Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

রহস্যময় ডাও হিল

দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়া আমার প্রতি বছরের একটা রুটিনের মধ্যেই পড়ে। কতবার যে দার্জিলিং গিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু প্রতিবারই কার্শিয়াংয়ের ডাও হিল এড়িয়ে গিয়েছি।

রহস্যময় ডাও হিল
  • ১২ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়া আমার প্রতি বছরের একটা রুটিনের মধ্যেই পড়ে। কতবার যে দার্জিলিং গিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু প্রতিবারই কার্শিয়াংয়ের ডাও হিল এড়িয়ে গিয়েছি। তাই এবার আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম, দার্জিলিং ঘুরতে গেলে একবার কার্শিয়াংয়ের ডাও হিল যাবই। ভারতের বিখ্যাত সেই ভৌতিক জায়গা দেখব। সেই মতো গাড়ির ড্রাইভারকে আগেই বলে রেখেছিলাম। যাইহোক, কার্শিয়াং ঢুকেই আমাদের গাড়ি বাঁদিকের একটা চড়াই রাস্তা ধরল। কিছু দূর যাওয়ার পরেই গাড়ির চালক পলাশ আমাকে জানালেন, ডাও হিল পৌঁছে গিয়েছি। দেখলাম, চারদিকে বড় বড় পাইন গাছের জঙ্গলে ঘেরা একটা জায়গা। নিস্তব্ধ চারদিক। প্রথম থেকেই কেমন যেন একটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ভাব। দিনের বেলাতেই কেমন যেন ভূতুড়ে পরিবেশ। বড় বড় পাইন গাছ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে জায়গাটাকে আরও ভৌতিক করে তুলেছে। একটা জনমানবহীন রাস্তা পাইন গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার জানাল, এই রাস্তাটার নাম ‘ডেথ রোড’। দেখলাম, পাশেই একটা ছাই রঙের বড় বাড়ি। শুনলাম, সেটাই ডাও হিল স্কুল। শোনামাত্রই শরীরের মধ্যে একটা শিহরন খেলে গেল। এটাই তাহলে সেই রহস্যময় ভৌতিক ডাও স্কুল। এগিয়ে গেলাম স্কুলবাড়ির বড় ফটকের দিকে। দেখলাম, ফটকের সামনে একজন দারোয়ান বসে রয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, স্কুলে এখন পরীক্ষা চলছে। তাই ভিতরে ঢোকা যাবে না। আগেই শুনেছিলাম, ডাও হিলের এই স্কুলেই নাকি ভূত দেখা যায়। দারোয়ানকে সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল, এই অঞ্চলে সন্ধ্যার পরে আর কেউ থাকে না। এই এলাকায় নাকি এখনও মাথাকাটা এক বালককে দেখা যায়। শুনে ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না কথাটা। ভাবলাম, পাহাড়ি এলাকার মানুষরা হয়তো ভুল দেখেন! যাই হোক, নিজের মনের বিশ্বাসকে চেপে রেখেই আড্ডা জমানোর চেষ্টা করলাম দারোয়ানের সঙ্গে। তাঁর নাম সোনম ছেত্রী। এই স্কুলে দারোয়ানের কাজ করছেন প্রায় বছর দশেক হল। বাড়ি কার্শিয়াং শহরের থেকে নীচে এক পাহাড়ি গ্রামে। তিনি প্রতিদিন সকালে স্কুলে কাজে আসেন আর বিকেল হওয়ার আগেই নিজের গ্রামে ফিরে যান। তাঁর মুখে শুনলাম স্কুলের ভৌতিক গল্প। বহু বছর আগে এক আবাসিক ছাত্রের স্কুলের ভিতরেই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। পরে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। আর তারপর থেকেই সন্ধ্যার পরে 
এই অঞ্চলের মানুষজন স্কুলের ভিতর থেকে অস্বাভাবিক নানারকম আওয়াজ পায়! আবার কখনও নাকি স্কুলের সামনের রাস্তায় এক মুণ্ডহীন বালকের শরীর দেখতে পায়! সেই শরীর নাকি হাঁটতে হাঁটতে পাইন গাছের জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এলাকার অনেক কাঠুরেও নাকি সেই মুণ্ডহীন বালকের শরীর দেখেছে। যদিও সোনমের ভাগ্যে সেই দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়নি। সোনম জানালেন, ‘আমি চাইও না সেই ভূত দেখতে। এমনিতেই মাঝে মাঝে স্কুল বিল্ডিং থেকে নানা রকম আওয়াজ আসে, সেসব আমি নিজেও শুনেছি। বিশেষ করে, ছুটির দিনে যখন স্কুল ফাঁকা থাকে, তখন সেই আওয়াজ পাওয়া যায়। আমি কখনও ভিতরে ঢুকে দেখতে যাইনি আওয়াজ আসছে কোথা থেকে। বরং সেই জায়গা থেকে আরও দূরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।’ আগে দারোয়ানের চাকরি যারা করেছে, তাদের কাছে সোনম শুনেছেন, আওয়াজের উৎস খুঁজতে গেলে বিপদের আশঙ্কাই বাড়ে। সেই আওয়াজ তাই কখনও অনুসরণ করতে নেই। সোনম সেইসব কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। তাই  খুব সতর্কভাবে এড়িয়েই চলেন এসব আওয়াজ।  
সোনমের কাছে ভূতুড়ে গল্প শুনে এলাকাটা ভালো করে ঘুরে দেখার ইচ্ছা হল। তাই গাড়ি ছেড়ে পায়ে হেঁটেই ঘুরে বেড়ালাম ডাও হিল এলাকাতে। দেখলাম একটা জরাজীর্ণ গির্জা। দেখেই এক অন্য ধরনের অনুভূতি হল শরীরে। দেখলাম পাইন গাছের ঘন জঙ্গল। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার চিৎকার চলছেই। আমাদের চালক পলাশ জানিয়েছিলেন, ভারতের অন্যতম ভূতুড়ে জায়গা এই ডাও হিল। ভূত সত্যি আছে কি না জানি না। তবে এলাকার জনমানবহীন পরিবেশ, পাইনের জঙ্গল, পোড়ো গির্জা, এলাকায় একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। স্কুল বাড়িটির ধরন পুরনো হলেও কিছুদিন আগে বিল্ডিংয়ে রং করায় সেই স্কুল বাড়ি এখন চাকচিক্য ফুটিয়ে রেখেছে, যা এলাকার পরিবেশের সঙ্গে কিছুটা হলেও বেমানান বলে মনে হল। যাই হোক, ডাও হিলে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম কার্শিয়াং শহরের উদ্দেশে। আমাদের যে দার্জিলিং পৌঁছতে হবে। গাড়িতে চেপে রওনা হওয়ার আগে একবার পিছনে ফিরে দেখলাম, স্কুল বাড়ির চুড়োর সূর্যের আলো হঠাৎ নিভে গিয়েছে আর মনে হল ঘন পাইনের জঙ্গলের ভিতরে ঝিঁঝিঁ পোকার চিৎকার যেন আরও বেড়ে গিয়েছে।    
কীভাবে যাবেন: শিলিগুড়ি থেকে বাস বা ভাড়ার গাড়িতে কার্শিয়াং এসে ডাও হিলে যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে সড়ক, ট্রেন ও আকাশপথে শিলিগুড়ি পৌঁছতে পারেন। কার্শিয়াং শহরে অনেক ছোট বড় নানা ধরনের হোটেল, হোম স্টে রয়েছে। এছাড়া দার্জিলিং থেকেও একদিনে ডাও হিল এসে ঘুরে যাওয়া যায়।

Advertisement

প্রীতম সরকার

সম্পর্কিত সংবাদ