সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে ঐন্দ্রিলা সেন।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে ঐন্দ্রিলা সেন।
মা আমার কাছে গোটা পৃথিবী। মায়ের কথা বলতে গেলে কোথা থেকে শুরু করব আর কোথায় শেষ করব সেই হিসেবে রাখা খুব মুশকিল। মা না থাকলে আজ আমার কোনও অস্তিত্বই থাকত না। জীবনে এখনও অবধি অনেক ওঠাপড়া দেখেছি। সেই কঠিন সময়গুলোতে মা কস্তুরী সেন যদি শিরদাঁড়া হয়ে না থাকত, তাহলে আমি হয়তো হারিয়ে যেতাম। অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা সেন হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা হতো না।
আমি খুব ছোট বয়সে ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলাম। তাই আমার বেড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে মায়ের অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার। আমাকে সময় মতো শ্যুটিংয়ে নিয়ে যাওয়া যেমন ছিল তেমনই আমার পড়াশোনার দিকটাও খেয়াল রাখতে হতো। স্কুল, টিউশন, শ্যুটিংয়ের সময় ব্যালেন্স করা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই প্রত্যেকটা জিনিস অত্যন্ত দক্ষ হাতে সামলেছে মা। আর এই বিষয়ে মাকে পুরো সাহায্য করেছিল আমার বাবা। আমার জন্য মা নিজের কেরিয়ার স্যাক্রিফাইস করেছে। মা আইনের ছাত্রী। আজ খুব ভালো পসার হতে পারত। একজন নামকরা আইনজীবী হিসেবে মা নিজেকে মেলে ধরতে পারত। কিন্তু নিজের সেই স্বপ্নকে মা দমিয়ে রেখেছিল। আমি যখন অভিনয়ে আসি, তখন মাকে হয় তাঁর পেশা না হলে আমার কেরিয়ার— কোনও একটা বেছে নিতে হতো। মা তখন নিজের পেশাকে সরিয়ে রেখে আমাকে সময় দিয়েছিল। তাই মায়ের আইনজীবী হওয়া হল না। এত বড় ত্যাগ স্বীকার হয়তো মায়েরাই করতে পারেন।
ছোট থেকে মা সবসময় শিখিয়েছে অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করতে। আমি খুব স্পষ্টবাদী। এই স্বভাবগুলো মায়ের থেকেই পাওয়া। শুধু মা-বাবা নয়, আমার পুরো পরিবার আমাকে খুবই আদর যত্নে বড় করেছে। আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে মা-বাবা। আমি কিন্তু সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার কোনওদিন করিনি।
অঙ্কুশের (হাজরা) সঙ্গে সম্পর্কের শুরুতেও মায়ের কাছে কিছু লুকিয়ে রাখতে হয়নি। আমি আর অঙ্কুশ সিনেমা দেখতে গেলেও মাকে সত্যিটা বলেই যেতাম। তবে সেখানে একটা ছোট্ট মিথ্যে বলতাম যে, আমার আর অঙ্কুশের সঙ্গে বিক্রমও (চট্টোপাধ্যায়) যাচ্ছে। মায়ের কাছে নির্দ্বিধায় সবটা শেয়ার করতে পারতাম। অঙ্কুশের সঙ্গেও আমার মায়ের ভীষণ সুন্দর সম্পর্ক। কিছু কিছু সময় আমার মা অঙ্কুশকে একটু বেশি প্রায়োরিটি দেয়। তখন আমার একটু খারাপ লাগে। হয়তো মাকে বললাম কিছু খাবার বানিয়ে দিতে, মা আমাকে শর্টকার্টে কিছু বানিয়ে দিল। কিন্তু অঙ্কুশ কিছু বললে মা যত ক্লান্তই থাকুক, ওর মনপসন্দ খাবার বানিয়ে দেবে। আমার মা যে কোনও রকম পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দিতে পারে। বাবাকে হারানোর পর আমি নতুন করে মাকে আবিষ্কার করেছিলাম। বুঝেছিলাম এক ইস্পাত কঠিন মানসিকতার মানুষ মা। আমার বাবা মারা যাওয়ার সময় পোস্টমর্টেম রুমে সবরকম ঝক্কি একা হাতে সামলে নিয়েছিল মা। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি প্রতিদিন লড়াই করা শিখি। আমার জন্য মায়ের যে ত্যাগস্বীকার তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। মায়ের জীবনটা আরও সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে চাই। আমার জন্য মা যতটা ত্যাগ করেছে তার কিছুটা আমিও তাঁকে ফিরিয়ে দিতে চাই। তাই আমিও প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছি।
মায়ের কথা ভাবতে বসলে মনে পড়ে, মায়ের একটা স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল। মা চেয়েছিল মা-বাবা দু’জনে মিলে আমার কেরিয়ারের পুরো জার্নিটা দেখবে। বাবা আমার ভালো সময়টা দেখে যেতে পারল না। এটা আমার মায়ের আপশোস। এই আপশোস আজীবন বয়ে বেড়াব আমিও।