জঙ্গলে রঙের খেলা দেখেছেন কখনও? মুগ্ধ হয়ে চেয়েছে থেকেছেন কাঁচা সবুজ আর ফিকে হলুদের দিকে? ঋতু পরিবর্তনে বদলে যায় জঙ্গলের রূপ। মধ্যপ্রদেশের কানহার জঙ্গল যেন এক ভিন্ন বার্তা নিয়ে হাজির হয় পর্যটকদের কাছে।
জঙ্গলে রঙের খেলা দেখেছেন কখনও? মুগ্ধ হয়ে চেয়েছে থেকেছেন কাঁচা সবুজ আর ফিকে হলুদের দিকে? ঋতু পরিবর্তনে বদলে যায় জঙ্গলের রূপ। মধ্যপ্রদেশের কানহার জঙ্গল যেন এক ভিন্ন বার্তা নিয়ে হাজির হয় পর্যটকদের কাছে।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে সরাসরি কানহার জঙ্গলে পৌঁছতে পারবেন না। আপনাকে যেতে হবে জব্বলপুর হয়ে। বিমান বা রেলযোগে জব্বলপুর পৌঁছনোর পর গাড়ি ভাড়া করে কানহা যেতে পারেন। অথবা যে হোটেলে থাকবেন তাদের বলে পিক আপ-এর ব্যবস্থা করতে পারেন। কানহার ভিতরে যেহেতু জঙ্গলের জিপেই ঘুরতে হবে তাই হোটেল পিক-আপ নেওয়াই ভালো।
মুক্কি জোনের মধ্যে দিয়ে যখন আমাদের সাফারির গাড়িটা কানহা ন্যাশানাল পার্কে প্রবেশ করল তখন সকালের মিষ্টি আলো সমস্ত অরণ্যে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আজ আমাদের ভাগ্যে পড়েছে কিসলি জোন। মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত জাতীয় উদ্যান কানহার চারটি জোন, মুক্কি, কানহা, কিসলি আর সারহি। এই মুক্কি জোনে ইদানীং খুব টাইগার সাইটিং হয় বলে তার চাহিদা আকাশছোঁয়া। আমাদের কপালে মুক্কি দেখা ছিল না। তবে তারই পাশ দিয়ে তিনটে কোর সাফারি করেছিলাম। দুটো কানহাতে আর একটা কিসলি জোনে। যদিও গাইড মাধব বলছিল বাঘ যে শুধুমাত্র মুক্কি জোনেই দেখা যায় এমন কোনও কথা নেই। বাঘ দীর্ঘ একটা অঞ্চল নিয়ে তার রাজত্ব বিস্তার করে। একটা জোনে একটা পুরুষ বাঘের সঙ্গে দু’-তিনটে বাঘিনীও থাকতে পারে। ফলে যে কোনও অঞ্চলেই বাঘের দেখা পাওয়া সম্ভব।
সার দেওয়া গাড়ির মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়িও এগিয়ে চলেছে। পথের ধারে মাঝে মাঝেই পোজ দিচ্ছে কোনও ময়ূর কিংবা চিতল হরিণের দল। বাতাসে একটা বুনো অরণ্যের গন্ধ। দু’পাশের সবুজ ঘন শালবনটা পেরিয়ে যেতেই ডানপাশে বিশাল একটা জলাধার আর তার চারপাশে অসংখ্য চিতল হরিণের দল। তাদের মধ্যে সম্বরও ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাদের গাড়ির সামনে একটা চিতল হরিণ তার শাবককে নিয়ে অত্যন্ত গভীর দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে আছে। হঠাৎ আমাদের গাইড মাধব বলল, ‘ও দেখো ভাইয়া জুয়েল অব কানহা, দূরবিনে চোখ লাগিয়ে দেখলাম জলাশয়ের পাশে কাদাজমিতে ঘাস এবং শৈবাল খেতে ব্যস্ত দুটো বারশিঙ্গা। এই বারশিঙ্গা মধ্যপ্রদেশের রাজ্য পশু। কেউ বলে ‘জুয়েল অব কানহা’ আবার কারও কাছে ‘প্রাইড অব কানহা’। মধ্যপ্রদেশের কানহা বাদে ভারতের আর কোনও জঙ্গলে সেভাবে এর দেখা মেলে না। এখন এদের সংখ্যা ১২০০-র কাছাকাছি কিন্তু একসময় এদের সংখ্যা কমতে কমতে ৬৬-টিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারপর বিলুপ্তির শেষ প্রান্ত থেকে আবার কীভাবে কানহা অরণ্যে ফিরে এল বারশিঙ্গার দল, তার এক অসাধারণ ইতিহাস আছে।
সেই গল্পই শুনছিলাম, হঠাৎ দেখি মাধব একদম চুপ করে গেল। ড্রাইভারও গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে। বাতাসের বুক চিরে রক্ত জল করা আওয়াজ কানে এল। জঙ্গলের ভাষায় এর নাম অ্যালার্ম কল। মাধবের মুখ-চোখের ভাষা বদলে গিয়েছে। চাপা গলায় বলল, ‘বয়েঠ যাইয়ে।’ গাড়ির ড্রাইভারকেও ইঙ্গিতে কী যেন বলল। তবে কি রাজামশাই-এর আগমন ঘটবে? ঠিক এই বাঘ দেখতে পাওয়ার মুহূর্তটা যেন সারা শরীর জুড়ে একটা অ্যাড্রিনালিন ঝড় তোলে।
গাড়িটা একটু পিছিয়ে ঘন শালবনের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল ড্রাইভার। অখণ্ড নিস্তব্ধতা, অনন্তকালের অপেক্ষা, বহু প্রাচীন মহীরুহ হিমালয়ের মহান ঋষিদের মতো আমাদের ঘিরে যেন তপস্যারত। মাঝে মাঝে কানে আসছে বাঁদরের অ্যালার্ম কল। হঠাৎ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দূরের একটা শাল গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ডোরাকাটা এক পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। ভারতের বহু অরণ্যে আমি বাঘ দেখেছি। আফ্রিকার মাসাইমারাতে সিংহ দেখেছি। তবে ভারতের অরণ্যে বাঘের চলার ভঙ্গিটা মারাত্মক রাজকীয়। সকলে বিমুগ্ধ নয়নে দেখলাম বাঘিনীটা ধীরে ধীরে আমাদের সামনে দিয়ে পাশে আরও ঘন শালবন, জলাধারের দিকে চলে গেল।
আমাদের মনে দারুণ আনন্দ। আসলে আমরা অরণ্যে আসি শুধুমাত্র বন্যপ্রাণ দেখার জন্য নয়, অরণ্যের প্রতি পরতে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য অনুভব করার জন্যও। আমাদের গাড়ি এগতে লাগল কিসলি জোনের দিকে। গাইড বলল জঙ্গলে অন্যান্য প্রাণী পর্যাপ্ত দেখা গেলেও বাঘ, লেপার্ড দেখা ভাগ্যের ব্যাপার।
ধীরে ধীরে আমরা যত এগতে লাগলাম রোদের তেজ ততই বাড়তে লাগল। হঠাৎ দেখলাম সামনে একটু এগিয়ে অনেকগুলো সাফারির গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সামনে গিয়ে দেখি মরা গাছের কোটরে একটা প্যাঁচা ঘুমাচ্ছে। গাইড বলল এই প্যাঁচার নাম ব্রাউন ফিশ আউল। প্যারাডাইস ফ্লাইংচার, ইন্ডিয়ান রোলার, ক্রেস্টেড সার্পেন্ট ঈগল, ইন্ডিয়ান পিট্টা এই সমস্ত পাখিরও দেখা পেলাম।
মুক্কি জোনে যেমন সবুজের আধিক্য, কিসলিতে সবুজ আর পাহাড়ের পাথুরে পরিবেশ মিলেমিশে গিয়েছে। কখন যে সবুজ সমতল ছেড়ে একটু পাথুরে আঁকাবাঁকা জংলি পথ পেরিয়ে গিয়েছি খেয়াল নেই। সামনের জংলি পাথুরে বাঁকটা নিতেই দেখি পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বাইসন। মাথার শিংটা চকচক করছে আর বাইসনের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, পায়ের মোজা। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে রইলাম ধীরে ধীরে পাশের জঙ্গলে সে চলে গেল।
আবারও পাথরের রাস্তা ছেড়ে সমতল সবুজ ঘন অরণ্যের বুক চিরে চলেছি আমরা। হঠাৎ দেখি পাশের পাতার অরণ্য থেকে উঁকি মারল সোনালি রঙের চতুষ্পদ একটি প্রাণী। গাড়ি থেকে ১০০ মিটার দূরে। একটু পরেই রাস্তায় উঠে এল দুটো গোল্ডেন জ্যাকেল। অরণ্যের রাস্তায় তারা ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে এল। একটু এগিয়েই দেখি সামনে বেশ কয়েকটা গাড়ি। তবে কি আবার রাজামশায়ের আগমন ঘটল? গাইড মাধবও বলল সে শুনতে পেয়েছে অ্যালার্ম কল। সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, এক চরম নিস্তব্ধতা। কিন্তু রাজামশাই আর এলেন না। প্রচুর সবুজ স্মৃতি, অরণ্যের প্রাণীদের স্পন্দন শুনতে শুনতে কানহার জঙ্গলের বাইরে বেরলাম অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে।
হোমাগ্নি ঘোষ