মিঠেকড়া
ভোর হলেই নদীয়ার নেদেরপাড়ার একটি বাড়িতে হামলা চালাত মাছি, মৌমাছি ও বোলতার দল। ভাবখানা এমন, যেন ওরাই বাড়ির পাহারাদার! একটু বেলা হলেই বাড়ি থেকে বেরতেন বাড়ির কর্তা অধরচন্দ্র দাস। মাথায় ঝুড়ি। ভনভন করে তাঁর পিছু ধাওয়া করে ওরাই। তারপরের ঘটনা তো মিথ আর বাস্তবতার এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন। বাংলার মিষ্টান্নশিল্পের ইতিহাসে অধরবাবু লিখে ফেললেন দুই সতীনের অধ্যায়—‘সরপুরিয়া’ ও ‘সরভাজা’। যদিও এই অধ্যায়ের সূচনাটা শুরু করেছিলেন অধরবাবুর বাবা সূর্যকুমার দাস। তিনি ছিলেন মিষ্টান্ন গবেষক। দুধ-ছানা নিয়ে অনবরত কাটাছেঁড়া করতেন। বালক অধর সেসব দেখতেন। একদিন তিনিও নতুন কিছু করার তাগিদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবার কাজে। গোটা বাংলাকে উপহার দিলেন অনবদ্য এক মিষ্টি নৈবেদ্য। বাঙালির অস্মিতার সঙ্গে যোগ হল ‘সরপুরিয়া’ ও ‘সরভাজা’। অধরবাবুর সেই কীর্তি আজও মর্যাদার সঙ্গে ধরে রেখেছেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি গৌতম দাস। সম্পর্কে তিনি অধরবাবুর নাতি।
পরম কৃষ্ণভক্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র দুগ্ধজাত শিল্পের প্রসারে বেশ উদ্যোগী ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্রের এই মিষ্টি-প্রেম হাতছাড়া করেননি ময়রারা। অধরবাবুর পূর্বপুরুষ সুর্যকুমার ছিলেন তাঁদেরই একজন। ময়রা হিসেবে তখন তাঁর বেশ নামডাক। রাজবাড়িতেও ভীষণ কদর। পুজো-পার্বণে সূর্যের মিষ্টি মাস্ট! পরে বাবার পেশার হাল ধরেন অধরবাবু। সরপুরিয়া ও সরভাজা আবিষ্কারের পর নেদেরপাড়াতেই, যা কিনা অনন্তহরি মিত্র রোড নামে পরিচিত, সেখানে একটি দোকান খুলে বসেন তিনি। সেই আবিষ্কারের কাহিনিও বড়ো মিষ্টি।
নেদেরপাড়া তখন নিঝুম। নিশুতি রাত। বাড়ির সব দরজা বন্ধ। একাই জাগ্রত অধরবাবু। তৈরি করে চলেছেন একটার পর একটা সরপুরিয়া কিংবা সরভাজা। চাহিদামতো মিষ্টি দু’টি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দরজা খুলতেন না। পাছে তাঁর রেসিপি চুরি হয়ে যায়! কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এ রেসিপি একেবারে একার করে রাখতে তিনি পারেননি। পরবর্তী সময়ে নেদেরপাড়ার অন্য ময়রারা অনেকটা আন্দাজ করে সরপুরিয়া ও সরভাজা তৈরি করতে থাকেন। এখন নদীয়া জেলার একাধিক দোকানে এই দুই সতীনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নজরে পড়ে। কিন্তু ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অধরচন্দ্র দাস অ্যান্ড সন্স’-কে টেক্কা দিতে ব্যর্থ সবাই। সরপুরিয়া ও সরভাজার প্রস্তুতপ্রণালীতে এমন কিছু মৌলিক কারুকাজ অধরবাবু সৃষ্টি করে গিয়েছেন, যা স্বাদে-গন্ধে যুগ যুগ ধরেই স্বতন্ত্র। এখনও সেই গোপন রেসিপি কারিগররাও জানতে পারেননি। সরপুরিয়া ও সরভাজার উপকরণ মিশ্রণ তদারকি নিজের কাঁধেই রেখেছেন অধরের নাতি গৌতমবাবু। তিনি না থাকলে দায়িত্বে থাকেন তাঁর ছেলে। তবে, এ মিষ্টির নামকরণে মৌলিকত্ব আছে কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ‘সরপুরিয়া’ নামকরণে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন সদা কৃষ্ণভক্ত অধরবাবু। চৈতন্য মহাপ্রভু তিন ধরনের মিষ্টি পছন্দ করতেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-য় বলা হয়েছে ‘সরপুরী অমৃত পদ্মচিনি। খণ্ড খিরিসার বৃক্ষ ঘরে করি নানা ভক্ষ্য, রাধা যাহা কৃষ্ণ লাগি আনি...।’ অনেকেই মনে করেন, কৃষ্ণদাসের ‘সরপুরী’ থেকেই ‘সুরপুরিয়া’ নামটি এসেছে। তবে, ৫৫০ বছর আগের সেই ‘সরপুরী’ আজকের সরপুরিয়ার মতো নয়। অধরচন্দ্র দাসের প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হল দুই মিষ্টির রেসিপি।



