Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মনের জোরে বিশ্বজয়

বুকারজয়ী বই ‘হার্ট ল্যাম্প’-এর অনুবাদক দীপ্তি বষ্ঠি সম্প্রতি এসেছিলেন শহরে। একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এল নারীশক্তি, কালজয়ী সাহিত্য ও পুরস্কার জয়ের কথা।

মনের জোরে বিশ্বজয়
  • ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বুকারজয়ী বই ‘হার্ট ল্যাম্প’-এর অনুবাদক দীপ্তি বষ্ঠি সম্প্রতি এসেছিলেন শহরে। একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এল নারীশক্তি, কালজয়ী সাহিত্য ও পুরস্কার জয়ের কথা।  

Advertisement

উন্নতির সোপান বেয়ে আকাশ ছুঁয়েছে নারী। তবু সমাজে তাদের স্থান দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই। এই সমাজের সব সুখ স্বাচ্ছন্দ পুরুষতান্ত্রিক। সেখানে নিজের অধিকারটুকুর জন্যও নিরন্তর লড়াই করতে হয় মেয়েদের। আর এই সত্যটা বিশ্বজুড়ে একইরকম। তার তারতম্য রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান ভেদে মেয়েদের জীবনযাত্রার ধরন ও পরিস্থিতির বদল অবশ্যই হয়। কিন্তু মোটের উপর বিষয়টা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আছে। আর সেই কারণেই প্রাণের টান অনুভব করেছিলাম বানু মুশতাকের গল্পগুলো অনুবাদ করার সময়। একটা তাগিদ ছিল আমার মনে। বলতে পারেন, বানুর এই গল্পগুলোই আমার অনুবাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।’ প্রায় একটানে কথাগুলো বলে গেলেন ২০২৫ সালের বুকারজয়ী বই ‘হার্ট ল্যাম্প’-এর অনুবাদক দীপ্তি বষ্ঠি। সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অ্যান্টনিম-এর উদ্যোগে ‘রিভার অব ওয়ার্ডস’ আলোচনাচক্রে যোগ দিতে। তাঁর সঙ্গে কথা হল সেই অনুষ্ঠানের ফাঁকে। 
হাস্যময়ী লেখিকা প্রথমেই বললেন, ‘আমি কিন্তু অনুবাদক নই। লেখিকা। ওটাই আমার পেশা ও পরিচয়। যে কোনও ভালো বিষয় পেলে সেটার উপর কাজ করি। বানু মুশতাকের গল্পগুলো পড়ে মনে হয়েছিল এই গল্পগুলো বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বড্ড সত্যি। তাই তাকে আঞ্চলিক থেকে আন্তর্জাতিক করতে চেয়েছি। সেই কারণেই বইটা অনুবাদ করার কাজে হাত দিয়েছিলাম।’ 
পুরুষতন্ত্রের অধীনে মেয়েরা বিভিন্ন সময় নানা হেনস্থার শিকার হন। তার থেকে বেরিয়ে আসার পথও তাঁরা নিজেরাই খুঁজে বের করেন। অসম্ভব শক্তি রয়েছে নারীচরিত্রে। নারীশক্তির গল্পই লিখেছেন বানু তাঁর বইয়ে। এগুলো কোনও জাতি বা ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো মেয়েদের গল্প, সমাজে তাদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এগুলোকে নারীবাদী গল্প হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, কিন্তু কোনও ধর্ম বা জাতির মধ্যে বেঁধে রাখা যায় না। এই গল্পগুলো সমগ্র নারীজাতির কথা বলে। তাঁদের ছোটখাট পরিস্থিতির মোকাবিলা করা বা পারিবারিক ও সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা বলে। এই ধরনের পরিস্থিতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজই তৈরি করে। ফলে মেয়েদের কমবেশি এই জিনিসগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। 
‘একদিকে সমাজ নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে, আবার সেই সমাজই অন্য ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন করে। এটাকে সমাজের ভণ্ডামি বলতে পারেন। তবে এটাই বাস্তব’, বললেন দীপ্তি। নিজেদের অস্তিত্ব বোঝানোর জন্য একটা রোজকার লড়াই চলতে থাকে মেয়েদের মধ্যে। তাঁদের কাজের স্বীকৃতি, কথার দাম ইত্যাদি লড়ে নিতে হয়। এমনকী নিজেদের অস্তিত্ব বোঝানোর জন্যও লড়াই করতে হয় মেয়েদের। আর এই কাজগুলো করার জন্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে টিকে থাকার জন্যই প্রচণ্ড চারিত্রিক জোর ও শক্তির প্রয়োজন হয়। সেই শক্তি বা মনের জোর নারীর আছে। আর মজার কথা হল নারীর এই চারিত্রিক জোর বিষয়ে অবগত আমাদের পুরুষ সমাজ। হয়তো সেই কারণেই তারা ‘আপার হ্যান্ড’ নিতে চায়। নিজেদের উচ্চ পর্যায়ে রাখতে চায়। নারী শক্তিকে অবদমন করতে চায়। আর সেইসব করার জন্য প্রতিনিয়ত নানা উপায়ের দ্বারস্থ হয় তারা। কখনও মহিলাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে, কখনও সামাজিকভাবে তাদের দমন করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখে পুরুষতন্ত্র। 
কিন্তু নারী ক্রমশ সতর্ক হয়ে উঠছে। পুরুষদের নানারকম ‘চাল’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠছে এবং সেগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের একটা অস্তিত্ব তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটাই ইতিবাচক দিক। 
আজকের মেয়েরা এই পৃথিবীতে জায়গা দখল করতে শিখে গিয়েছে। তারা আর নারীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস করে না। এখনকার মেয়েরা জোরে হাসে, উচ্চস্বরে কথা বলে, সমাজের কটাক্ষের তোয়াক্কা না করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করার সাহস রাখে। নিজের বক্তব্যকে জোরের সঙ্গে বলতে শিখে গিয়েছে মেয়েরা। একবারে কাজ না হলে বারবার বলতে হবে। মনের জোর বজায় রাখতে হবে, এক না একদিন অর্ধেক আকাশ অধিকার করে নেবেই নেবে নারী, মনে করেন দীপ্তি।     
বুকার প্রসঙ্গে ফিরতে চাইলে দীপ্তি বললেন, ‘একটা বই পড়ে সেটা থেকে রস অনুভব করাটাই ভালো সাহিত্যের লক্ষণ। কোনও পুরস্কারের আশা নিয়ে কেউ বই লেখেন না, আমিও লিখিনি। তবে বুকারের মতো পুরস্কার জয় অবশ্যই আনন্দের। আমার প্রকাশক বইটিকে এই পুরস্কারের তালিকাভুক্ত করার যোগ্য মনে করেছেন এবং বিচারকরা পড়ে তাকে পুরস্কৃত করার জন্য নির্বাচন করেছেন, এগুলো সবই আমার কাছে দারুণ প্রাপ্তি। বানু মুশতাকের কাছেও বটে। তাই বলে গল্প লেখা বা সাহিত্য রচনা কখনওই পুরস্কারের কথা ভেবে হয় না। বরং কালজয়ী সাহিত্য পুরস্কারের মর্যাদা অর্জন করে নিতে পারে। বানু মুশতাকের গল্পগুলো যেমন পেরেছে।’     
কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ