Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ত্রিবেণী তীর্থ পথে

ইতিহাস, পুরাণ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে একদিনের নির্ভেজাল অবসর কাটাতে চান? তাহলে হাওড়া কাটোয়া বা শিয়ালদহ কাটোয়া লোকালে মাত্র পৌনে দু’ঘণ্টায় পৌঁছে যেতে পারেন ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়া মেশানো শান্ত ত্রিবেণী স্টেশনে।

ত্রিবেণী তীর্থ পথে
  • ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ইতিহাস, পুরাণ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে একদিনের নির্ভেজাল অবসর কাটাতে চান? তাহলে হাওড়া কাটোয়া বা শিয়ালদহ কাটোয়া লোকালে মাত্র পৌনে দু’ঘণ্টায় পৌঁছে যেতে পারেন ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়া মেশানো শান্ত ত্রিবেণী স্টেশনে। সেখান থেকে যেতে হবে গঙ্গাতীরের ত্রিবেণী ঘাটে। 
মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বর্ণিত গঙ্গা-যমুনা ও সরস্বতী নদীর সংগম এই ত্রিবেণী তীর্থ। স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাছে টোটো স্ট্যান্ড থেকে টোটো করে পৌঁছানো যায় ত্রিবেণী ঘাটে। ঘাটে ঢোকার রাস্তার দু’পাশে সার দেওয়া পূজার সামগ্রী আর দশকর্মার দোকান। সরাসরি ঘাটে না গিয়ে প্রথমেই ডানদিকে রাস্তা ধরে ত্রিবেণী সঙ্গমটি দেখতে গেলাম। প্রশস্ত গঙ্গার সঙ্গে সরস্বতীর ক্ষীণ স্রোত এসে মিশেছে। অধুনালুপ্ত যমুনা বর্তমানে যা কাঁচরাপাড়া খাল নামে পরিচিত তা এখন মূল ভাগীরথী বা গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন। দু’জন মাঝি ডিঙি নৌকায় মাছ ধরে গঙ্গা থেকে ঠিক তখনই ফিরছিলেন। গঙ্গার ঢেউয়ের মধ্যে ছোটো বড়ো নৌকার মন্থর ভেসে চলা, বয়ে চলা নদীর স্নিগ্ধ বাতাস মনকে আচ্ছন্ন করে দেয়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এই ত্রিবেণীকে নিয়েই লিখেছিলেন, ‘মুক্ত বেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে/ আমরা বাঙালি বাস করি সেই তীর্থে বরদ-বঙ্গে’। কেমন ভাবতে অবাক লাগে ৭০০ বছর আগে এই ত্রিবেণীর সংগমে মহা সাড়ম্বরে মাঘী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে লক্ষ মানুষের সঙ্গে নাগা সাধুদের সমাগম হত। সাধু সন্তরা মকরের স্নান করে ফেরার পথে এখানে মাঘী পূর্ণিমায় পুণ্যস্নান করতেন। বেশ কিছুক্ষণ সঙ্গমে কাটিয়ে এবার মূল ঘাটের দিকে এগনোর পালা।
স্নানের ঘাট বা মূল ঘাটটি তদানীন্তন মহারাজা রুদ্রনারায়ণ রায়ের নির্মিত। এখানের ফেরিঘাট থেকে একসময় মাঝেরচর হয়ে ওপারে হুগলির কল্যাণীতে যাতায়াত করা যেত। বর্তমানে তা বন্ধ আছে। ঘাটের কাছাকাছি মন্দিরের মূর্তিগুলিতে গৌড়ীয় রীতির গভীর প্রভাব দেখা যায়। ঘাটের পাশেই রয়েছে পুরুষোত্তম আচার্য প্রতিষ্ঠিত হরিহর মন্দিরে রাধা কৃষ্ণের মূর্তি অধিষ্ঠিত। ঘাটের প্রবেশপথের ঠিক ডানদিকে বর্ণময় জগন্নাথ মন্দির। এটি বেশ প্রাচীন। রমাকান্ত মহাপাত্র এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। রোজই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষের সমাগম হয় এখানে। বিপত্তারিণী, শিবরাত্রি, পৌষ সংক্রান্তি, নীল পূজায় চলে পুণ্যস্নান। 
ফেরিঘাটের ঠিক পাশেই শ্মশানঘাট। নিম আর বড়ো বটগাছে ঘেরা, গঙ্গার ধারে এই শান্ত স্নিগ্ধ শ্মশান ঘাটে দু’দণ্ড বসলে নাগরিক কোলাহলে অভ্যস্ত মনটা এক অনির্বচনীয় প্রশান্তিতে ভরে যায়। কতক্ষণ আবিষ্ট হয়ে বসেছিলাম জানি না। সঙ্গীর ডাকে সংবিৎ ফিরে পেলাম। বেলা ততক্ষণে বেশ কিছুটা গড়িয়েছে। এরপর যাব পাশেই নেতা ধোপানির ঘাটে। মনসামঙ্গল কাব্যে বর্ণিত বেহুলা, লখিন্দরকে নিয়ে এই ঘাটেই নেতা ধোপানির সাক্ষাৎ পান। মঙ্গলকাব্য অনুসারে নেতা ধোপানিই এখানে একটি বড়ো প্রস্তরখণ্ডের উপরে স্বর্গের দেবতাদের কাপড় কাচতেন। এখানে এসে এই ধোপানির পরামর্শেই বেহুলা স্বর্গে গিয়ে দেবতাদের নাচ দেখিয়ে সন্তুষ্ট করেন ও তার স্বামীর জীবন ফিরে পান। তবে ত্রিবেণীর এই নেতা ধোপানি ঘাটে গিয়ে মনটা সত্যিই ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। এরকম একটি পুরাণসমৃদ্ধ ঘাট সম্পূর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে আছে! ঘাটের পাশেই রয়েছে জরাজীর্ণ মনসা মন্দির। মন্দিরের বৃদ্ধ পূজারী বললেন, পুণ্যার্থীদের দানে কোনোরকমে নিত্য পূজাটুকু তিনি চালান। এমনকি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এই মন্দিরের সংস্কারও সেইভাবে কখনো হয় না। তবে এই ঘাট থেকে বেশ কিছুটা ওপরে একটি ঘরের মধ্যে সযত্নে রাখা আছে নেতা ধোপানির কাপড় কাচার সেই বেলেপাথরের প্রস্তর খণ্ডটি। প্রায় সাত ফুট লম্বা ও আড়াই ফুট চওড়া এই পাথরের চারপাশে খোদিত আছে নানান চিত্র। এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। স্থানীয় ভোম্বল শিকদারের পরিবার এটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ত্রিবেণীতে মুসলিমদের অন্যতম স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে জাফর খান নির্মিত মসজিদটিও দর্শনীয় একটি স্থান। ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মিত হয় এবং এই মসজিদের মধ্যে আরবি ক্রমবিন্যাসের স্থাপত্য লক্ষণীয়।
ত্রিবেণী ঘাট থেকে বাইরে বেরিয়ে ডানদিকে রয়েছে বেণীমাধবের মন্দির। বর্তমান পূজারি রবিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে জানা গেল স্বপ্নাদেশে গোপাল পাঠক নামে এক ব্যক্তি, এইখানে তালপাতায় ঘেরা এক মাটির মন্দিরে প্রথমে বেণীমাধবকে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তাঁর জামাতার বংশধররা এই মন্দিরে বংশ পরম্পরায় সেবায়েতের কাজ করে আসছেন। মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখ আছে চাঁদ সওদাগর প্রতিবার বাণিজ্যে যাওয়ার আগে এই বেণীমাধব বা শিবের মন্দিরে পুজো দিয়ে বাণিজ্য যাত্রা করতেন। এই মন্দির দালানে কিছুক্ষণের বিশ্রামের পর পরবর্তী গন্তব্য ত্রিবেণীর কাছেই বাঁশবেড়িয়ায় অন্যতম দর্শনীয় স্থান হংসেশ্বরী মন্দির।
একটু দূরেই সরস্বতী নদীর ব্রিজের কাছ থেকে অটোতে করে মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় হংসেশ্বরী মন্দিরে। রাস্তার বাঁদিকে বয়ে চলেছে গঙ্গা। তার জলজ হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে ডানদিকে গ্যাঞ্জেস জুটমিল, বাঁশবেড়িয়া পৌরসভা ফেলে আলো ছায়া ঘেরা মসৃণ পিচ রাস্তা ধরে দেখতে দেখতেই চলে এলাম হংসেশ্বরী মন্দিরের গেটের কাছে। ঢুকতেই বাঁদিকে লক্ষ করলাম হংসেশ্বরী গেস্ট হাউস। মনে করলে কেউ এখানে দু-একদিনের অবসর কাটিয়ে যেতে পারেন। সামনের দিকে আরেকটু এগিয়েই প্রথমে চোখে পড়ল রাজা নৃসিংহদেবের নহবৎ খানার ধ্বংসাবশেষ। আর ডানদিকে মূল মন্দিরের ফটক। 
১৭৯৯ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলেন রাজা নৃসিংহদেব। মন্দিরের সামনেই সবুজ ঘাসের গালিচা মতো বিস্তীর্ণ লন আর প্রশস্ত চাতাল। মন্দিরের চারদিকে গাছপালা আর ফুলগাছে সজ্জিত এক মনোরম পরিবেশ। 
প্রায় ৭০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট পাঁচতলা এই মন্দিরের কিছু অংশ ইট ও কিছুটা পাথর দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের আট কোণে ও মধ্যস্থানে ৪টি, কেন্দ্রস্থলে একটি, মোট ১৩টি চূড়া আছে। প্রত্যেক চূড়ার শীর্ষ ভাগ পদ্মকোরকের মতো। মূল মন্দিরের ভেতরে হংসেশ্বরী দেবীর মূর্তিটি নিম কাঠ নির্মিত ও নীল বর্ণের। কার্তিক মাসের দীপান্বিতায় দেবীকে রাজবেশ পরানো হয়। সারাবছর হংসেশ্বরী মাতাকে দক্ষিণাকালী রূপে পূজা করা হলেও এই দিন তান্ত্রিক মতে দেবী পূজিত হন। 
যপ্রতিদিন সকালে দর্শনার্থীদের জন্য ভোগের টিকিটের ব্যবস্থা আছে। দুপুরে কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরের দ্বারটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। মূল হংসেশ্বরী মন্দিরটির কিছু দূরে পশ্চিম প্রান্তে টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজ সংবলিত রয়েছে অনন্ত বাসুদেবের মন্দির। ১৯৬৪ সালে এই মন্দিরটি ভারত সরকারের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সৌধ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে এবং সেই মতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অমর নন্দী

Advertisement

 

কীভাবে যাবেন: হাওড়া ও শিয়ালদহ, এই দু’টি স্টশন থেকেই কটোয়া লোকাল পাবেন। হাওয়া-কাটোয়া বা শিয়াদহ-কাটোয়া লোকালে চড়ে ত্রিবেণী পৌঁছতে পারেন। মোটামুটি পৌনে দু’ঘন্টা সময় লাগবে। যদি সড়ক পথে যেতে চান তাহলে কলকাতা থেকেই গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারেন। সময় লাগবে মোটামুটি দু’ঘণ্টা। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ