একটার পর একটা সুযোগ কেবল হারিয়েই যাচ্ছে। অসংখ্য আফগান মেয়ের মতো সোদাবাও বিশেষ কিছু করে উঠতে পারছিলেন না। দেশের তালিবান শাসক মহিলাদের উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে চলেছে। ২০২১ সালে তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটাই বাস্তব। যে বাস্তব চোখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না আফগান মহিলাদের। পার্ক বা জিমে যাওয়া চলবে না, রেস্তরাঁয় খেতে যাওয়া চলবে না, বাইরে বেরিয়ে কাজ করা চলবে না (হাতে গোনা কয়েকটি পেশা ছাড়া)— ‘চলবে না’-র তালিকায় জুড়েছে পড়াশোনাও। প্রাথমিক শিক্ষার পর আর মেয়েদের লেখাপড়ার দরকার নেই, তালিবানের নিদান এমনই। ফার্মাকোলজির পড়ুয়া সোদাবা পড়েছিলেন মহা বিপদে। মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে যে! কাউকে কিছু না জানিয়ে চুপচাপ অনলাইনে সমাধান খুঁজতে শুরু করেন তিনি। আশা জাগায় ইন্টারনেট। আফগান মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে একটি কম্পিউটার কোডিং কোর্স খুঁজে পেলেন। সোদাবার নিজের ভাষা দারি। কম্পিউটারে সেই ভাষাতেই শিক্ষা দেবেন এক আফগান শরণার্থী, যিনি বসে সুদূর গ্রিসে।
এখন কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এবং ওয়েবসাইট তৈরির কাজই শিখছেন আফগান কন্যা। তাঁর কথায়, ‘কোনও মানুষ কেন পরিস্থিতির কাছে হার স্বীকার করবে? নিজেকে উন্নত করতে হবে এবং যেভাবে হোক নিজের স্বপ্ন সত্যি করতে হবে। এই নতুন পথে চলতে পেরে খুব আনন্দ হচ্ছে।’ নতুন ধরনের কাজ শিখে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে ২৪-এর তরুণী সোদাবার। নিজের পদবি জানাতে চান না তিনি। তালিবানের রক্তচক্ষু এড়াতে স্বভাবতই চান না পরিচয় প্রকাশ করতে। তাঁকে অনলাইনে শেখাচ্ছেন যিনি সেই যুবক, মুর্তাজা জাফরি একটি সংস্থা খুলেছেন ‘আফগান গিকস’ নামে। তিনি কিশোর বয়সে তুরস্ক থেকে নৌকা করে শরণার্থী হিসেবে পৌঁছে ছিলেন গ্রিসে। মুর্তাজার কম্পিউটার শিক্ষার গল্পটাও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
মুর্তাজা বলেন, ‘না জানতাম ইংরেজি, না কম্পিউটার। কোনও ধারণাই ছিল না। একেবারে গোল্লা। তারপর একটা সময় এল যখন একসঙ্গে গ্রিক আর ইংরেজি শিখছি। সঙ্গে কম্পিউটারও। জানেন, কম্পিউটার অন করতেও পারতাম না। খুব কঠিন সময় ছিল।’ বেশ কয়েক মাস পরে তিনি সার্টিফিকেট পাওয়ার পর সময়টা একটু একটু করে সহজ হয়েছে। কোডিং তাঁর কাছে অন্য দুনিয়া খুলে দিয়েছে, বলছিলেন মুর্তাজা। কয়েক বছর আগে তিনি ‘আফগান গিকস’ খুলেছেন। আর গত ডিসেম্বর থেকে অনলাইন কোর্স শুরু করেছেন। নিজের দেশের মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সাহায্য করার ইচ্ছে তাঁর ছিলই। তাঁর কথায়, ‘অনেক কিছু শিখেছি বিনামূল্যে। শুধু কিছু মানুষ সাহায্য করেছেন বলে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি। তাই আমার নিজের দেশের মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে সেই সাহায্যটাই ফিরিয়ে দিতে চাই যাতে আমার মতো অসংখ্য আফগান মেয়ে উপকৃত হতে পারেন।’ মোট তিনটি ক্লাসে মুর্তাজা এখন আফগানিস্তানের ২৮ জন ছাত্রীকে শেখাচ্ছেন। অনলাইনে ইন্টার্নশিপ ও অন্যরকম পেশার খোঁজ দিয়েও সাহায্য করেন তিনি। যে দেশে অধিকাংশ পেশা নিয়ে আপত্তি তালিবানের, সেখানে অনলাইনে কাজ মেয়েদের বেঁচে থাকার নতুন রসদ।