বাঙালিয়ানায় ভরা পয়লা বৈশাখ মেনু
বাঙালিয়ানায় ভরা পয়লা বৈশাখ মেনু
শরৎ বোস রোডের উপর বাঙালি খাবারের রেস্তরাঁ আহেলি। এখানকার শেফ অভিজিৎ দত্ত জানালেন, পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন কিছু। তাই বিশেষ মেনু ভাবতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের সব জেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের পদ দিয়ে সাজানো হয় এই মেনু। তার সঙ্গে থাকে বাঙালি আদলে খাবার পরিবেশন। কাঁসার থালা, প্রদীপ, শাঁখ ইত্যাদি সহযোগে পরিবেশন করা হয় খাবার। মাংসের মধ্যে এবছর কালো ভুনা মাংস পরিবেশন করা হবে। পদটি বাংলাদেশি। কিন্তু তাতে পেঁয়াজের বেরেস্তা, নানারকম মশলা রোস্ট করে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া কুমোরপাড়ার মাংসের পোলাও তো নামেই বাঙালি। মাটির হাঁড়িতে এই পোলাও পরিবেশন করা হয়। সেই দুটো রেসিপি জানালেন শেফ।
কুমোরপাড়ার মাংসের পোলাও:
উপকরণ: বাসমতী চাল (আধ ঘণ্টা ভেজানো) ২৫০ গ্রাম, মাংস ৩০০ গ্রাম, মাংস রান্না করার জন্য দেড় কাপ জল, পোলাওয়ের জন্য চালের দ্বিগুণ জল, মশলা: ঘি ৫০ গ্রাম, দারচিনি ২ ইঞ্চি কাঠি, লবঙ্গ ৪টে, ছোট এলাচ ২টো, বড় এলাচ ২টো, স্লাইস করা পেঁয়াজ ৫০ গ্রাম, চেরা কাঁচালংকা ৬টা, গরমমশলা ৫ গ্রাম, হলুদ গুঁড়ো সামান্য, নুন স্বাদ মতো, আদা-রশুন বাটা ৫ গ্রাম, গোলাপের পাপড়ি ৪-৫টা।
প্রণালী: একটা তলামোটা কড়াইতে ঘি গরম করে নিন। এবার পেঁয়াজ ভাজুন। রং ধরতে শুরু করলে মাংস দিন। বাকি মশলা দিয়ে কষাতে থাকুন। অল্প জল দিয়ে কষিয়ে সেদ্ধ করে নিন। মোটামুটি ৯০ শতাংশ সেদ্ধ হলে নামিয়ে নিন। ইতিমধ্যে চাল ধুয়ে জল ফেলে শুকিয়ে রাখুন। এবার কড়াইতে খানিকটা ঘি গরম করে দারচিনি, লবঙ্গ, ছোট এলাচ ও বড় এলাচ ফোড়ন দিন তারপর চাল দিয়ে ভাজুন। ভাজতে ভাজতে তাতে হলুদ গুঁড়ো, চেরা কাঁচালংকা, নুন দিয়ে মিশিয়ে নিন। এবার মাংস দিয়ে দিন। সবটা মিশিয়ে আরও খানিকক্ষণ কষিয়ে নিন। এরপর তার উপর গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে কড়াইয়ের মুখ আটা দিয়ে সিল করে তা ঢিমে আঁচে দমে রান্না হতে দিন। মিনিট দশেক এইভাবে রান্না করার পর আঁচ থেকে নামিয়ে আটার সিল খুলে পরিবেশন করুন।
কালো ভুনা মাংস:
উপকরণ: খাসির মাংস ৫০০ গ্রাম, পেঁয়াজের স্লাইস ৪০০ গ্রাম, আদা-রশুন বাটা ৭৫ গ্রাম, কাঁচালংকা বাটা ১ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়ো সামান্য, কালো ভুনা মশলা ২০ গ্রাম, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, সরষের তেল দেড় কাপ, নুন স্বাদমতো, ধনে গুঁড়ো অল্প।
কলো ভুনা মশলার জন্য: শুকনো লংকা ২টো, স্টার অ্যানিস ১টা, দারচিনি ১ ইঞ্চি কাঠি, ছোট এলাচ ৪টে, লবঙ্গ ১ টেবিল চামচ, গোটা জিরে ১ টেবিল চামচ, গোটা গোলমরিচ ১ টেবিল চামচ, রাঁধুনি ১ টেবিল চামচ, জায়ফল ১টা।
প্রণালী: কালো ভুনা মশলা বানানোর সব উপকরণ শুকনো খোলায় রোস্ট করে নিন। তারপর তা গুঁড়ো করে নিন। এবার মাংসে আদা-রশুন বাটা, কাঁচালংকা বাটা, হলুদ গুঁড়ো, লেবুর রস দিয়ে মাংস চার থেকে ছ’ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখুন। এবার তলামোটা কড়াইতে সরষের তেল গরম করে নিন। তাতে পেঁয়াজের স্লাইস দিয়ে ভাজুন। পেঁয়াজে রং ধরলে মাংস দিয়ে কষাতে থাকুন। মোটামুটি মিনিট কুড়ি কষিয়ে নেওয়ার পর দেখবেন মাংস থেকে তেল ছেড়ে আসতে থাকবে। তখন ঢিমে আঁচে ঢাকা দিয়ে মাংস রান্না হতে দিন। ইতিমধ্যে কালো ভুনা মশলার জন্য রোস্ট করা উপকরণগুলো গুঁড়ো করে নিন। তারপর তা মাংসে মিশিয়ে কষাতে থাকুন। ক্রমশ মাংসে কালচে বাদামি রং ধরবে। এবং মাংস সুসিদ্ধ হয়ে আসবে। তখন তা আঁচ থেকে নামিয়ে পরিবেশন করুন।
বাংলা নববর্ষের বিশেষ আয়োজন:
সপ্তপদী রেস্তরাঁর কর্ণধার, শেফ রঞ্জন বিশ্বাস জানালেন, পয়লা বৈশাখের মেনু ঠিক করেন বাঙালির আবেগের কথা মাথায় রেখে। এমন খাবার যা বাঙালির ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে দেবে। আবার পাশাপাশি একটু নতুন কিছুও করার চেষ্টা করেন তাঁরা। শরবত, স্টার্টার ইত্যাদির মধ্যে একটু নতুনত্ব রাখা হয়। এবার পয়লা বৈশাখে একটা বিশেষ মশলা তৈরি করেছেন শেফ। নাম সপ্তফোড়নের মাছ। পাঁচফোড়ন আমাদের খুবই পরিচিত। কিন্তু এবার সাতটা মশলা দিয়ে ফোড়ন দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আমআদা আর নারকেল দিয়ে পাবদা মাছও থাকছে নতুন বছরের মেনুতে। আমআদা গ্রীষ্মকালে খুবই সহজে পাওয়া যায়। আর নারকেলের দুধ মাছের স্বাদ বাড়ায়। এই দুটো উপকরণের মিলমিশে তৈরি হয় এক নতুন ধরনের পদ। দু’টি পদেরই রেসিপি জানালেন শেফ।
পাবদা আমআদা নারকেল
উপকরণ: পাবদা ৫০০ গ্রাম, আমআদা বাটা ৫০ গ্রাম, সরষে বাটা ২৫ গ্রাম, কালো জিরে ৫ গ্রাম, কাঁচালংকা বাটা ১০ গ্রাম, হলুদ গুঁড়ো ৫ গ্রাম, সরষের তেল ২ টেবিল চামচ, নারকেলের দুধ ২ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো।
প্রণালী: পাবদা মাছে নুন ও হলুদ মাখিয়ে রেখে দিন। তারপর কড়াইতে তেল গরম করে মাছ হালকা করে ভেজে নিন। এবার কড়াইয়ের তেলের সঙ্গে আর একটু তেল যোগ করে কালো জিরে, কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। তারপর সরষে বাটা দিয়ে নেড়ে নিন। এবার আমআদা বাটা মেশান। ঢিমে আঁচে মশলা কষিয়ে নিন। বাকি মশলা দিয়ে নেড়ে নিন। সব শেষে নারকেলের দুধ দিয়ে ঢিমে আঁচে রান্না হতে দিন। ফুটে উঠলে ভাজা মাছ দিয়ে ঢাকা দিন। ঢিমে আঁচে মিনিট পাঁচেক রেখে নামিয়ে নিন। সাদা ভাত সহযোগে পরিবেশন করুন।
সপ্তফোড়ন ভেটকি ফ্রিটারস
উপকরণ: সপ্তফোড়নের জন্য: গোটা জিরে ১ চামচ, গোটা ধনে ১ চামচ, শুকনো লংকা ২টো, দারচিনি ১ ইঞ্চি কাঠি, বড়ো এলাচ ২টো, ছোটো এলাচ ৪টে, স্টার অ্যানিস ১টা
অন্যান্য উপকরণ: ভেটকি মাছের ফিলে (ফিশ ফিংগারের মতো কাটা) ২৫০ গ্রাম, ডিম ১টা, ব্রেড ক্রাম্বস ৮৫ গ্রাম, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, আদা রশুন বাটা ১ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো স্বাদমতো, কাসুন্দি ১ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, তেল ভাজার অনুপাতে।
প্রণালী: প্রথমে মাছের ফিলেগুলো নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো ও লেবুর রস মাখিয়ে দশ মিনিট রেখে দিন। তারপর তাতে আদা-রশুন বাটা মাখিয়ে আরও দশ মিনিট রেখে নিন। এবার সপ্তফোড়নের সব মশলা শুকনো খোলায় রোস্ট করে নিন। তা হালকা ঠান্ডা করে নিন। তারপর এই মশলা একসঙ্গে নিয়ে গুঁড়িয়ে নিন। এবার মাছের ফিলেতে এই মশলা ভালো করে মাখিয়ে মোটামুটি পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রেখে দিন। ইতিমধ্যে একটা ছড়ানো প্লেটে ব্রেড ক্রাম্বস ঢেলে নিন। একটা বাটিতে ডিম নুন ও গোলমরিচ সহ ফেটিয়ে নিন। তারপর মশলা মাখানো মাছের ফিলেগুলো ডিমের গোলায় ডুবিয়ে তারপর ব্রেড ক্রাম্বসে গড়িয়ে নিন। কড়াইতে পরিমাণ মতো তেল গরম করে মাছ মুচমুচে করে ভেজে তুলুন।
নতুন পদে রেস্তরাঁয় বর্ষবরণ
সিক্স বালিগঞ্জ প্লেস রেস্তরাঁর কর্ণধার ও বিখ্যাত শেফ সুশান্ত সেনগুপ্ত জানালেন, পয়লা বৈশাখে সবাই চান বাঙালি খাবার। সেই মতোই এই রেস্তরাঁয় একটা বিশেষ বুফের আয়োজন করা হয়। তাতে গতানুগতিকের পাশাপাশি নতুনত্বও থাকে মেনুতে। এবছর যেমন নতুন খাবারের মধ্যে চিটাগং মরিচ মাংস, সুরাটি চিকেন মিঠা কাবাব, তিল লংকা মুরগি ইত্যাদি থাকবে। পাশাপাশি রেস্তরাঁর জনপ্রিয় পদের মধ্যে চিংড়ির মালাইকারি, ভেটকির ফ্রাই, বাসন্তী পোলাও তো পাবেনই। সুরাটি কাবাব নাকি ঠাকুরবাড়িতেও জনপ্রিয় ছিল। সেই রেসিপি মেনেই এই রান্নাটি করা হয়েছে রেস্তরাঁয়।
এছাড়াও বাঙালির যে কোনো অনুষ্ঠানে মিষ্টির বড় ভূমিকা থাকেই। সে কথা মনে রেখে শেফ এই দিনের জন্য রেখেছেন ছানার পায়েস, ছানার জিলিপি, মিষ্টি দই সহ আরও হরেক পদ। এই দিন দুপুরবেলায় সপরিবার লোকে এই মেনু চেখে দেখতে চান। পয়লা বৈশাখ মেনু থেকে দু’টি পদের রেসিপিও পাঠকদের জানালেন তিনি।
তিল লংকা মুরগি
উপকরণ: বোনলেস চিকেন লেগ ২৫০ গ্রাম, ধনেপাতা বাটা ৫০ গ্রাম, পালং শাক বাটা ৩০ গ্রাম, আদা বাটা ১০ গ্রাম, রশুন বাটা ১০ গ্রাম, জল ঝরানো টক দই ১০ গ্রাম, কাঁচালংকা বাটা ১০ গ্রাম, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো ৫ গ্রাম, ডিম ১টা, চালের গুঁড়ো ১০ গ্রাম, ময়দা ১০ গ্রাম, কর্নফ্লাওয়ার ১০ গ্রাম, সাদা তিল ২৫ গ্রাম, সাদা তেল ভাজার জন্য, নুন স্বাদ মতো।
প্রণালী: আদা-রশুন বাটা, নুন, দই, গোলমরিচ গুঁড়ো, লেবুর রস, পালং শাক, ধনেপাতা বাটা, কাঁচালংকা বাটা দিয়ে চিকেন ম্যারিনেট করে রেখে দিন অন্তত ২০ মিনিট। এবার ডিম ফেটিয়ে ম্যারেনিট করা চিকেনের মধ্যে মেশান। তিল শুকনো খোলায় ভেজে রেখে দিন। এবার ময়দা, চালের গুঁড়ো ও কর্নফ্লাওয়ার একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। তাতে সামান্য নুন দিন। এই মিশ্রণে ম্যারিনেট করা চিকেন কোট করে নিন। তারপর কড়াইতে তেল গরম করে তা ভেজে নিন। এরপর গরম অবস্থায় তা ভাজা তিলের উপর গড়িয়ে নিয়ে পরিবেশন করুন।
মুরগির সুরাটি কাবাব
উপকরণ: চিকেন লেগ ৮-১০টা, গাওয়া ঘি ১০০ গ্রাম, কিশমিশ ১৫ গ্রাম, আমন্ড স্লাইস ১৫ গ্রাম, চিনি ১০০ গ্রাম, আদার রস ১ টেবিল চামচ, জাফরান কয়েকটা, নুন স্বাদমতো।
প্রণালী: চিকেন লেগ ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। তাতে নুন ও আদার রস মাখিয়ে মিনিট দশ থেকে পনেরো রেখে দিন। এবার কড়াইতে ঘি গরম করে তাতে ম্যারিনেট করা চিকেন নেড়ে নিন। চিকেনে রং ধরা পর্যন্ত নাড়বেন। এবার একটা পাত্রে দু’কাপ জল ফুটিয়ে অর্ধেক পরিমাণ করে নিন। তাতে চিনি দিয়ে সিরাপ তৈরি করুন। এবার এই সিরাপ চিকেন লেগের সঙ্গে মিশিয়ে নিন। উপর থেকে আমন্ড, কিশমিশ ও জাফরান ছড়িয়ে ঢিমে আঁচে রান্না হতে দিন। চিকেন সেদ্ধ হলে ও চিনির সিরাপ চিকেনের গায়ে মিশে লেগে গেলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।