Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

অনলাইন পার্সেল স্ক্যাম, কীভাবে প্রতারণা এড়াবেন?

ডিজিটাল অ্যারেস্ট-এর ভাঁওতায় পড়ে ভয় পেয়েছেন? টাকা গচ্চা গিয়েছে জালিয়াতদের কবলে? কোন পথে সুরক্ষিত থাকবেন? পরামর্শ দিলেন আইনজীবী প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়।

অনলাইন পার্সেল স্ক্যাম, কীভাবে প্রতারণা এড়াবেন?
  • ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ডিজিটাল অ্যারেস্ট-এর ভাঁওতায় পড়ে ভয় পেয়েছেন? টাকা গচ্চা গিয়েছে জালিয়াতদের কবলে? কোন পথে সুরক্ষিত থাকবেন? পরামর্শ দিলেন আইনজীবী প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়।

Advertisement

ঘটনা ১
বাড়িতে প্রিয় রেসিপি রান্না করছিলেন বালিগঞ্জের সুদক্ষিণা সেন। সম্প্রতি তাঁরা ভিয়েতনাম বেড়িয়ে ফিরেছেন। অনেকদিন ভিনদেশের রান্না খেতে খেতে দেশীয় রান্নার জন্য মন ছটফট করছে। এমন সময়ে বেজে উঠল ফোন। দিল্লিতে ইমিগ্রেশন অফিস থেকে ফোন করেছেন এক অফিসার। সুদক্ষিণার নামে আসা একটি পার্সেল এসে পৌঁছেছে দিল্লি বিমানবন্দরে, সেখানে রয়েছে কেজি কেজি মাদক! এখনই দিল্লি অফিসে এসে দেখা করতে হবে তাঁদের। হাতে ২৪ ঘণ্টা সময়। নয়তো লোকাল পুলিশ স্টেশনে জানিয়ে তাদেরই সাহায্যে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করে দিল্লি নিয়ে আসা হবে। 

ঘটনা ২
কানে ইয়ারফোন গুঁজে সিনেমা দেখছিল সৌম্য। সারা সপ্তাহের অফিস-বাড়ি সেরে শনি-রবির ছুটিটা একটু আরাম করেই কাটতে চায়। ছুটির দিনে বাড়ির বাজার সেরে সবে নিজের ঘরে এসে মোবাইলে একটা সিনেমা চালিয়েছে, তখনই কলিং বেল। নাম করা ডেলিভারি সংস্থার কর্মী এসে হাজির। সৌম্যর বাবার নামে একটা পার্সেল আছে। বাবা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে এটা-সেটা অর্ডার করেন, সৌম্যরা জানে। কিন্তু এবার বাবা মনেই করতে পারছেন না এমন কিছু অর্ডার করেছেন কি না। বাবার মোবাইল অ্যাপেও অর্ডারের কোনও রেকর্ড নেই। বয়স্ক মানুষ মনেও করতে পারছেন না, তাঁর কোনও পরিচিতকে কিছু অর্ডার করে দিতে বলেছেন কি না। এদিকে যিনি এসেছেন, তিনি প্রবলভাবে বিরক্ত। তাঁর তাড়া আছে। আরও অনেক ডেলিভারি। এখনই যেন তাঁকে টাকা দিয়ে জিনিসটি নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রায় ১০ হাজার টাকার বিল ধরিয়েছেন তিনি। বেচারা বৃদ্ধ মানুষটি অস্থির হয়ে পড়ছেন। 
উপরের ঘটনাগুলো গল্পের মতো শোনালেও ডাহা সত্যি। অনলাইন পার্সেল স্ক্যামের ফলে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর পাল্লায় পড়ে বহু মানুষ প্রচুর টাকা খুইয়েছেন। হয়তো আপনার চারপাশেও এমন ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। কেউ হয়তো খবরে পড়েছেন। অনলাইন মাধ্যম যত জনপ্রিয় হচ্ছে, ততই বাড়ছে অনলাইনে জালিয়াতি। প্রতারকরা নতুন নতুন পদ্ধতি নিচ্ছে। তারই একটি ক্যুরিয়ার স্ক্যাম বা পার্সেল স্ক্যাম। নামী কোম্পানির পোশাকে, চোস্ত ইংরেজি বলে এমনকী পুলিশের পোশাকে উপস্থিত হয়েও প্রতারণা ঘটছে। কে ‘আসল’ কে ‘মেকি’ বুঝতে বুঝতে টাকা গায়েব হয়ে যাচ্ছে। সারা দেশ জুড়েই চলছে স্ক্যাম।

অনলাইন পার্সেল স্ক্যাম কী

উপরের ঘটনা দু’টি পড়লেই এই স্ক্যাম নিয়ে ধারণা কিছুটা তৈরি হয়ে যাবে। এতে মূলত প্রতারকরা একজন ‘শিকার’ বেছে নেয় তাদের কাছে থাকা ডেটাবেস অনুসারে। মূলত সাম্প্রতিককালে রাজ্য বা দেশের বাইরে বেড়াতে গিয়েছিল এমন কাউকে, বিশেষ করে বিমানবন্দর বা রেল স্টেশনে যাতায়াত করতে হয়েছে এমন মানুষকেই ‘টার্গেট’ করা হয়। তাঁদের বলা হয় তাঁদের নামে মাদক কিংবা অন্য কোনও অবৈধ জিনিসের পার্সেল বাজেয়াপ্ত করেছে দেশের কোনও এক স্থানের পুলিশ, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবাহিনী কিংবা নারকোটিক্স দপ্তরের আধিকারিকরা। অভিযোগ শুনে শিকার ঘাবড় গেলেই শুরু হয় ‘মাইন্ড গেম’। নানা নম্বর থেকে ওই সংক্রান্ত পরপর ফোন ঢুকতে থাকে মোবাইলে। সবাই উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন ও শিকারকে একদিকে যেমন ডিজিটাল গ্রেপ্তারি বা সাধারণ গ্রেপ্তারির ভয় দেখান, তেমনই বাঁচার রাস্তা বাতলাতে থাকেন। এমনকী দেওয়া হয় কোনও থানার নম্বর। গুগল করলে হয়তো দেখা যায় সেই নম্বরটিও ঠিক! সরাসরি সেই নম্বরে কথা বলতেও বলেন কিছু দুঃসাহসী প্রতারক। তাঁরা জানেন, ওই সময় মাথা ঠান্ডা রেখে ওই নম্বরে যোগাযোগ করার চেয়ে পড়িমড়ি করে বাঁচতে অসহায় শিকার তাঁদেরই সাহায্য চাইবেন। শিকার প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে তিনি সত্যিই ফেঁসে গিয়েছেন। এইবার শুরু হয় আসল খেলা। প্রতারকরা তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে হয়তো তাঁরই সিম ব্যবহার করে অন্য কেউ কাজটি করেছে। তাহলে নিজেকে বাঁচাতে গেলে কিছু তথ্য দিতে হবে। তাহলে তাঁরা সব খতিয়ে দেখে তাঁকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন। তবে তার জন্য প্রয়োজন আধার নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের যাবতীয় তথ্য। এত সুচারুভাবে তা করা হয় যে আপনি বুঝতেই পারবেন না, কোন কথার ছলে কী কী তথ্য সেখানে দিয়ে ফেলছেন। সরকারি কাজের নিয়মনীতি দেখিয়ে ও চাপে রেখে একের পর তথ্য হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। আর তার পরেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে গায়েব হয়ে যায় টাকা।
আর একভাবে অনলাইন পার্সেল প্রতারণা হয়। প্রতারকরা ডেলিভারি এজেন্ট সেজে বাড়িতে এসে জোর করে গছিয়ে দিতে চান পার্সেল। এক্ষেত্রেও লোকজন বুঝে উঠতে পারেন না এমন কোন পার্সেল তিনি অর্ডার করলেন। এমনকী অন্য কেউ তাঁর নামে অর্ডার করেছেন। টাকা দিয়ে পার্সেল ছাড়াতে হবে এমন দাবিও করেন প্রতারকরা। সেক্ষেত্রে ওই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বৃহৎ চেনাজানার মধ্যে কে কী পাঠালেন খোঁজ নেওয়া বাস্তবে অসম্ভব। তাই এই পথ নিয়ে জোর করে পার্সেল নিতে বাধ্য করা হয়। 

প্রতারণা হলে কী করবেন?

দু’টি মূল বিষয় মনে রাখুন। প্রথমত, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বলে আদৌ কিছু হয় না। এই বার্তা খুব স্পষ্ট করে পৌঁছে যাওয়া দরকার। অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত না হলে কোথাও এমন হওয়ার কথা নয়। কাজেই এসব কথায় ভয় পাবেন না। দ্বিতীয়ত, যে পার্সেল নিজে অর্ডার করেননি তা অন্য কেউ আপনার নামে অর্ডার করলেও টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে আপনি বাধ্য নন। তার পরেও ভুলবশত প্রতারণার খপ্পরে পড়লে কী করবেন? জেনে নিন।

প্রথমেই ব্যাংককে জানান: প্রতারকদের সঙ্গে যদি কোনও ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য লেনদেন করে ফেলেন বা অনলাইনে কাউকে টাকা দিয়ে ফেলেন, তাহলে অবিলম্বে ব্যাংককে জানান।

স্থানীয় থানায় যান: ব্যাংককে জানিয়েই দ্রুত স্থানীয় থানায় যান। প্রতারণার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে অভিযোগ জমা করুন। প্রতিটি থানাতেই সাইবার ক্রাইম জালিয়াতি হলে তা নথিভুক্ত করার ফর্ম থাকে। আধিকারিকের সাহায্য নিয়ে সেই ফর্ম ফিল আপ করুন। 

সাইবার ক্রাইম পোর্টালে অভিযোগ: ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম পোর্টাল 
(www.cybercrime.gov.in)-এ গিয়ে স্ক্যাম নিয়ে অভিযোগ দায়ের করুন। এই কাজটি স্ক্যাম হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে করতে পারলে ভালো। এরপর পুলিশ নিজেই এই স্ক্যাম নিয়ে তদন্ত করবে। ব্যাঙ্কের তরফেও একটি তদন্ত হবে। তবে যদি দেখা যায়, পিন নম্বর ও তথ্য আপনিই দিয়ে ফেলেছেন, সেখানে ব্যাংক খুব একটা দায় নেয় না। যদি ব্যাংকের ভুলে টাকা অন্য কোথাও চলে যায়, তবেই ব্যাংক সেই টাকা ফেরত দিতে পারবে। পুলিশ অনেক সময় প্রতারকদের ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। টাকাও ফেরত এনে দিতে পারে। অনেক সময় নানা জটিলতায় তা পারা যায় না। তখন আপনি পুলিশের সহায়তায় উকিলের ব্যবস্থা করতে পারেন বা নিজেও উকিলের দ্বারস্থ হতে পারেন ও এই মামলা দায়ের করতে পারেন। 

প্রতারণা এড়াবেন কী করে?

 নিজের আধার নম্বর, প্যান কার্ডের নম্বর, স্ত্রী বা স্বামীর নাম ও জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে নাম থাকা ব্যক্তির তথ্য বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য ফোনে বা অপরিচিত সাইট ও লিঙ্কের মাধ্যমে ভাগ করে নেবেন না।
 কোনওভাবেই তাড়াহুড়ো করবেন না। এই সময় প্রতারকরা যাই বলুক, যত ভয়ই দেখাক, মাথা ঠান্ডা রাখুন। প্রয়োজনে বাড়ির যে সদস্য এগুলো ভালো বোঝেন, তাঁদের সাহায্য নিন।
 কোনও সংস্থার নাম করে, পুলিশ স্টেশন বা আইনি সংস্থার নাম করে এমন ফোন এলে সচেতন হোন। ফোন রেখেই স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে বিষয়টি জানিয়ে রাখুন। 
 কোনও কুরিয়ার সংস্থার নামে ফোন এলে তা ডিসকানেক্ট করে আগে সেই সংস্থার অফিসে (গুগল থেকে নম্বর জোগাড় করে) যোগাযোগ করুন। 
 অনলাইন স্ক্যামের শিকার হচ্ছেন বা তথ্য কিছু দিয়ে ফেলেছেন বুঝলে, সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফোনের নেট কানেকশন বন্ধ করে দিন। অনেক সময় ফোন ক্লোন করে নেয় প্রতারকরা। তাই আপনার কাছে যে ওটিপি আসছে, তা আপনি তাদের সঙ্গে ভাগ না করলেও তারা দেখতে পায়। নেট অফ করে দিলে জালিয়াতরা অনলাইনে ক্লোন করার কাজ চালিয়ে যেতে পারবে না।

মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ