আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস সদ্য পেরিয়ে গেল। সেই উপলক্ষ্যে এমন তিন মহিলার কথা বলব, পর্বতারোহণ যাঁদের নেশা। নানা বাধা পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছে গিয়েছেন এভারেস্টের শীর্ষে।
আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস সদ্য পেরিয়ে গেল। সেই উপলক্ষ্যে এমন তিন মহিলার কথা বলব, পর্বতারোহণ যাঁদের নেশা। নানা বাধা পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছে গিয়েছেন এভারেস্টের শীর্ষে।
‘লক্ষ্যে স্থির থেকে আমি চলেছি। সমুখে মাউন্ট এভারেস্ট। চোখের দৃষ্টি সজাগ, তীক্ষ্ণ। এমন সময় ঘটল বিপত্তি। এক হাতের গ্লাভস খুলে কোথায় যে পড়ল আর খুঁজে পেলাম না। এদিকে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে দাঁড়িয়ে আমি। তাও ফিরে যেতেই হবে। নাহলে ফ্রস্ট বাইটে হাতটাই বাদ পড়বে। মনখারাপ নিয়ে পিছনে ঘুরলাম। আর তখনই চোখে পড়ল আর এক জোড়া গ্লাভস। না, আমার নয়, অন্য কারও। সঙ্গে সঙ্গে কুড়িয়ে গলিয়ে নিলাম হাতে। রাখে হরি, মারে কে? আমার ক্ষেত্রে রাখে এভারেস্ট মারে কে? ভাগ্য যখন সহায় তখন শৃঙ্গ জয় নিশ্চিত।’ উত্তেজনায় তাঁর চোখগুলো জ্বলজ্বল করছিল। তিনি প্রেমলতা আগরওয়াল। ভারতের সবচেয়ে বেশি বয়সি মহিলা যিনি এভারেস্ট শিখর জয় করেছেন। শুধু এভারেস্টই নয়, আরও ছ’টা শৃঙ্গ জয় করেন তিনি পঞ্চাশ পেরিয়ে! আর এই দুঃসাহসী কাজের জন্য ২০১৩ সালে তিনি পেয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মান। ২০১৭ সালে তেনজিং নোর্গে জাতীয় পুরস্কারও প্রদান করা হয় তাঁকে।
দার্জিলিংয়ের এই কন্যার পাহাড়ের প্রতি যে আলাদা করে আগ্রহ ছিল তেমন নয়। তবে ছোট থেকেই যা তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তা হল জেদ। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায় প্রেমলতার। জামশেদপুর চলে আসেন দার্জিলিং ছেড়ে। তারপর দুই সন্তান, সংসার, বেশ মজে গিয়েছিলেন তিনি। একদিন মেয়েদের নিয়ে টেনিস প্রশিক্ষণে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ল দলমা ট্রেক-এর একটা বোর্ড। একরকম জেদের বশেই নাম লেখালেন। মজার ব্যাপার হল এই ট্রেকে গিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ফেললেন দুই সন্তানের জননী, মধ্যবয়সি প্রেমলতা আগরওয়াল। অ্যাডভেঞ্চারের সেই শুরু। তৃতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাঁর সুযোগ হয় বাচেন্দ্রি পালের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের। ‘তিনিই আমার প্রধান অনুপ্রেরণা’, বললেন প্রেমলতা। বাচেন্দ্রি পালের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩৫ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো চড়ে ফেলেন। সেই পাহাড় থেকে নামার সময়ই বাচেন্দ্রি তাঁকে প্রস্তাব দেন, ‘প্রেম, আমার মনে হয় তুমি এবার এভারেস্ট চূড়ায় চড়ার তোড়জোড় শুরু করে দাও।’ কয়েক মাস সময় চেয়েছিলেন প্রেমলতা। বাড়িতে জানানো, মনকে তৈরি করা সব তারই মধ্যে। স্বামী বলেন, ‘বাচেন্দ্রির যদি তোমার উপর ভরসা থাকে তাহলে যাও। ইতিহাস গড়ে তোলো।’ ব্যস, স্বামীর সম্মতি আর বাচেন্দ্রির ভরসায় ভর দিয়ে ৪৮ বছর বয়সে এভারেস্ট অভিযানে রওনা হলেন প্রেমলতা। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি। একে একে জয় করেছেন ডেনালি (আমেরিকা), এলব্রাস (ইউরোপ), একানকাগুয়া (দক্ষিণ আমেরিকা) ইত্যাদি শৃঙ্গ।
কমলিনী চক্রবর্তী