সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। সেই সব মধুর স্মৃতি মনের মধ্যে লালন করি আমরা। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখবেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে শ্রীনন্দা শঙ্কর।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। সেই সব মধুর স্মৃতি মনের মধ্যে লালন করি আমরা। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখবেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে শ্রীনন্দা শঙ্কর।
আমি আর মা একে অপরের পরিপূরক। আমি যদি আগুন হই, মা তবে জল। আমার মা বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী তনুশ্রী শঙ্কর। মায়ের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ধৈর্য। এমনই শান্ত, ধীরস্থির স্বভাব মায়ের, যা দেখলে সকলেরই শ্রদ্ধা জন্মায়। এখন, চল্লিশ পার করার পর এই বিশেষ গুণটি আমিও ক্রমশ মায়ের কাছ থেকে শিখছি। বলা ভালো, শেখার চেষ্টা করছি। কারণ মায়ের যে ধৈর্য, সেটা মোটামুটি সাধনার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকে দেখে, মায়ের আচরণ বিশ্লেষণ করে আমি বুঝেছি যে কোনও কথা, কাজ ইত্যাদি ঠান্ডা মাথায় শুনলে বা বিচার করলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। মাথা গরম থাকলে সিদ্ধান্তটা হঠকারী হয়ে যায়।
আমি আজ যে জায়গায় পৌঁছেছি, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার মায়ের। একটা গল্প বলি, ছোটবেলায় আমার ইতিহাস আর ভূগোল পড়ায় ভারি অনীহা ছিল। মা দেখলেন এভাবে চললে তো মুশকিল। তখন উনিই পথ বের করলেন। আমার পাঠ্য বই থেকে মা ইতিহাস ও ভূগোলের চ্যাপ্টার ধরে প্রশ্ন উত্তর তৈরি করে দিতেন। আমি সেগুলো পড়ে, মুখস্থ করে পরীক্ষা দিতাম। এভাবেই বেশ উঁচু ক্লাস পর্যন্ত চালিয়েছি। মা ছিলেন ইতিহাসের ছাত্রী, ফলে সেটা পড়াতে বা তার চ্যাপ্টার ধরে প্রশ্ন উত্তর তৈরি করতে মায়ের কোনও সমস্যা হত না। কিন্তু ভূগোল তো আর মায়ের বিষয় নয়। তবু আমার সুবিধে হবে বলে সেই বিষয়টিও নিজের আয়ত্তে নিয়ে এসে তৈরি করে ফেলতেন। এই হলেন আমার মা। আমার দাদু মিলিটারিতে ছিলেন। পারিবারিক আর্মি ব্যাকগ্রাউন্ডের একটা শৃঙ্খলা মায়ের মধ্যে চিরকাল কাজ করেছে। আজও করে। সেই থেকেই হয়তো এত সহজে তিনি এইভাবে আমাকে পড়াতে পারতেন। আর একটা জিনিসও এখানে বলা দরকার। মায়ের হাতের লেখা মুক্তোর মতো। সেই হাতের লেখা দেখে পড়ার আগ্রহটাই বেড়ে যেত।
মা খুব ভালো রান্না করতেন। ঠাকুরমার সঙ্গে যতদিন থেকেছেন ততদিন বাঙালি রান্নাই করেছেন, কিন্তু পরে যখন নিজে সংসার করেছেন তখন নানা ধরনের কন্টিনেন্টোল রান্না করতেন মা। ছোটবেলায় মাকে দেখতাম ওয়াফেল, চিকেন রোস্ট, গার্লিক ব্রেড ইত্যাদি বানাতেন। আমাদের বাড়িতে ওয়াফেল মেশিনও ছিল। আমার এত ভালো লাগত যে সকাল বিকেল ওয়াফেলের বায়না শুরু করতাম। এদিকে অত ময়দা খেয়ে তো মোটাও হয়ে যাচ্ছিলাম। মা তখন হঠাৎই বললেন, মেশিনটা আর নেই। আমি মাকে এতই বিশ্বাস করতাম যে বিনা বাক্যে সে কথা মেনেও নিয়েছিলাম!
ফ্যাশনের ক্ষেত্রে মা একটা নিজস্ব স্টাইল তৈরি করেছেন। আমি সেই নিয়ে ঠাট্টাও করি অনেক সময়। আবার মায়ের কাছ থেকে ফ্যাশনের টিপসও নিই। যেটা সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করি, তা হল মায়ের এলিগ্যান্ট স্টাইল। সাধারণ সেজেও কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্বটা তুলে ধরা যায়, সেটা মায়ের থেকেই শিখেছি। এই যে সাজগোজের প্রতি আমার আগ্রহ, এটা জন্মেছিল মাকে নাচের শোয়ের সময় মেকআপ করতে দেখে।
মায়ের কথা বলছি এতক্ষণ ধরে, কিন্তু তাঁর নাচের প্রসঙ্গে এখনও কিছু বলিনি। এটা তো ঘোর অন্যায়। কারণ আমার মা ‘উদয়শঙ্কর স্টাইল অব ডান্স’-এর প্রতি ওঁর জীবন নিবেদন করেছেন। একটা মজার ব্যাপার আছে আমাদের পরিবারে। শঙ্কর পরিবারের বউরা (অমলাশঙ্কর এবং তনুশ্রীশঙ্কর) নাচকেই নিজেদের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু শঙ্কর পরিবারের মেয়েরা নাচের পাশাপাশি অন্যান্য কেরিয়ারেও সময় দিয়েছেন। ফলে আমি মায়ের স্কুল, যেখানে উদয়শঙ্কর স্টাইল অব ডান্স শেখানো হয়, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্রতী। কিন্তু সেটাই যে আমার একমাত্র কেরিয়ার তা নয়। মায়ের ক্ষেত্রে ওটাই মায়ের কেরিয়ার, মায়ের জীবন। এখন মায়ের ৬৯ বছর বয়স। আজও আমাদের স্কুলে যতজন ছাত্রছাত্রী নাচ শিখতে আসে, সকলকে মা নামে চেনেন। এটাই ওঁর বিশেষত্ব।