কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কোমাগাতামারু বজবজের ট্রেন ধরুন। সেখান থেকে অটোযোগে বড়ো বটতলা। সেখান থেকে বামদিকের সোজা রাস্তা ধরে কিছুটা এগলে পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। তবে স্টেশন থেকে গাড়ি রিজার্ভ করেও এখানে সরাসরি চলে আসা যায়।
কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কোমাগাতামারু বজবজের ট্রেন ধরুন। সেখান থেকে অটোযোগে বড়ো বটতলা। সেখান থেকে বামদিকের সোজা রাস্তা ধরে কিছুটা এগলে পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। তবে স্টেশন থেকে গাড়ি রিজার্ভ করেও এখানে সরাসরি চলে আসা যায়।
অরিন্দম ঘোষ: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজ থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে পুজালির সুপ্রাচীন রাজীবপুর গ্রাম। জায়গাটির বর্তমান নাম আছিপুর। ব্রিটিশ রাজত্বকালে সুদূর চীন দেশ থেকে এক ব্যবসায়ী এখানে আসেন। তাঁর নাম টং আছু। এখানেই তিনি গড়ে তোলেন চীনাদের প্রথম বসতি। এখানে একটা চীনা মন্দিরও নির্মিত হয়। এই মন্দির ঘিরে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে চৈনিক নববর্ষ পালিত হয়। আছু সাহেবের উদ্যোগে এখানে স্থাপিত হয়েছিল প্রথম রিফাইন্ড সুগার মিল।
১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের কথা। পুজালির গঙ্গার ঘাটে বাণিজ্যতরী নোঙর করেন টং আছু। পরবর্তীকালে তাঁর নামানুসারেই এই স্থানের নাম হয় আছিপুর। চীনা লোককাহিনি অনুসারে, টং আছু যখন ভারতে আসেন, তখন চীনে চরম আর্থিক সংকট চলছে। চীনা ব্যবসায়ীরা ভাগ্যান্বেষণের চেষ্টায় বেরিয়ে পড়েছেন সমগ্র বিশ্বজুড়ে। টং আছু ছিলেন এমনই এক চা ব্যবসায়ী। জাহাজে চা ভর্তি করে বেরিয়ে পড়েছিলেন অজানার সন্ধানে। ভাসতে ভাসতে তাঁর জাহাজ যখন তৎকালীন রাজীবপুর গ্রামের নদীর পাড়ে এসে উপস্থিত হল, তখন ঘটল মহা বিপত্তি। অচেনা আগন্তুককে বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে আসতে দেখে তৎকালীন জমিদার তাঁকে আটক করার নির্দেশ দেন। নায়েব এরপর জমিদারের নির্দেশমতো তাঁকে গ্রেপ্তার করতে গেলে আছু জানান যে তিনি তাঁদের সকলের জন্য চা নিয়ে এসেছেন। ভারতে চায়ের প্রচলন তখনও সেভাবে হয়নি। সকলেই সেই অদ্ভুত বস্তু পান করে আনন্দে আপ্লুত হয়ে ওঠেন।
পুরনো নথিপত্র থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ ভাইসরয় ওয়ারেন হেস্টিংসকেও তিনি চা উপহার দেন। হেস্টিংস সাহেব আছিপুরে বার্ষিক ৪৫ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে আছুকে ৩৫০ বিঘা জমি অনুদান দিলেন। এই জমিতেই তিনি গড়ে তুললেন ভারতের প্রথম রিফাইন্ড সুগার মিল।
আছুর ভারতে আগমন সম্পর্কে আরও একটা লোককাহিনি প্রচলিত আছে। চীন থেকে চা আর চিনি নিয়ে জাহাজে পাড়ি দেওয়ার সময় সেটি প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে। এই ঝঞ্ঝার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জাহাজে থাকা দু’টি কাঠের দেবতার কাছে কাতর স্বরে প্রার্থনা করতে থাকেন আছু। অলৌকিকভাবে জাহাজটি ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পায়। এই ঘটনার পর আছু প্রার্থনা করা দেবতাদের উদ্দেশে একটা মন্দির তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। চীনা ভাষায় এই মন্দিরের নাম ‘বোগং-বোপো’। এর টানে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন।
মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করার পর একটা খোলা মাঠ চোখে পড়ে। চৈনিক উৎসব পালন করার সময় চীনারা এই মাঠ ব্যবহার করে থাকেন। এখানে ওই বিশেষ সময়ে ড্রাগন নৃত্য ও আতসবাজি পোড়ানোর মধ্যে দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। মাঠের বাঁদিকে জলাশয় আর ডানদিকে মূল মন্দির প্রাঙ্গণে যাওয়ার জন্য ছোটো প্রবেশপথ। চীনা নববর্ষের দিন এগুলি নানারকম সাজসজ্জায় সুশোভিত হয়ে ওঠে। চীনা নববর্ষের দিন শুধু চীনারা নন, সমস্ত ধর্মের মানুষজনই দেবদেবীর উদ্দেশ্যে ভক্তিভরে নৈবেদ্য নিবেদন করে থাকেন। উপচার হিসেবে ফল, চা, বিস্কুট, মদ, রোস্টেড মুরগি ইত্যাদি দেওয়া হয়। মন্দিরে জ্বালানোর জন্য চৈনিকরা ধূপ-মোমবাতি ছাড়াও সঙ্গে নিয়ে আসেন বিশেষ কাগজ দিয়ে তৈরি নকল টাকা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এর মাধ্যমে পূর্বপুরুষ ও মৃত ব্যক্তিগণ স্বর্গে পুনর্জীবন লাভ করবেন। তখন উৎসবের আমেজে মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে।
মূল গর্ভগৃহের প্রবেশদ্বারের চীনা ভাষায় খোদিত দুটো লাল রঙের ক্যালিগ্রাফি। গর্ভগৃহে একটা সুসজ্জিত বেদীর উপর দু’টি কাঠের মূর্তি। এই দুই মূর্তি আছু নিয়ে এসে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের কাছে এই মূর্তি দুটো খোদা ও খুদি নামে পরিচিত। মন্দিরের ডান পাশে বিশ্রাম কক্ষ। সেখানে দেওয়ালে মন্দির সংস্কারে সাহায্যদাতাদের নাম চীনা হরফে শোভা পাচ্ছে। চৈনিক উপাসনা গৃহের সঙ্গে আছু সাহেব প্রতিষ্ঠিত আরও একটা মন্দিরও অবশ্যই দ্রষ্টব্য।
যখন এখানে আছু এসেছিলেন, তখন এই জায়গা ছিল বনজঙ্গলে ভর্তি। স্বভাবতই এখানে তখন বাঘের অত্যাচার ছিল। তাই বাঘ দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য আছু মূল মন্দিরের পিছনে একটি ছোটো মন্দির স্থাপন করেন। মন্দিরটি চতুষ্কোণ বিশিষ্ট। মন্দিরের স্থাপিত একটি ঘটকে দেবতা মনে করে পূজা করা হয়। মন্দির চত্বরে মূল মন্দিরের পাশে মন্দির প্রতিষ্ঠার সময়কালীন একটি বিশাল বটবৃক্ষ বহু ঘটনার সাক্ষীবাহী।
মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর চৈনিকরা নদীর পাড়ে অবস্থিত সমাধিক্ষেত্রে শ্রদ্ধা জানাতে যান। আছু সাহেবের সমাধিটি অশ্বক্ষুরাকৃতি। এর কারণ হিসেবে একটি মত উঠে আসে। বড়লাট খুশি হয়ে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কতটা জায়গা তাঁর প্রয়োজন, তখন হাতের ইশারাতে দেখিয়েছিলেন, ‘এই এত্তোটা’। সেই ইশারামতো জমির আকৃতি হয় ঘোড়ার খুরের মতো। আছুর সমাধিসৌধের মধ্যে চীনা ভাষায় উৎকীর্ণ বহু প্রাচীন একটি ফলক পরিলক্ষিত হয়।
আছিপুরের চীনা মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ করেন কলকাতার গি হিং চার্চ ও ক্লাব। তবে মন্দির ও স্মৃতিসৌধ দেখাশোনার কাজটি প্রায় ছয় প্রজন্ম ধরে করে আসছে একটি মুসলিম পরিবার। সারা বছর ধরে এখানে চৈনিকদের দেখা না মিললেও নববর্ষে উৎসবে তাঁরা আসেন দেশ- বিদেশ থেকে। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে দূর থেকে আসা পর্যটকদের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন স্থাপিত হয় এই উৎসবের মাধ্যমে।