Bartaman Logo
২৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পৌরাণিক স্মৃতি স্বাক্ষরিত রামতীর্থ

ময়ূরভঞ্জের রামতীর্থ মন্দির ও কুমির প্রকল্পে পৌরাণিক স্মৃতি ও প্রকৃতির অপূর্ব রূপ। ভ্রমণের বিস্তারিত জানুন।

পৌরাণিক স্মৃতি স্বাক্ষরিত রামতীর্থ
  • ২৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে ট্রেনে কেওনঝড়। ওখান থেকে ভাড়ার গাড়িতে ৬৪ কিমি দূরে ময়ুরভঞ্জের রামতীর্থ মন্দির ও কুমির প্রকল্প। অথবা কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতেও চলে আসতে পারেন জোশিপুর।

Advertisement

ঢেউ খেলানো পাহাড়, ঘন শালের জঙ্গল আর তার মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে তিরতিরে এক নদী। নদীর এক কূলে তারই সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণ আস্তানা তো অপর কূলে পৌরাণিক যুগের স্মৃতি স্বাক্ষরিত এক তীর্থস্থান। স্থানটি বেশিরভাগ ভ্রমণ প্রিয় মানুষের কাছে অজানা। আর এই বিশেষ স্থানটি আমার পরিবারের প্রিয় মানুষদের শৈশব ও যৌবনের স্মৃতিবিজড়িত। এমন স্থানে ২৫-৩০ বছর পরে পদার্পণ করলে তার অনুভূতিটা ভ্রমণকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। নিশ্চয় এমন জায়গা সম্পর্কে কৌতূহল হচ্ছে! চলুন তাহলে, ঘুরে আসা যাক। 
কলকাতা থেকে গাড়িতে সকাল সকাল যাত্রা শুরু করলাম। খড়গপুর হয়ে লোধাশুলির জঙ্গল পেরিয়ে বেহারাগোড়া হয়ে কেওনঝড়ের রাস্তা ধরলাম। এ পথেই পড়ল বাংরিপোসি। সমতল ছেড়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ে চড়লাম। চারপাশে বসন্তের প্রকৃতি।  কিছুটা পাহাড়ে চলার পর রাস্তার উপরেই সবুজে ঘেরা দুয়ারসিনী মায়ের মন্দির। কথিত আছে এ পাহাড় জঙ্গলে প্রবেশের আগে দুয়ারসিনী মায়ের অনুমতি নিতে হয়। তাই মায়ের দুয়ারে মাথা ঠেকিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম। মসৃণ যাত্রাপথের দু’পাশে নানা শেডের জঙ্গল। 
কেওনঝড় শিল্পাঞ্চলের ট্রাক ছাড়া এ পথে খুব একটা গাড়ি যাতায়াত করে না। এ নির্জন পথে টানা জোশিপুর পর্যন্ত দু’পাশে অপরূপ প্রকৃতি ও ঢেউ খেলানো পাহাড় শ্রেণি। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ আস্বাদন করতে করতে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম রামতীর্থ মন্দির ও কুমির প্রকল্পে। এটি উত্তর সিমলিপাল জঙ্গলেরই একটি অংশ। জোশিপুরে সিমলিপাল জঙ্গলের প্রবেশদ্বার থেকে মাত্র দু’কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জাতীয় সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। সিমলিপাল জঙ্গলে ঘুরে আসেন অথচ ঢিল ছোড়া দূরত্বে অবস্থিত রামতীর্থ মন্দির ও কুমির প্রকল্পের নাম শোনেননি অনেকেই। যাইহোক, ছাড়পত্র পাওয়া মাত্রই ভেতরে ঢুকে পড়লাম। 
ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার জোশিপুর শহরের কাছে সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানের কাছাকাছিই অবস্থিত রামতীর্থ কুমির প্রকল্পটি। এটি ময়ূরভঞ্জ জেলার একমাত্র কুমির প্রতিপালন কেন্দ্র। ১৯৭৫ সালে ওড়িশা সরকার এখানে একটি কুমির সংরক্ষণ এবং প্রজনন কর্মসূচি শুরু করেন আদর্শ বাসস্থানের কারণে। বছরের পর বছর ধরে কুমিরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৪ সালে রামতীর্থ কুমির প্রকল্প বা ক্রোকাডাইল পার্কটি গড়ে উঠে। পার্কের ভিতরে গাছগাছালি ঘেরা ছায়াময় পরিবেশ। ঢোকামাত্রই প্রথমেই বাঁ হাতে পড়বে অ্যাস্ট্রাল গার্ডেন। তারপর ওড়িশা ইকো টুরিজমের থাকার আস্তানা। আর ডানদিকে পর পর রয়েছে কুমির, কুমির শাবক এবং অন্যান্য প্রাণীদের থাকার ব্যবস্থা। 
রামতীর্থ ক্রোকোডাইল পার্কে ৪৫০টিরও বেশি মোহনা কুমির রয়েছে যা এটিকে ওড়িশার বৃহত্তম কুমির পার্কে পরিণত করেছে। সফল প্রজনন, ডিম সংগ্রহ, শাবক প্রতিপালনের পরে কুমিরগুলি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এটি ওড়িশার নদী ও মোহনায় কুমিরের জনসংখ্যা প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি করেছে। ময়ূরভঞ্জের রামতীর্থে রাখা কুমিরগুলো খুবই ব্যতিক্রমী ধরনের; যাকে বলা হয় মুগ্গার প্রজাতির কুমির। এটি সংস্কৃত শব্দ ‘মকর’ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ‘জল দানব’। কুমির ছাড়াও এই পার্কে বিভিন্ন ধরনের পাখি, হরিণ, কচ্ছপ এবং সাপও রয়েছে। এসব দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি। পার্কটির একেবারে গা ছুঁয়ে পাথুরে বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোটো একটি পাহাড়ি নদী। নদীর উপর পাড়ে পাহাড়ের উপর রয়েছে রামতীর্থ মন্দির। এর মধ্যে একটি নজর মিনারও রয়েছে। সেখান থেকে চারপাশে যেদিকে তাকাও সবুজে সবুজ। একেবারে মন ভালো করা পরিবেশ। 
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শ্রীরামের মন্দিরের কারণেও রামতীর্থ ওড়িশায় বিখ্যাত একটি পর্যটন কেন্দ্র। পৌরাণিক মতে, ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরাম, দেবী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণসহ সিমলিপালের বনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। সেই সময় ক্লান্ত সীতা দেবী বিশ্রামের জন্য কিছুক্ষণ পাহাড়ের কোলে বসেছিলেন। বয়ে যাওয়া পাহাড়ি এই নদীটির শীতল জলে মুখ, হাত, পা ধুয়ে ক্লান্তি নিবারণ করেছিলেন। এরপর ময়ূরভঞ্জের রামতীর্থ শ্রীরাম ও দেবী সীতার নামে একটি কিংবদন্তি স্থান হয়ে ওঠে। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে ভক্তরা এখানে টুসু পরব উদযাপন করতে আসেন। টুসু হল এক ধরনের লোক গান। এই গানের সঙ্গে দলবেঁধে নাচ করেন তাঁরা। মুঘল যুগে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা রাজা কালাপাহাড়ের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিল। তার লালসা পূরণের জন্য সুন্দরী নারীদের অপহরণ করা হত। সেই সময়, এক সুন্দরী আদিবাসী রমণী মুঘল সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য নদীতে ঝাঁপ দেন। তার নাম ছিল টুসুমণি। আদিবাসীরা তাঁকে স্মরণ করার জন্য প্রতি বছর এখানে টুসু পরব পালন করেন।
আমি যখন এসব দেখতে ব্যস্ত তখন পিতা-পুত্র নদীর জলে নেমে পড়েছে। নদীর বুকের মাঝে শুখা পাথরের আশ্রয়ে পৌঁছে গিয়েছে ওপারে। ওপারেই রয়েছে শ্রীরামের মন্দিরটি। এখানে এসে ওরা আনন্দে আত্মহারা! কেওনঝড় ও জোশিপুরের বনজঙ্গল, নদী, ঝরনা, পাথরে পাথরে কর্তামশাইয়ের শৈশবের কত স্মৃতি লেগে রয়েছে। আমার শ্বশুরমশাইকে কর্মসূত্রে এসব জায়গায় প্রায়ই আসতে হত। কলকাতা থেকে জিপ ছুটিয়ে চলে আসতেন। ওরাও সঙ্গ নিত প্রায়শই। শৈশবের সেই সমস্ত জায়গা স্ত্রী সন্তানকে দেখাতে পেরে তিনি কেমন নস্টালজিক হয়ে পড়লেন! আর আমি, এমন সুন্দর একটা জায়গা দেখে সত্যি মুগ্ধ হলাম! একরাশ মন ভালো করা অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে চললাম কেওনঝড়ের দিকে।
মঞ্জিলা চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ