Bartaman Logo
২৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

অধরের হাতযশ

অধরচন্দ্র দাসের আবিষ্কৃত সরপুরিয়া ও সরভাজা আজও জনপ্রিয়। মিষ্টির ইতিহাস ও রেসিপি জানুন অধরের নাতির কাছে। বিস্তারিত পড়ুন।

অধরের হাতযশ
  • ২৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মিঠেকড়া

 ভোর হলেই নদীয়ার নেদেরপাড়ার একটি বাড়িতে হামলা চালাত মাছি, মৌমাছি ও বোলতার দল। ভাবখানা এমন, যেন ওরাই বাড়ির পাহারাদার! একটু বেলা হলেই বাড়ি থেকে বেরতেন বাড়ির কর্তা অধরচন্দ্র দাস। মাথায় ঝুড়ি। ভনভন করে তাঁর পিছু ধাওয়া করে ওরাই। তারপরের ঘটনা তো মিথ আর বাস্তবতার এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন। বাংলার মিষ্টান্নশিল্পের ইতিহাসে অধরবাবু লিখে ফেললেন দুই সতীনের অধ্যায়—‘সরপুরিয়া’ ও ‘সরভাজা’। যদিও এই অধ্যায়ের সূচনাটা শুরু করেছিলেন অধরবাবুর বাবা সূর্যকুমার দাস। তিনি ছিলেন মিষ্টান্ন গবেষক। দুধ-ছানা নিয়ে অনবরত কাটাছেঁড়া করতেন। বালক অধর সেসব দেখতেন। একদিন তিনিও নতুন কিছু করার তাগিদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবার কাজে। গোটা বাংলাকে উপহার দিলেন অনবদ্য এক মিষ্টি নৈবেদ্য। বাঙালির অস্মিতার সঙ্গে যোগ হল ‘সরপুরিয়া’ ও ‘সরভাজা’। অধরবাবুর সেই কীর্তি আজও মর্যাদার সঙ্গে ধরে রেখেছেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি গৌতম দাস। সম্পর্কে তিনি অধরবাবুর নাতি। 
পরম কৃষ্ণভক্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র দুগ্ধজাত শিল্পের প্রসারে বেশ উদ্যোগী ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্রের এই মিষ্টি-প্রেম হাতছাড়া করেননি ময়রারা। অধরবাবুর পূর্বপুরুষ সুর্যকুমার ছিলেন তাঁদেরই একজন। ময়রা হিসেবে তখন তাঁর বেশ নামডাক। রাজবাড়িতেও ভীষণ কদর। পুজো-পার্বণে সূর্যের মিষ্টি মাস্ট! পরে বাবার পেশার হাল ধরেন অধরবাবু। সরপুরিয়া ও সরভাজা আবিষ্কারের পর নেদেরপাড়াতেই, যা কিনা অনন্তহরি মিত্র রোড নামে পরিচিত, সেখানে একটি দোকান খুলে বসেন তিনি। সেই আবিষ্কারের কাহিনিও বড়ো মিষ্টি। 
নেদেরপাড়া তখন নিঝুম। নিশুতি রাত। বাড়ির সব দরজা বন্ধ। একাই জাগ্রত অধরবাবু। তৈরি করে চলেছেন একটার পর একটা সরপুরিয়া কিংবা সরভাজা। চাহিদামতো মিষ্টি দু’টি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দরজা খুলতেন না। পাছে তাঁর রেসিপি চুরি হয়ে যায়! কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এ রেসিপি একেবারে একার করে রাখতে তিনি পারেননি। পরবর্তী সময়ে নেদেরপাড়ার অন্য ময়রারা অনেকটা আন্দাজ করে সরপুরিয়া ও সরভাজা তৈরি করতে থাকেন। এখন নদীয়া জেলার একাধিক দোকানে এই দুই সতীনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নজরে পড়ে। কিন্তু ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অধরচন্দ্র দাস অ্যান্ড সন্স’-কে টেক্কা দিতে ব্যর্থ সবাই। সরপুরিয়া ও সরভাজার প্রস্তুতপ্রণালীতে এমন কিছু মৌলিক কারুকাজ অধরবাবু সৃষ্টি করে গিয়েছেন, যা স্বাদে-গন্ধে যুগ যুগ ধরেই স্বতন্ত্র। এখনও সেই গোপন রেসিপি কারিগররাও জানতে পারেননি। সরপুরিয়া ও সরভাজার উপকরণ মিশ্রণ তদারকি নিজের কাঁধেই রেখেছেন অধরের নাতি গৌতমবাবু। তিনি না থাকলে দায়িত্বে থাকেন তাঁর ছেলে। তবে, এ মিষ্টির নামকরণে মৌলিকত্ব আছে কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ‘সরপুরিয়া’ নামকরণে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন সদা কৃষ্ণভক্ত অধরবাবু। চৈতন্য মহাপ্রভু তিন ধরনের মিষ্টি পছন্দ করতেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-য় বলা হয়েছে ‘সরপুরী অমৃত পদ্মচিনি। খণ্ড খিরিসার বৃক্ষ ঘরে করি নানা ভক্ষ্য, রাধা যাহা কৃষ্ণ লাগি আনি...।’ অনেকেই মনে করেন, কৃষ্ণদাসের ‘সরপুরী’ থেকেই ‘সুরপুরিয়া’ নামটি এসেছে। তবে, ৫৫০ বছর আগের সেই ‘সরপুরী’ আজকের সরপুরিয়ার মতো নয়। অধরচন্দ্র দাসের প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হল দুই মিষ্টির রেসিপি। 

Advertisement

সরপুরিয়া

 

উপকরণ: টাটকা ছানা ২৫০ গ্রাম,  কম করে ২ লিটার দুধ, চিনি পরিমাণ মতো, ৪-৫টি এলাচের গুঁড়ো, ৫০ গ্রাম কাজুবাদাম ও ৫০ গ্রাম আমন্ডের গুঁড়ো, ২৫০ মিলিগ্রাম চিনির সিরাপ এবং খাঁটি ঘি। হালকা রঙের সমান্য পরিমাণ জাফরান। 

প্রণালী: মালাই ও ক্ষীর প্রস্তুত 
একটি বড়ো কড়ায় দুধ মাঝারি আঁচে ফুটিয়ে ঘন করে নিতে হবে। ঘন হলেই দেখবেন দুধের উপরে একটা আস্তরণ পড়েছে। যাকে সর বা ক্রিম বলে। সেটা আলতো করে কড়াইয়ের একপাশে সরিয়ে রাখুন। দুধ যখন ক্ষীরের মতো ঘন হয়ে আসবে, তখন নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন।
ছানার মিশ্রণ তৈরি
 ছানা হতে হবে একেবারে ঝরঝরে। সেগুলি হাতের তালু দিয়ে খুব ভালোভাবে মেখে মসৃণ করে নিন। দানা দানা ভাব যেন না থাকে। এবার এই ছানার সঙ্গে ওই ক্ষীর, চিনি, গাওয়া ঘি এবং এলাচের গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। 
সরপুরিয়ার আকার দেওয়া 
ও ভাজা 
ছানা ও ক্ষীরের এই মিশ্রণটিকে একটি সমান পাত্রে বা ছাঁচে চৌকো বা গোল আকারে পুরু করে বসিয়ে দিন। পছন্দমতো মাপে কেটে নিন। এবার কড়াইতে ওই কেটে নেওয়া টুকরোগুলি দিয়ে ডুবো ঘিয়ে হালকা করে ভেজে নিন। ঘি অল্প খেতে চাইলে প্যানে হালকা ঘি ব্রাশ করে টুকরোগুলো এপিঠ ওপিঠ করে হালকা বাদামি রং ধরলে তুলে নিন। 
চিনির রসে ডোবানো
একটা কড়ায় চিনির রস তৈরি করুন। সেটা ফুটিয়ে হালকা চটচটে ভাব এলে তাতে ভাজা টুকরোগুলি ১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। এরপর রস থেকে তুললেই তৈরি সরপুরিয়া। আরও স্বাদু করতে হলে অল্প ক্ষীরের সঙ্গে সামান্য জাফরান মিশিয়ে সরপুরিয়াগুলি তার উপর ফেলে পরিবেশন করুন।

সরভাজা

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের গোড়ার দিকে জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করে সরভাজা। তবে এর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় পঞ্চদশ শতাব্দীর  চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে। বাড়িতেই বানিয়ে নিতে পারেন এই মিষ্টি।

উপকরণ: ছানা ২০০ গ্রাম, ঘন দুধ ২ লিটার, সেই দুধ ফুটিয়ে ১৫০ মিলি দুধের সর, ময়দা ৫০ গ্রাম, খোয়া ক্ষীর ১০০ গ্রাম, চিনি পরিমাণ মতো, নুন সামান্য, ৪-৫টি এলাচের গুঁড়ো, কাজুবাদাম ৫০ গ্রাম, আমন্ড গুঁড়ো ৫০ গ্রাম, বেকিং পাউডার ৩-৪ গ্রাম, চিনির সিরাপ ২৫০ মিলি, খাঁটি ঘি।

প্রণালী: প্রথমে রস তৈরি করতে হবে। জলের মধ্যে পরিমাণ মতো চিনি, দারচিনি ও এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে রস তৈরি করুন। ময়দা, বেকিং পাউডার, গুঁড়ো চিনি, সামান্য নুন, দুধের সর, ঘি ও খোয়া ক্ষীর একসঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এরপর জল ছাড়া ওই মিশ্রণটিকে সর তৈরির পর পড়ে থাকা ঘন দুধ দিয়ে মেখে মণ্ড তৈরি করুন। সেটিকে ঢাকা দিয়ে রেখে দিন প্রায় ঘণ্টাখানেক। এবার ওই মণ্ড থেকে ছোটো ছোটো লেচি কেটে বেলে নিন। এগুলি পুরু হবে দেড়- দু’ ইঞ্চি। এবার কড়ায় গাওয়া ঘি গরম করে বেলে নেওয়া লেচি বাদামি করে ভেজে নিন। সঙ্গে সঙ্গেই ফুটিয়ে রাখা চিনি সিরাপে ফেলুন। দেড় ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখলেই তৈরি সরভাজা। 
শুভজিৎ অধিকারী 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ