Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পাহাড়ি পথে আন্তরিক আপ্যায়ন

মন্দির, দেবতা, পুজো সবই তাঁর কাছে আড়ম্বর সমান। তিনি একটাই মন্ত্রে দীক্ষিত, আন্তরিকতা। দুর্গম গিরি কান্তার মরু পেরিয়ে তাঁর আস্তানায় পৌঁছলে এক মুখ হাসি নিয়ে অভ্যর্থনা তিনি জানাবেনই সবাইকে। এই একটা গ্যারান্টি পর্যটকদের কাছে একেবারে একশোভাগ মজুত।

পাহাড়ি পথে আন্তরিক আপ্যায়ন
  • ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মন্দির, দেবতা, পুজো সবই তাঁর কাছে আড়ম্বর সমান। তিনি একটাই মন্ত্রে দীক্ষিত, আন্তরিকতা। দুর্গম গিরি কান্তার মরু পেরিয়ে তাঁর আস্তানায় পৌঁছলে এক মুখ হাসি নিয়ে অভ্যর্থনা তিনি জানাবেনই সবাইকে। এই একটা গ্যারান্টি পর্যটকদের কাছে একেবারে একশোভাগ মজুত। তিনি এমনই এক ব্যক্তিত্ব, পরিচয়ের তলায় যাঁর আসল নামটাই চাপা পড়ে গিয়েছে। তিনি স্পিতি জেলার বাতাল অঞ্চলের চন্দ্রা ধাবার মালকিন, ‘চাচি’। এবং এটাই তাঁর একমাত্র পরিচয়। ১৩,১২৩ ফিট উচ্চতায় নির্মম প্রকৃতির মাঝে, ধূ ধূ প্রান্তরে পর্যটকদের একটুকরো শ্বাস নেওয়ার ঠিকানা এই ধাবা। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চাচি নিজের দায়িত্ব সামলান। হাজার ট্যুরিস্টের ভিড়ের মাঝেও তাঁর মুখের হাসি কখনও ম্লান হয় না। সদা হাস্যময়ী চাচি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পর্যটকদের বিভিন্ন আবদার সামলে চলেন। আর তাই তো বাতালের চাচা চাচির ধাবা চন্দ্রতালগামী পর্যটকদের কাছে এক পরম নিশ্চিন্তির আশ্রয় হয়ে উঠেছে।

Advertisement

নিজেদের গাড়ি নিয়ে এই দুর্গম পথের পথিক হয়েছিলাম এই বছর দুর্গা সপ্তমীতে। মানালি পেরিয়ে খানিক দূর রাস্তা মোলায়েম তারপরেই শুরু হল বন্ধুর পথ। প্রকৃতি ক্রমশ রুক্ষ হয়ে উঠছে। চারদিকে কেবলই ধূ ধূ খাড়াই পথ পাক খেতে খেতে উঠে গিয়েছে পাহাড়ের গা বেয়ে। কোথাও সবুজের ছোঁয়াটুকুও নেই। নেড়া পাহাড়, উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চায়। প্রকৃতিতে সবুজের অভাবের ফলে ক্রমশ কমছে অক্সিজেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, মাথাও ধরে যাচ্ছে। রুক্ষ বাদামি পাহাড়ের ব্যাকড্রপে নীল আকাশ আর নীচে খাদ দিয়ে বয়ে চলা উচ্ছল স্পিতি নদী। ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ শব্দবন্ধটা বুঝি এমন প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গেই খাপ খায়। এমনই পথে চলতে চলতে খানিক বাদে বাদেই থামতে হচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে চড়া কনট্রাস্ট তৈরি করছে রুক্ষতা। গন্তব্যে পৌঁছতে তখনও বেশ খানিকটা বাকি। এমনই সময় বন্ধুর মতোই হাজির হল বাতালে চাচা চাচির ধাবা। মরু প্রান্তরে পর্যটকদের কাছে তা যেন একফালি ওয়েসিস।
সরু সর্পিল রাস্তার একদিকে কোনওক্রমে গাড়ি পার্ক করে একটু কফি ব্রেক নিতে নামলাম আমরা। একটা বড়সড় তাঁবুর মতো অস্থায়ী আস্তানা। তারই ভিতর চলছে চাচির রাজপাট। একমুখ হাসি নিয়ে তিনি প্রথমেই সাদর আমন্ত্রণ জানালেন আমাদের। আমার স্বামী ও আমি কী খাব জেনে নিয়ে কন্যার দিকে তাকিয়ে সহাস্যে প্রশ্ন করলেন, ‘অউর বিটিয়া? ইসকে লিয়ে কেয়া বানাউঁ?’ এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে একেবারেই অচেনা এক মহিলার কাছে এমন অপ্রত্যাশিত আন্তরিক ব্যবহার পেয়ে মনটা ভরে গেল। হাতে গরম চায়ের পেয়ালা নিয়ে শুরু হল আলাপচারিতা। প্রায় চুয়াল্লিশ বছর ধরে এই ধাবা চালাচ্ছেন দর্জি বোধ ও হাসি ছাম্মো। পর্যটকদের কাছে তাঁরাই চাচা ও চাচি নামে পরিচিত। বললেন, প্রথম দিকে সামান্য একটা চায়ের আস্তানা ছিল এই ধাবা। এই পথে স্পিতি নদী পেরিয়ে চন্দ্রা নদীর পথচলা শুরু হয় বাতালের সামান্য আগে থেকে। সেই নদীর নামেই নিজেদের চায়ের আস্তানাটিরও নামকরণ করেছিলেন দর্জি ও হাসি। প্রথম দুর্গম পথ আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খারাপ আবহাওয়া, ঠান্ডায় প্রাণান্তকর অবস্থা। এমন সময়ে ক্লান্ত পথিকের হাতে এক পেয়ালা দুধ দেওয়া ঘন গরম চা ধরিয়ে দিতে পারলে তাদের মধ্যে যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটত। শ্রান্ত পথিকদের মুখে পরম তৃপ্তি দেখে নিজেদেরও মন ভরে যেত চাচা চাচির। শুরুটা সেই থেকেই। তারপর ক্রমশ চাহিদা মতোই ব্যবসাও বাড়িয়ে নিয়েছেন তাঁরা। এই অঞ্চলে অনেক দূর পর্যন্ত কোথাও কিচ্ছুটি নেই। খাবার দোকান, জনবসতি কিচ্ছু না। ফলে সেখানে একটু বিশ্রামের আস্তানা করতে পারলে মন্দ কী? তাছাড়াও এমন রাস্তায় খাবারের খুবই প্রয়োজন। সেই চাহিদা থেকেই প্রথম চায়ের সঙ্গে টায়ের আয়োজন শুরু করেন চাচি। একেবারে সাধারণ খাবার, রুটি বা পরোটা সঙ্গে তরকারি অথবা ম্যাগি, চাউমিন ইত্যাদি। নিরামিষ তরকারি, রুটি ইত্যাদির পাশাপাশি ব্রেড বাটার, চিজ, নানা ধরনের বিস্কুট ইত্যাদিও পাবেন। চায়ের সঙ্গে পাবেন ফ্রুটি জ্যুস বা কোল্ড ড্রিংক। চায়ের ধরনেরও বদল এসেছে পর্যটকদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, জানালেন হাসি। বললেন, ‘ক্রমশ দেখছি বাঙালি ট্যুরিস্ট এ পথে বেড়েই চলেছে। তাঁরা আবার লাল চা ভালোবাসেন। সেই মতোই আমরাও আজকাল লাল চায়ের বন্দোবস্ত রাখছি। তবে শীতবহুল আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে এখানে ‘আদ্রকওয়ালি’ চা বেশি বিক্রি হয়। পর্যটকদের অনেক সময় আমরা বলি কেমন চা খেলে ভালো লাগবে। তাঁদের মতের বিরুদ্ধে গিয়েও খাবার পরিবেশন করি। সেটাই তো আমার কাজ। আতিথেয়তাই আমার ধর্ম। ফলে যদি দেখি কোনও পর্যটক নিজে হয়তো বুঝতে পারছেন না, কিন্তু সেই সময় তাঁর শরীরের ক্লান্তি ও দুর্বলতা কাটাতে শুধু চা নয়, খাবারেরও প্রয়োজন, তাহলে তাকে খাবার খেতে বাধ্যও করি।’ এই মাতৃসুলভ ব্যবহারই চাচিকে আর পাঁচজনের তুলনায় আলাদা করে রেখেছে আর চন্দ্রা ধাবাকে করে তুলেছে পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়।
কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ