মনীষা মুখোপাধ্যায়: ঝকঝকে ঘর, অল্প জায়গাতেও গোছানো হেঁশেল। বিশ্বায়নের এমনই ছোঁয়া পাওয়া যায় গৃহস্থের ঘরে। যখন হেঁশেল নিয়ে আলাদা করে ভাবনাচিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা এল, তখন থেকেই মডিউলার কিচেন শব্দটির আমদানি। একটা সময় ছিল, কলঘর পেরিয়ে হেঁশেলের সামনে দিয়ে বহুবার যাতায়াত করলেও রান্নাঘরের ঘুপচিতে মেয়েদের কী কী অসুবিধা হচ্ছে তা নিয়ে সংসার খুব একটা মাথা ঘামাত না। সকাল সাড়ে আটটায় অফিসের ভাত, আর বেলা বারোটায় বয়স্ক সদস্যদের খাওয়া জুটে গেলেই মনে হত সবই তো ঠিক আছে! দমবন্ধ গরমে, উনুন বা গ্যাসের আঁচের সামনে দাঁড়িয়ে, তেলকালির রান্নাঘরে হাড়মাস এক করে খেটে যেত বাড়ির গৃহিণীরা। যুগ বদলেছে। তার চেয়েও দ্রুত বদলেছে মানুষের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারার মন। বাড়ির গৃহিণীর সুবিধার দিকে নজর দিতে শিখেছে সংসার। তাই আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কাজকে সহজ ও অনায়াস করে তোলার চেষ্টাকে আপন করে নিয়েছে মধ্যবিত্ত। তাছাড়া রান্নাঘর এখন আর একা গৃহিণীর রাজত্ব নয়। বরং বাড়ির কর্তারা অনেকেই হাতে হাতে কাজে সাহায্য করেন। কেউ কেউ আবার রান্নাঘর সামলেও নিতে পারেন একা। তাই ফ্ল্যাট কিনতে গেলেও তাঁদের সকলের মাথায় থাকে, রান্নাঘর কত স্কোয়্যার ফুটের! মডিউলার নাকি সেমি মডিউলার, সুবিধে হবে কীসে?
মডিউলার কিচেন কী?
মিডিয়াম-ডেনসিটি ফাইবারবোর্ড, হাইপ্রেশার লেমিনেট, ধাতুর মতো বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি ক্যাবিনেট বা মডিউলে সাজানো আধুনিক নকশায় তৈরি কিচেনই মডিউলার কিচেন। এ তো গেল তাত্ত্বিক কথা। কিন্তু গৃহস্থের মনে যে আধুনিক রান্নাঘরের ছবি গত কয়েক দশক ধরে বোনা রয়েছে। তাতে শুধু কয়েকটা ক্যাবিনেট থাকলেই হবে না। বরং চাই হেঁশেলের পরিচ্ছন্নতা ও পোকামাকড়ের থেকেও সুরক্ষা। তাই আধুনিক পছন্দে অনেকেরই মডিউলারের চেয়েও সেমি মডিউলার কিচেনে আস্থা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেমি মডিউলার আরশোলা-মাকড়সার বাসযোগ্য নয়। অনেকের মতে, নকশায় এগিয়ে মডিউলারই। তাই বছরে কয়েকটা পেস্টিসাইড সেশন নিয়ে মডিউলারই ভালো!
মডিউলার হোক বা সেমি মডিউলার, অনেকেই ভাবেন এসবে বিশাল খরচ। একটা সময় খরচের অঙ্ক বেশি ছিল ঠিকই। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিতে কাজ অনেক সহজ। বাজেটও মধ্যবিত্তের নাগালে। তাই পকেটে কম চাপ ফেলে হেঁশেলের ভোল বদলাতে খেয়াল রাখতে হবে কয়েকটা দিক, জানালেন ইন্টিরিয়র ডেকরেটর সৌমিক নাগ চৌধুরি।
কিচেনের আকার: বাড়ির হেঁশেলটি কত বড়ো, সমান্তরাল নাকি ইংরেজি ‘এল’ শেপের, একটি ছোট ঘরের আকারের কি? ঘরের রূপ বদলাতে প্রথমেই দেখে নিন এই খুঁটিনাটিগুলি। যদি জায়গা কম থাকে, তাহলে সোজা বা সমান্তরাল রাখুন কিচেন।
স্টোরেজ সাজানো: হাতা-খুন্তি, মশলাপাতি সহ রান্নাঘরের সব প্রয়োজনীয় জিনিসই হাতের কাছে থাকবে, কিন্তু অহেতুক এদিক ওদিক ছড়ানো থাকবে না। বইরে থেকে সব দেখাও যাবে না। আধুনিক কিচেনের ব্যাকরণ এটাই। তাই মডিউলার কিচেন সেট করার আগে থেকেই ঘরের স্টোরেজ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। দেওয়ালে ক্যাবিনেট করবেন নাকি কিচেন কাউন্টারের নীচের অংশে ড্রয়ার রাখবেন, তা প্রথমেই ঠিক করে নিন। বাড়িতে বয়স্ক সদস্য থাকলে সহজেই টানা যায় এমন ড্রয়ারের কথা ভাবতে পারেন। ক্যাবিনেটের বদলে কিচেনের প্রতিটি কোণে ড্রয়ার তৈরি করুন। এতে অল্প জায়গার মধ্যে সুবিন্যস্তভাবে অনেক জিনিসপত্র রাখতে পারবেন। এতে তুলনামূলকভাবে পকেটে চাপ কম পড়ে। আন্ডার ক্যাবিনেট কিচেন ট্রেগুলো ৪-৬-৮ ইঞ্চি ইত্যাদি বিভিন্ন মাপের হয়। এই চ্যানেলগুলোর গভীরতা আপনার কিচেনের ক্যাবিনেটের মাপ অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন। ক্যাবিনেটে কতগুলো ট্রে লাগাবেন, সেই হিসাবটা আগে করে রাখুন। তারপর ট্রে এবং চ্যানেল কিনবেন। এতে অতিরিক্ত ট্রে ও চ্যানেল কিনে খরচ বাড়ানোর ঝুঁকি থাকবে না। ছুরি-কাঁচি, গ্যাস লাইটার, হাতা-খুন্তি থেকে টুকটাক দরকারি জিনিস হাতের কাছে মজুত রাখতে রান্নাঘরের দেওয়ালে কিছু শেলফ বা স্ল্যাব লাগিয়ে নিতে পারেন। খুব কম খরচে পাথরের স্ল্যাব বা ছোটো ছোটো শেলফ তৈরি করা যায়।
কাউন্টার টপ: রান্নাঘরের যে অংশে গ্যাস আভেন রেখে রান্না হয়, সেই স্ল্যাবকে কাউন্টার টপ বলে। অনেকেই খুব খরচ করে নকশাদার মার্বেলের কাউন্টার টপ তৈরি করেন। অথচ রান্নাঘরের তেল-মশলায় সেই পাথরের স্ল্যাবে সহজে দাগ পড়ে। বহু মধ্যবিত্ত ঘরেই একা হাতে অনেককে সংসারের ঝক্কি সামলাতে হয়। তাই নিয়ম করে টপের দাগ তোলা সম্ভব হয় না। তাই নকশাদার গ্রানাইটের টপ এক্ষেত্রে ভালো এবং তা পকেটসাশ্রয়ী।
চিমনি: আজকাল রিমোট কন্ট্রোলড, এআই সমন্বিত চিমনি বাজারে মেলে। তবে তার দামও চড়া। চিমনি রান্নাঘরের অন্যতম প্রয়োজনীয় একটি গ্যাজেট। এতে রান্নার তেলকালি সামনের দেওয়াল ও সিলিংয়ে কালো দাগ তৈরি করতে পারে না। ধোঁয়া শোষণ করে রান্নাঘরের বাতাসকেও শুদ্ধ রাখে। তাই চিমনি প্রয়োজন। কিন্তু অনেক দাম দিয়ে আধুনিক চিমনি কিনতে হবে এমন কোনো মানে নেই। আসল কাজটি করতে পারবে এমন উন্নতমানের ইলেকট্রিক চিমনিই যথেষ্ট। বাজারে ভালো সংস্থার নানা বাজেটের চিমনি রয়েছে। তার মধ্যেই একটি বেছে নিতে পারেন। চিমনির ডাক্টিং যদি বাইরে থেকে দেখা যায় তাহলে সেটা ক্যাবিনেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারেন।
বৈদ্যুতিক দিক: মডিউলার কিচেন সেট করার আগেই রান্নাঘরের বিভিন্ন গ্যাজেটের জন্য ইলেকট্রিক সুইচগুলো কোথায় বসাবেন, সেটা ঠিক করে নিন। মডিউলার ইউনিট বসানোর পর ইলেকট্রিকের কাজ করাতে গেলে অনেক সময় প্ল্যান ভেঙে ফের সাজাতে হয়, খরচ বাড়ে। কিচেন থেকে যাতে সহজেই জল বের হওয়ার আউটলেট থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখুন।
আলো: জানালা থেকে যথেষ্ট পরিমাণে সূর্যের আলো অনেক হেঁশেলেই আসে না। তাই রান্নাঘরের কাজ সারতে বেশ অসুবিধা হয়। এক্ষেত্রে রান্নাঘরের আপার ক্যাবিনেটের পাল্লার নীচের দিকে যে বেরিয়ে থাকা অংশ রয়েছে, তাতে ছোটো ছোটো এলইডি আলো লাগানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। কিচেন ক্যাবিনেটের দু’পাশের দেওয়ালেও থাক বড়ো এলইডি টিউব। এলইডি আলোয় বিলের খরচে রাশ টানা যাবে। খেয়াল রাখবেন, রান্নাঘরে যেন প্রয়োজনীয় প্লাগ পয়েন্টগুলি থাকে। ভারী ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের জন্য পনেরো অ্যাম্পিয়ারের প্লাগ হলেই যথেষ্ট। রান্নাঘরে হালকা রঙের পর্দা দিন। এতে আলো বেশি ঢুকবে।
রান্নাঘরের মেঝে: শুধু কিচেনে আধুনিক রূপ দিলেই হবে না। রান্নাঘরের মেঝের দিকেও নজর রাখুন। দ্রুত পায়ে হাঁটা, জলের কাজ সবই এ ঘরে বেশি। তাই মেঝে যদি পার্টেক্স বা মার্বেলের হয়, তাহলে বেশি ঘষবেন না। বরং মেঝে একটু খসখসে থাকলে পিছলে যাওয়ার শঙ্কা কম। এই ঘরের মেঝের পালিশ সবসময় হ্যান্ড মেশিন দিয়ে করান।
কিচেন গার্ডেন: পাশেই অল্প জায়গায় বানিয়ে ফেলুন কিচেন গার্ডেন। প্রয়োজনীয় সব্জি বা টুকটাক মশলার দরকার মেটাবে এই গাছগুলি। অল্প যত্নে এই গাছগুলি তাজা থাকে।
রান্নাঘরের সাজে নতুনত্ব আনতে অর্থের চেয়েও বেশি প্রয়োজন আধুনিক মন ও সৃজনশীলতা। আপনার রুচিতে সেজে উঠুক গেরস্থালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘরটি।