Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মাকে সবসময় দশে দশ দেব

তখন বর্ধমানে থাকি। প্লে স্কুলে সবে ভর্তি হয়েছি। প্রথম দিন ক্লাস। বাবা-মা স্কুলে নিয়ে গিয়েছে। আমি দেখছি, প্রায় সবাই কাঁদছে। আমি তো খুব স্মার্ট বাচ্চার মতো একদম কাঁদছি না।

মাকে সবসময় দশে দশ দেব
  • ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরা।

Advertisement

তখন বর্ধমানে থাকি। প্লে স্কুলে সবে ভর্তি হয়েছি। প্রথম দিন ক্লাস। বাবা-মা স্কুলে নিয়ে গিয়েছে। আমি দেখছি, প্রায় সবাই কাঁদছে। আমি তো খুব স্মার্ট বাচ্চার মতো একদম কাঁদছি না। সবাই ভাবছে, আরে কী বুঝদার স্মার্ট ছেলে! তারপর ক্লাসের ঘণ্টা বাজতেই জানলা দিয়ে দেখছি মা-বাবা চলে যাচ্ছে। ব্যস! ওই দৃশ্য দেখে তখনই মা-আ-আ বলে সে কী কান্না আমার। ততক্ষণে আবার ক্লাসের সব বাচ্চা চুপ করে গিয়েছে, কিন্তু আমি আর থামছিই না। শেষে এত কেঁদেছিলাম যে আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য হল মা। এমনকী, ওই সময় আমাকে আর স্কুলে ভর্তিই করতে পারেনি। পরে আবার অন্য স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি হলাম! ছোটবেলার কথা মনে পড়লেই এই গল্পটা বারবার উঠে আসে। আর মনে পড়ে যায় আমাকে ভালো মানুষ তৈরি করার জন্য মা কতটা পরিশ্রম করেছে। 
আমি বাবা, মায়ের একমাত্র সন্তান। তাই একে অপরের প্রতি তথাকথিত ‘কনসার্ন’ একটু বেশিই। এখনও, এত বড় বয়সেও কোথায় যাচ্ছি, কখন ফিরব সব মাকে জানাতে হয়। মাও কোথাও বেরলে আমাকে জানিয়ে রাখে। দেরি হবে কি না, এসে কী খাব এসব খোঁজ মা নিয়মিত রাখে। আর আমিও কিন্তু যেখানেই যাচ্ছি, মাকে জানিয়ে যাওয়ার কাজটা ভালোবেসে করি। অনেকে আছেন, মা রেগে যাবে বলে বা খিটখিট করবে বলে হয়তো জানিয়ে রাখে। আমার বেলায় কিন্তু তেমন নয়। ছোট থেকেই আমি এসব জানিয়েছি। তাই এগুলো আমার অভ্যাসের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। এমনকী, এখনও রাতে রোজ ঘুমানোর আগে মায়ের ফোন আসবেই। যখন একসঙ্গে থাকি, তখন আমার ঘরে মা আসবেই ঘুমানোর আগে। আমরা একসঙ্গে প্রার্থনা করব। এটাও আমাদের একটা অভ্যাস। 
আমি যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি। এখনও মা, বাবা, জেঠু সবাই একসঙ্গে থাকে। মা খুব মানিয়েগুছিয়ে সবাইকে নিয়ে চলতে পারে। মুকুন্দপুরে আমার ফ্ল্যাটও ওই বাড়ির কাছেই। কাজের সুবিধের জন্যই আলাদা এই ব্যবস্থা। তবে প্রায় রোজই যাতায়াত আছে। ফলে মা-ছেলের দেখা হচ্ছে না, এমনটা সাধারণত হয় না।
আমি স্নাতক হওয়ার পর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি, তার জন্যও আমার মা, শ্যামলী হাজরার ভূমিকা অনেক। মা কিন্তু কখনও খুব একটা কঠোর ছিল না। বরং ছোট থেকেই আমার কিছু কিছু ইচ্ছায় ছাড় দিয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত মা আমার পড়াশোনা নিজে দেখত। তাই পড়াশোনার দিকে মায়ের বেশ নজর ছিল। এমনকী, আমি যখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কেরিয়ার তৈরির কথা বাড়িতে বললাম, মা কিন্তু খুব বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছিল, আগে গ্র্যাজুয়েশন শেষ কর, তারপর। আমিও সেটাই করেছি।
জানেন, আমার মা খুব ম্যাচিওরড মানুষ। যখন প্রেমে পড়লাম ঐন্দ্রিলার, মাকে বললাম। মা প্রথম থেকেই খুব সাপোর্ট করেছিল। মা সবসময় চায়, আমার ছেলে যেন ভালো থাকে। নানা ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে হয়তো মায়ের সঙ্গে মতে মিলল না— মা কিন্তু আমার উপর কিছু চাপিয়ে দেয়নি কখনও। বরং সেসব ক্ষেত্রে বলেছে, যদি সমস্যায় পড়িস, আমরা তো আছিই। 
ঠেকে শেখায় মা খুব বিশ্বাসী। ভালো-মন্দ নিজে মুখোমুখি হও, নিজে সামলাতে না পারলে মা-বাবা আছে, এটাই শিখেছি ছোট থেকে। কয়েক বছর আগেই আমরা একসঙ্গে থাইল্যান্ড গেলাম, সেটা ছিল মায়ের প্রথম বিদেশ ট্যুর! কী যে আনন্দ হয়েছিল মাকে নিয়ে এই ট্যুর করে। সারা জীবন মনে থাকবে। মাকে আমি যে কোনও সময় যে কোনও পরিস্থিতিতে ১০-এ ১০ তো দেবই। ১০-এর বেশিও দিতে পারি নিঃসংকোচে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ