৯-১৯০৬ সালের মধ্যে এই ভবনের ব্যাপক পরিবর্ধন করা হয়। শুরুতে রাজকর্মচারীদের ফারসি ও হিন্দি ভাষায় প্রশিক্ষণ চলত এখানে। পরে এই বাড়িই হয়ে ওঠে বাংলা প্রাদেশিক সরকার পরিচালনার কেন্দ্র। বাংলার প্রধান সচিবালয়—মহাকরণ। ইংরেজের অপশাসন থেকে ভারতর্ষকে মুক্ত করার জন্য বিশ শতকের গোড়ায় সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয় বাংলা। তখন এই রাইটার্সই হয়ে ওঠে বিপ্লব ও গুপ্তহত্যার পীঠস্থান! ১৯৩০ সালে এই লালবাড়িরই অলিন্দে কর্নেল সিম্পসনকে হত্যা করেন বীর বিপ্লবীত্রয় বিনয় কৃষ্ণ বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশচন্দ্র গুপ্ত।
প্রিমিয়ার থেকে চিফ মিনিস্টার
বঙ্গদেশ পরিচালনার ক্ষমতা ইংরেজের হাত থেকে ক্রমে চলে যায় বঙ্গসন্তানদের হাতে। অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমরাই ছিল সংখ্যাগুরু। তাই রাজনৈতিক ক্ষমতায়ও মুসলিম প্রাধান্য ছিল। স্বাধীনতালাভ এবং দেশ ও বাংলাভাগের অব্যবহিত পূর্বে বাংলায় ছিল হাসান শহিদ সুরাবর্দির শাসন। রাইটার্সের অধীশ্বরকে তখন বলা হত প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী)। চিফ মিনিস্টার (মুখ্যমন্ত্রী) বলার প্রচলন হয়েছে স্বাধীনতার পর, দেশের প্রধান এবং রাজ্যের প্রধানকে পৃথকভাবে চেনাতে। স্বাধীনতার শুরুতেই নির্বাচিত সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি। ছিল ছায়া মন্ত্রিসভা। নেতৃত্বে কংগ্রেস নেতা ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। তাঁকে পর্যন্তই প্রিমিয়ার বলা হয়েছে। রাজ্য সরকারের দ্বিতীয় নেতা ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় থেকেই চলছে মুখ্যমন্ত্রী বলা।
স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ
দেশভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর মোটেই সহজ ছিল না এবং তা শান্তিপূর্ভাবেও হয়নি। সুরাবর্দি এবং শরৎ বসু চেয়েছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাঁদের স্বপ্নপূরণ হলে রাইটার্স থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নয়, অখণ্ড বাংলার সরকার পরিচালিত হত। যাই হোক, তা হয়নি। উলটে, এই খবর কানে যেতেই সুরাবর্দির উপর খেপে যান পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্না সাহেব। দেশভাগের পরপরই বাংলার মতো ভয়াবহ দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাঞ্জাবও। সুরাবর্দি হঠাৎ পাঞ্জাব পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রিটিশ হাই কমিশনারের ব্যক্তিগত বিমানে প্রথমে কলকাতা থেকে দিল্লি লিফট নেন, সেখান থেকে চলে যান পাঞ্জাব। পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তানেই পাকাপাকিভাবে থেকে যান, এমনকি সেদেশের প্রধানমন্ত্রী (পঞ্চম) পর্যন্ত হন। ভাগ্যের এমনই পরিহাস সুরাবর্দিকে যিনি গদিচ্যুত করেন, সেই আয়ুব খান সেনাপ্রধানের পদ লাভ করেছিলেন তাঁরই অনুগ্রহে! যদিও পরে শেখ মুজিবুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সুরাবর্দিই তৈরি করেন আওয়ামি লিগ, যেটি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে নেতৃত্ব দেয়।
প্রফুল্ল ঘোষ মন্ত্রিসভা
প্রফুল্ল ঘোষ তাঁর মন্ত্রিসভায় ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ডঃ সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, নিকুঞ্জ মাইতি, যাদবেন্দ্র পাঁজা, কমলকৃষ্ণ রায়, হেম নস্কর, রাধানাথ দাস, কালীপদ মুখোপাধ্যায় এবং মোহিনী বর্মনকে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমোক্ত দু’জনকে রাজি করানো যায়নি। একজন মাড়োয়ারি নেতাকে মন্ত্রী করার লিখিত প্রস্তাব আসে স্বয়ং গান্ধীজির থেকে (যদিও নেপথ্যে ছিল সর্দার প্যাটেলের ইচ্ছা)। বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুতর বিতর্কেরও জন্ম দেয়। যাই হোক, অত্যন্ত কঠোর হাতে শাসন পরিচালনা শুরু করেন ডঃ ঘোষ। নিজের পছন্দমতো শীর্ষ আমলাদেরও বেছে নেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হল—সুকুমার সেন (মুখ্যসচিব), করুণাকুমার হাজরা (মন্ত্রী-প্রধানের একান্ত সচিব), রণজিৎ গুপ্ত (স্বরাষ্ট্র সচিব), শৈবালকুমার গুপ্ত (শিক্ষাসচিব) প্রমুখ। ডঃ ঘোষ অতি স্বল্পকালের শাসনে যতগুলি ভালো কাজ করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম—সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার। তাঁর ইচ্ছায় মুখ্যসচিব নির্দেশ দেন, সরকারি নথিতে ‘নোট’ লিখতে হবে বাংলায়। এটা ‘বৈপ্লবিক’ পদক্ষেপ বলেই প্রশংসিত হয়েছিল।
ডঃ ঘোষের পদত্যাগ
কুৎসিত দলাদলির শুরু ডঃ ঘোষকে ঘিরেই। মাসকয়েকের ভিতরেই (৫ জানুয়ারি, ১৯৪৮) পরিষদীয় দলের নেতার পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। দিনকয়েক বাদে ত্যাগ করেন মুখ্যমন্ত্রিত্ব। এই সময়ের একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা: ৮ নং থিয়েটার রোডের বাসভবন ছেড়ে উঠে যাচ্ছেন গড়িয়াহাট রোডের একটি ছোটো বাড়িতে। সামনে এক তরুণী দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে একজোড়া খদ্দরের ধুতি। যে মানুষ কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই কারো দেওয়া উপহার নেননি, সেই ডঃ ঘোষই সেটি নিঃসংকোচে নিলেন! তরুণী বললেন, আপনারই জন্যে আমি নিজের হাতে বুনে এনেছি। আপ্লুত দেখাল ডঃ ঘোষকে। হাসিমুখেই বললেন, দাও এখন আর আমি মুখ্যমন্ত্রী নই।
তাঁর পদত্যাগের পর বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ ‘আ গুডম্যান গোজ’ শিরোনামে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল। কথিত আছে যে, প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক মিঃ আয়ান স্টিফেনের রচনা সেটি: ‘এটা খুবই পরিতাপের বিষয় যে, ডঃ ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ তার প্রথম প্রধানমন্ত্রীর শাসনকাল দুটি জিনিসের জন্য মনে রাখবে—শান্তি এবং সততা। ...শ্রীঘোষের শাসনকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্মরণ করবে মানুষ। তাঁর মাত্র ছ-মাসের মেয়াদকালে যে বস্তুগত ও নৈতিক শুদ্ধকরণের প্রয়াস আমরা লক্ষ করেছি, শুধু কলকাতা নয়, গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছেও তা ছিল কাঙ্ক্ষিত।... ডঃ ঘোষ সম্ভবত রাজনীতিতে তেমন পটু নন। যতদূর জানা যায়, কোনো মুখ্য নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে নয়, তুচ্ছ ব্যক্তিত্বের সংঘাতই তাঁর পদত্যাগের মূল কারণ। তিনি একজন আদর্শবাদী ব্যক্তি। ...আদর্শবাদে ভাটার টান পড়েছে।... সম্প্রতি নিরাপত্তা বিল নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে আমাদের এক প্রতিনিধি সংগত কারণেই ডঃ ঘোষের রাজনীতিকে ‘দার্শনিক’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ওই প্রতিনিধি আরো লেখেন যে লোভী ও আত্মপ্রচারে ব্যস্ত নেতাদের মাঝে জর্জরিত মানুষ ডঃ ঘোষ বিশ্বাসযোগ্য, কারণ তিনি ছিলেন ‘একজন নির্মোহ পুরুষ’।’
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় জমানা
ডঃ ঘোষ যখন পদত্যাগ করেন, তখন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় দিল্লিতে। গান্ধীজির অনশন কর্মসূচিতে। কিছুদিন আগে মার্কিন মুলুক থেকে ফিরেছেন। তাঁকে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল করতে চেয়েছিল দল। কিন্তু ডাঃ রায় ওই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। ডঃ ঘোষের ক্ষণকালের জমানা ফুরোতেই রাইটার্সের অধিকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বিধানচন্দ্র। এই অবিসংবাদী ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ তখন অনেকেই, দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও স্বয়ং। নেহরুর মতে, ডাঃ রায় নিজেই একজন ‘প্রতিষ্ঠান’! আবার কারো কারো চোখে তিনি ‘হিতকারী একনায়ক’। অকাট্য সত্যিটা হল, চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর হাতযশ যতটা ততটাই দক্ষ প্রশাসক ছিলেন তিনি। বিশেষ করে দিল্লি থেকে বাংলার জন্য উন্নয়ন ছিনিয়ে আনায় তাঁর রেকর্ড আজও অমলিন।
শিক্ষা, শিল্প-বাণিজ্য, পরিবহণ থেকে ক্রীড়া, রাজনীতি সবেতেই বাজিমাত করেছিল বিধানচন্দ্রের ব্যক্তিত্ব। কলকাতায় মেট্রো রেল চলবে, এ তো তাঁরই স্বপ্ন। ছুটেছিলেন প্যারিস অব্দি! ডাঃ রায় যখন রাইটার্সের কুর্সিতে, তখন তিনি ৬৫ অতিক্রান্ত। কাজ-পাগল মুখ্যমন্ত্রী বন্ধুদের কাছে আক্ষেপ করে বলতেন, কত কাজই না করার আছে, বয়স আর দশটা বছর কম হলে! উচ্চ ব্যক্তিত্ব নিয়েও বাংলার কল্যাণে তিনি ছিলেন আপসহীন। দিল্লির প্রচণ্ড গরমেও সাউথ, নর্থ দুই ব্লকেই এ-মন্ত্রক থেকে ও-মন্ত্রক ছোটাছুটি করায় ছিলেন ক্লান্তিহীন। ঘুর ঘুর করতেন প্ল্যানিং কমিশনের অফিসে, প্রয়োজনে চলে যেতেন বড়ো মন্ত্রীদের বাসভবন অব্দি! সাধে মানুষ তাঁকে ‘বাংলার রূপকার’ বলেনি।
ডাঃ রায় ও আমলাদের সম্পর্ক
ডাঃ রায়ের সুঠাম দেহ এবং অসামান্য ব্যক্তিত্বের সামনে বেশিরভাগ আমলাকেই ‘পিগমি’ দেখাত। মুখ্যসচিব এস এন রায়কেই ‘সত্যেন’ বলে ডাকতেন এবং ‘তুমি’ সম্বোধন করতেন। মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য রীতিমতো গুটিয়েই থাকতেন তাঁর সামনে। তবে সকলে এটা পছন্দ করতেন না। যেমন আইসিএস করুণাকেতন হাজরা একবার বলেই দিয়েছিলেন, ‘উইশ টু বি অ্যাড্রেসড প্রপারলি’! ডাঃ রায় অবশ্য স্পোর্টিংলি নিতে পারেননি। মুখ্যসচিবকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, সত্যেন, ওর একটা ব্যবস্থা করো। হাজরা সাহেবকে দূরে কোথাও বদলি করা হয় তৎক্ষণাৎ। যদিও পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাঁকে যথাযোগ্য স্থানেই ফেরাবার নির্দেশ দেন ডাঃ রায়।
লক্ষ্মণরেখা
কংগ্রেসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা হয়েও অতুল্য ঘোষ কখনো সরকারের উপর ছড়ি ঘোরাতেন না, বরং তা অপছন্দই করতেন। সরকার এবং শাসকদলের মধ্যবর্তী লক্ষ্মণরেখাকে বিশেষভাবে মান্যতা দিতেন। তবে পার্টির নীচুতলার কোনো নেতাকে খুশি করতে অত্যুসাহী হয়েছেন কোনো কোনো মন্ত্রী এবং মুখতোড় জবাবও পেয়েছেন। যেমন এক ‘অবাধ্য’ জেলাশাসকের বদলির জন্য দরবার করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ধমক জুটেছে এইরকম—‘নিজের চরকায় তেল দাও। ওরা অনেক পাশটাশ দিয়ে ডিএম হয়েছে, ওদেরকে কাজ করতে দাও।’ সুখের কথা, বহুকাল বাদে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের গলাতেও প্রতিধ্বনিত হল এই লক্ষ্মণরেখা মেনে চলার অঙ্গীকার।
বারবার পালাবদল
এখানেই মনে পড়ে, যুক্তফ্রন্ট একাধিকবার রাইটার্স দখল করে ডামাডোল উপহার দিয়েছে। বাংলাজুড়ে হাড়-হিম-করা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন কংগ্রেসের ‘ভোটপাখি’ সিদ্ধার্থশংকর রায়। সিদ্ধার্থ সরকারকে মূলসমেত উপড়ে ফেলে টানা সাড়ে তিন দশকের জগদ্দল লাল জমানা এনে দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। আর বামফ্রন্টকে মহাকরণ থেকে উৎখাত করে জমানা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মরিয়া ছিল কংগ্রেস। জ্যোতি বসুর সরকারকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার হুমকি দিয়ে দিয়ে একসময় সত্যিই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন গনি খান চৌধুরী। তাঁরই সঙ্গে সংগত করতে দেখেছি প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে, ‘এই হতাশা ভাঙতে চাই/ সোনার বাংলা গড়তে চাই।’
কংগ্রেস একবার গিয়ে আর ফেরেনি, যুক্তফ্রন্টের মতোই। বামফ্রন্টকে কংগ্রেস নয়, কংগ্রেস ভেঙে তৈরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সরিয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু দখল পেয়েও রাইটার্স অল্পদিনে এবং সচেতনভাবেই ছেড়ে গিয়েছিলেন মমতা। শোনা যায়, তাঁর কোনো হিতৈষী জ্যোতিষীর পরামর্শে! মমতা মা-মাটি-মানুষের সরকারের নতুন অফিস সাজিয়ে নিয়েছিলেন গঙ্গার পশ্চিম পারে। সেই নবান্ন থেকে মমতাকে এবার উৎখাত করেছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত জনসংঘের সুযোগ্য উত্তরসূরি শুভেন্দু অধিকারী।
মহাকরণে কেলেঙ্কারি
বাংলায় রকমারি কেলেঙ্কারির শুরু কংগ্রেস আমলে। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল ‘বেঙ্গল ল্যাম্প’ ইস্যুতে। জ্যোতিবাবুর পুত্র চন্দন ওই কোম্পানির সামান্য কর্মচারী ছিলেন। তাঁর মালিককে সঙ্গে নিয়ে চন্দনবাবু মহাকরণে দেখা করেন পূর্তমন্ত্রী যতীন চক্রবর্তীর সঙ্গে। বাঙালি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এই অজুহাতে বেঙ্গল ল্যাম্পকে বেশি সাপ্লাই অর্ডার দেওয়ার মৌখিক সুপারিশ করেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবু। তবে ফাইলে নোট না-রাখার জন্যও সতর্ক করেন তিনি। কিন্তু যতীনবাবু লিখিত নোট রেখেই বেঙ্গল ল্যাম্প কোম্পানিকে অন্যায্য বরাত পাইয়ে দেন। আর সেই নোট খবরের কাগজে ফাঁস হয়ে যেতেই ভয়ানক বিতর্কে জড়িয়ে যায় সরকার। পরিণামে চাকরি (মন্ত্রিত্ব) চলে যায় জ্যাকিদার (যতীন চক্রবর্তী)! প্রসঙ্গত, সর্বক্ষণ মুখে জ্বলন্ত হাভানা চুরুটে তাঁকে খাসা লাগত। নির্ভেজাল এই মোহন বাগানি ‘হরতালদা’ নামেও সমধিক পরিচিত ছিলেন, কারণটি সহজেই অনুমেয়!
তখনও বসু জমানা। সরাসরি ‘ঠিকাদারদের সরকার’ দেগে দিয়ে মহাকরণ ছেড়েছিলেন সৎ স্বচ্ছ প্রবীণ রাজনীতিক বিনয় চৌধুরী। ‘চোরের মন্ত্রিসভায় থাকব না’—মন্তব্য সহ পদত্যাগের বিপ্লব করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। জ্যোতি বসুর পর অবশ্য বুদ্ধদেবই রাইটার্সের কর্তৃত্ব লাভ করেন। এবং ক্ষমতা থেকে বামফ্রন্টের বিদায়ের জন্য তাঁর আবেগ এবং সংবেদনশীলতার ‘অচল’ রাজনীতিকে দায়ী করে উত্তর প্রজন্ম।
বিজয় শোভাযাত্রা
২১ জুন, ১৯৭৭। রাজভবনে রাজ্যপাল অ্যান্টনি ডায়াসের কাছে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথবাক্য পাঠ করেন জ্যোতি বসু। এরপর জনতা শোভাযাত্রা সহকারে তাঁকে রাইটার্সে পৌঁছে দেয়। দোতলার অলিন্দ থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জনতার নির্বাচিত সরকার। জনতার অনুশাসন অনুসারে এই সরকার চলবে, রাইটার্সে বসে নয়। জনতার সঙ্গে মিশে গিয়ে, জনতার নির্দেশে, জনতার প্রেরণায় এই সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিরূপিত হবে।’
কিন্তু জ্যোতি বসুই রাজ্যবাসীকে হতাশ করেছিলেন অল্প দিনেই। অপশাসনের সেই ধারা ভাঙতে ব্যর্থ হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও। আর তার ফলেই বাংলা দেখেছে ২১ জুলাই, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম...! অবশেষে চলে আসে ২০ মে, ২০১১। মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকেও শোভাযাত্রা সহকারে মানুষ পৌঁছে দিয়েছিল রাইটার্সে। অতঃপর মাসাধিককালের মেলা বসেছিল যেন, বড়ো লালবাড়ির অধিশ্বরীকে চাক্ষুষ করতে—এ ঘটনা অভূতপূর্ব! ৯ মে, ২০২৬ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে মমতার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি আপাতত নবান্ন থেকে রাজ্য পরিচালনা শুরু করলেও অদূর ভবিষ্যতে রাইটার্সেই ফিরবেন বলে ঘোষণা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়
মহাকরণের কান্ডারিদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে ছিলেন একাধিক ব্যক্তি। জ্যোতি বসু তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তবে সিপিএমের কেরল গোষ্ঠীর ‘ঐতিহাসিক ভুলের’ কারণে তাঁর দৌড় চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি হলেও রাইটার্সের অধীশ্বর এবং প্রধানমন্ত্রী কোনোটাই হতে পারেননি। মমতাও দিল্লি দখলের স্বপ্ন দেখেছেন। তবে ছাব্বিশের নির্বাচনে তাঁর দলের যে শোচনীয় হাল হল, এরপর মারাত্মক মিরাকল ছাড়া আর কোনো আশা নেই। একমাত্র সুরাবর্দি সাহেব প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তবে এদেশের নয়, পাকিস্তানের। পঞ্চম পাক প্রধানমন্ত্রীর নাম বঙ্গসন্তান হাসান শহিদ সুরাবর্দি।
ভূতের বাড়ি?
রাইটার্স ভূতের আস্তানা বলেও রটনা হয়েছে নানা সময়ে। তবে নেপথ্যের খবর হল, কোনো কোনো রাজপুরুষ অফিসে বসে বেশি রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। এতে সমস্যায় পড়তে হত অধস্তন কিছু কর্মীকে। তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য উপরওয়ালাকে ভয় দেখাবার কৌশল নিতেন কেউ কেউ।
ঐতিহ্যবাহী মূর্তিগুলি
রাইটার্স বিল্ডিংসের প্রধান প্রবেশপথ বা সেন্ট্রাল পোর্টিকোর উপরে রয়েছে দেবী মিনার্ভার মূর্তি। এই রোমান দেবী জ্ঞান ও শিল্পের প্রতীক। ভবন শীর্ষে রয়েছে আরো চারটি মূর্তি—সেগুলি বিচার, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও কৃষি সমৃদ্ধির দ্যোতক। আমাদের আশা, নতুন সরকার এই প্রতীকী বিষয়গুলির বাস্তব রূপদানে ব্রতী হবে এবং বাংলা আবার ভারতসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠা নেবে।
• ছবি : ইন্টারনেট ও অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস