Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

২০২৫ সাফল্যের নিরিখে সেরা ১০

বছর শেষের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। আর মাত্র চার দিন বাদেই ২০২৬ সালকে স্বাগত জানাব আমরা। তার আগে সারা দেশের নিরিখে ফিরে দেখা যাক ২০২৫ সালে মহিলাদের গৌরবগাথার কিছু মুহূর্ত।

২০২৫ সাফল্যের  নিরিখে সেরা ১০
  • ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বছর শেষের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। আর মাত্র চার দিন বাদেই ২০২৬ সালকে স্বাগত জানাব আমরা। তার আগে সারা দেশের নিরিখে ফিরে দেখা যাক ২০২৫ সালে মহিলাদের গৌরবগাথার কিছু মুহূর্ত। 

Advertisement

মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ জয়

যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। মহিলাদের খেলাধুলো নিয়ে যাঁরা বাঁকা চোখে তাকান, তাঁদের সকলের মুখে ছাই দিয়ে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছে এবছর। ২ নভেম্বর ২০২৫ সেই বহু প্রতীক্ষিত ক্ষণের অবতরণ ঘটল নভি মুম্বইয়ের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। শেফালি ভার্মার ৮৭ রান আর দীপ্তি শর্মার ৫ উইকেটের কাঁধে চড়ে ভারতের মহিলা ক্রিকেট টিম জিতে নিল বিশ্বকাপ। ২০০৫ ও ২০১৭ সালে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছিল ভারতের। কিন্তু আর না, এবার সব বাঁধন পেরিয়ে ভারতের মেয়েরাই চ্যাম্পিয়ন! নভি মুম্বইয়ের স্টেডিয়ামে সেদিন ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। প্রচণ্ড লড়াই ও বেশ কিছু শ্বাসরুদ্ধ মুহূর্তের পর শেষ হাসি হাসলেন হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে ভারতীয় একাদশ। দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলা ক্রিকেট দলকে ৫২ রানে হারিয়ে তাঁরা জিতে নিলেন বিশ্বকাপ ২০২৫। মুহূর্তে গড়লেন ইতিহাস। মহিলা ক্রিকেট দলকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত গোটা দেশ। 

বুকারজয়ী বানু মুশতাক

কন্নড় ভাষায় গল্প লিখতেন বানু মুশতাক। মুসলিম সমাজে নারীর দুর্গতির কথা, তাঁদের না পাওয়ার গল্প। সেই গল্পই যে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে পুরস্কার জিতে নেবে একথা তাঁর ভাবনারও অতীত ছিল। শুধু তাই নয়, এই প্রথম কোনও আঞ্চলিক ভাষায় লেখা গল্পের বই বুকার পুরস্কার পেল। তবে এই আঞ্চলিক কাজকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন দীপ্তি বষ্ঠি। তাঁর কৃতিত্বও কোনও অংশে কম নয়। লন্ডনে গ্রীষ্মের সেই সন্ধ্যাটি ভারতীয় দুই নারীর কাছে ছিল ভারী মনোরম। মহিলাদের কথা লিখে স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে এই পুরস্কার আরও অর্থবহ তাঁদের কাছে।

গিনিস বুকে স্বনামধন্য জাহ্নবী জিন্দাল

২০১৬ সালে ছোট্ট মেয়ে জাহ্নবী জিন্দাল তার বাবা মাকে বলে একজোড়া রোলার স্কেট কিনে দিতে। ফ্রিহ্যান্ড রোলার স্কেটিং ছিল তার স্বপ্ন। বাবার কাছ থেকেই প্রাথমিক বিদ্যা অর্জন করেছিল সে। কিন্তু তাঁর কন্যা যে ১৮ বছর বয়সেই ১১ বার গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম তুলে ফেলবে সে কথা বাবা মুনীষ জিন্দাল আদৌ ভাবেননি। বরাবরই অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় জাহ্নবী। রিভার র‌্যাফটিং, রক ক্লাইম্বিং ইত্যাদির নেশা তার। বাবার কাছে শেখার পর রোলার স্কেটিংয়ের পরবর্তী পাঠ নেওয়ার জন্য সে কোনও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বেছে নেয়নি। বরং ইউটিউব ও অন্যান্য সমাজমাধ্যমে ক্লাস করেই পারদর্শী হয়েছে। চণ্ডীগড়ের রোজ গার্ডেন আন্ডারপাসে এক ভীষণ কঠিন রোলিংয়ের পর একেবারে নিখুঁত ল্যান্ডিং জাহ্নবীকে তার শেষ খেতাবটি এনে দেয়। মাত্র ৩০ সেকেন্ডে ৩৬০ ডিগ্রি রোটেশনে ২৭টি স্পিন সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয় জাহ্নবী। ভবিষ্যতে রোলার স্কেটিংয়ের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলতে চায় সে।

নির্যাতিতদের পাশে বর্ষা দেশপাণ্ডে

ভারতের গ্রামেগঞ্জে কন্যাসন্তান বড়ই দায়। অতএব ভ্রূণেই হত্যা করে ফেলা যাক তাকে। অবৈধ হলেও আমাদের দেশে টাকার বিনিময়ে অবাধে করা হয় ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ। এই অপরাধ বন্ধ করার কাজে নেমেছিলেন সমাজসেবী বর্ষা দেশপাণ্ডে। তিনি প্রায় তিন দশক ধরে মহিলাদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া নানা অপরাধ নিয়ে কাজ করে চলেছেন। ভবিষ্যতেও সমাজের নির্যাতিত মহিলাদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের সাহায্য করার কাজে ব্রতী থাকবেন। কিন্তু সেই কাজের জন্য তিনি পুরস্কৃত হননি। বরং ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘পপুলেশন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন কন্যাভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়া‌ই঩য়ের জন্য। ৫৬টি কন্যাভ্রূণ হত্যার কেস হাতেনাতে ধরে তা নির্মূল করার কাজটি করেছেন বর্ষা। আর সেই কাজের স্বীকৃতি হিসেবই এই পুরস্কার।  

বন্যদের সংরক্ষণে পুরস্কৃত সোনালি ঘোষ

২০২৩ সালে একটা ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন বাঙালি কন্যা সোনালি ঘোষ। কাজিরাঙা জঙ্গলের প্রথম মহিলা ডিরেক্টর পদে নিযুক্ত হন তিনি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সেই থেকেই জঙ্গল ও পশু রক্ষার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ‘আইইউসিএন কেন্টন মিলার’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি ২০২৫-এর অক্টোবরে। কাজিরাঙার জঙ্গলে গণ্ডার ও হাতিদের বিশেষ পদ্ধতিতে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই এই পুরস্কার প্রদান করা হয় তাঁকে। তিনিই প্রথম ভারতীয়, যাঁকে এই সম্মান দেওয়া হল। ১০ অক্টোবর ২০২৫-এ আবু ধাবিতে এই অনুষ্ঠানের আয়জন করা হয়েছিল। পশু সংরক্ষণ, তাদের ব্রিডিং করানো, চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ইত্যাদি নানা কাজের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।

মুম্বইয়ের মেট্রো উওম্যান অশ্বিনী বিড়ে

ভারতের ‘মেট্রো উওম্যান’ নামেই তাঁর পরিচিতি। পেশায় আইএএস অফিসার অশ্বিনী বিড়ে মুম্বই মেট্রো লাইনকে বিশেষভাবে উন্নত করেন। বস্তুত মুম্বই অ্যাকোয়া মেট্রো বা জলের তলায় মেট্রো লাইন তাঁরই পরিকল্পনা। এছাড়াও মেট্রো চলাচলকে আরও বিস্তৃত ও জনসাধারণের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছেন তিনি বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে। বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ে আরও বেশি মাত্রায় ব্যবসার সুযোগ বাড়িয়ে তোলার জন্যও যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হওয়া প্রয়োজন। সবদিক বিচার করেই অশ্বিনী মুম্বই মেট্রো চলাচল উন্নত করার পরিকল্পনা করেন ও তা কার্যকর করতে সক্ষম হন। তাঁর এই কৃতিত্বের জন্য তাঁকে এবছর সেপ্টেম্বর মাসে ‘কনস্ট্রাকশন ওয়ার্ল্ড’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হয়।

সমর্থম-এর ডঃ অঞ্জলি আগরওয়াল

তিনি হুইল চেয়ার নির্ভর। বাড়ি থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, চাকরিক্ষেত্র সর্বত্রই তাঁকে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে সামান্য এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়ার জন্য। আমাদের দেশে সঠিক ফুটপাত, র‌্যাম্প ইত্যাদির অভাবের কারণেই বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের চলাফেরায় প্রচুর অসুবিধা হয়। অন্যের অবহেলা, তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা, করুণা ও বিরক্তির শিকার হতে হয়। বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেই জন্যই অঞ্জলি শুরু করেন ‘সমর্থম’ নামে একটি সংস্থা। ভারতের ‌রাস্তা, হোটেল, হাসপাতাল, ইমারত, সৌধ ইত্যাদি উন্নত করে, কোথাও সিঁড়ির পাশাপাশি র‌্যাম্পের ব্যবস্থা করে, ফুটপাতগুলো উন্নত করে বিশেষভাবে সক্ষমদের সাহায্য করে তাঁর সংস্থা। সেই কারণেই ২০২৫ সালে তাঁকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।     

গাড়ির রেসে ডায়ানা পুণ্ডোলে

মোটর স্পোর্টস বা কার রেসিংয়ে মহিলাদের প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। এই একটি জায়গায় এতদিন পুরুষদের একচ্ছত্র অধিকার ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তা ভুল প্রমাণ করে এ বছর ডায়ানা পুণ্ডোলে ফেরারি ক্লাবে যোগদান করেছেন এবং ফেরারি আন্তর্জাতিক কার রেসিং প্রতিযোগিতায় একমাত্র ভারতীয় মহিলা হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ৩২ বছরের ডায়ানার বাড়ি পুনে। বরাবরই গাড়ির প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা ছিল তাঁর। স্বপ্ন ছিল গাড়ির রেসে যোগ দেওয়ার। এবছর সেই রেসে যোগ দিতে পেরে তিনি আনন্দিত। আগামী বছরের এপ্রিলে ফাইনাল রেসিং প্রতিযোগিতার আয়োজন হবে। সেখানে পুরস্কৃত হয়ে নজির গড়তে চান ডায়ানা।

দৃষ্টিহীন পর্বতারোহী ছোনজিম অ্যাংমো

তিনি চোখে দেখতে পান না। তবে মনের জোর তাঁর খুবই বেশি। আর ছিল পাহাড়ের প্রতি অদম্য আকর্ষণ ও ভালোবাসা। সেই আকর্ষণ থেকেই পাহাড় চড়ার নেশায় পেয়ে বসে তাঁকে। ক্রমশ উচ্চতার শিখর চড়তে চড়তে সম্প্রতি এভারেস্টের চূড়ায় উঠে পড়েন তিনি। গড়েছেন ইতিহাস। মাত্র আট বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন ছোনজিম। কিন্তু এই অক্ষমতা যাতে তাঁকে পেয়ে না বসে সেই কারণেই নিজেকে সচল রেখেছেন সব সময়। 
সিয়াচেন গ্লেসিয়ার চড়ার পর মনের জোর রীতিমতো বেড়ে যায় তাঁর। এরপর থেকেই মাউন্ট এভারেস্ট চড়ার ব্রত নেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর অবশেষে এই বছর মে মাসে সর্বোচ্চ শিখরটি চড়ে ফেলেছেন অ্যাংমো। তিনিই প্রথম দৃষ্টিহীন মহিলা যিনি এই অভিযান সফলভাবে সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছেন। নিজের স্বপ্নপূরণ তো বটেই। ছোনজিমকে দেখে জীবনের প্রতি আগ্রহ ফিরে পাচ্ছেন আরও অনেকে। 

১০

দাবায় বিশ্বজয়ী দিব্যা দেশমুখ

প্রথম মহিলা হিসেবে এফআইডিই উইমেনস’ চেস ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ের মাধ্যমে দাবা খেলার জগতে ইতিহাস তৈরি করেছেন দিব্যা দেশমুখ। মাত্র ১৯ বছর বয়সে এই খেতাব অর্জন করেছেন দিব্যা। ধৈর্য, বুদ্ধিমত্তা ও তীব্র মনঃসংযোগের মাধ্যমে তিনি ধাপে ধাপে দাবা খেলার পর্যায় ও পর্বগুলো অতিক্রম করে জয়ী হয়েছেন। টাইব্রেকার পর্যন্ত ম্যাচ গড়ালেও মনোযোগে সামান্যতম বিচ্যুতি হয়নি দিব্যার। গভীর একাগ্রতার সঙ্গে প্রতিটি চাল তিনি মেপে মেপে দিয়েছেন। নিজের অ্যাডভান্টেজই শুধু নয়, কী করলে বিরোধী অসুবিধায় পড়বে সেই কথাও তিনি মাথায় রেখে এগিয়েছেন। এবং এই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলার ফলেই তাঁর জয় হয়েছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ দাবাড়ুরা।   

কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ