সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে অমর মিত্র।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে অমর মিত্র।
এখনও ঘুমের ভিতরে দুঃস্বপ্ন এলে মাকে ডাকি। মা চলে গিয়েছেন একুশ বছর আগে। অন্ধকারে জেগে উঠে সেই ভয়ার্ত আমি, টের পাই মায়ের কোমল হাতখানি আমার গায়ে। জ্বর এলে ঘুমে জাগরণে মাকে ডাকি। মা বলে, আমি আছি, ভয় কী! আর যখন সাংসারিক কিংবা জীবনের অন্য ক্ষেত্রে খুব বিপন্ন হই, মনে মনে বলি, মা তুমি দেখো। বিশ্বাস করি মা দেখেন। মা আছেন মাথায় ছায়া হয়ে, তাই সব বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে আসি। উদ্বেগ নিরসন হয়। কিন্তু শুধুই কি উদ্বেগ আর বিপন্নতা, গভীর আনন্দের ভিতরেও মা থাকেন। সেই দূর কাজাখস্তান দেশের নূর সুলতান শহরে গিয়ে মঞ্চে যখন নিজের কথা বলছি, নিজের সামান্য লেখালেখির কথা, মনে হচ্ছিল, মা বসে আছেন দর্শকের আসনে। মা বলছেন, ভয় কী রে তোর, এতদূর এলি, এখন সাহস করে বল, যা ভেবেছিস বল।
পঞ্চাশ বছর আগে যখন লেখা শুরু করি, তখন আর সকলে যখন বলত আমার ভবিষ্যৎ গেল, শুধু মা বলতেন, যা মন্দ, তাতে থাকিস না। লিখতে মন চাইলে লিখবি। এর চেয়ে ভালো কিছু হয় না। আমি পারি না, অত ভাষা আসে না, আমার হয়ে তুই লিখবি।
আমার মা রাধারানি ডায়েরি লিখতেন, গোপনে। একদিন সেই ডায়েরি আবিষ্কার করি আমি। অদ্ভুত সেই ডায়েরি লিখন। অকালে মায়ের মা বাবা, দু’জনেই চলে গিয়েছিলেন। তখন মায়ের বিয়ে হয়েছে সবে। আরও চার বোন, দুই ছোট ভাই ছিল। এক বড় দাদাও ছিল। সে গত শতকের চারের দশকের কথা। তারপর দেশভাগ হল। কত কষ্ট করে ভাইরা দাঁড়াল। সেই সময়, মানে যখন আমি ডায়েরিটি আবিষ্কার করি, তা ছয়ের দশকের শেষ কিংবা সাতের দশকের আরম্ভ হবে। মায়ের পরের বোন মনু তখন দুরারোগ্য রোগভোগের পর মারা গিয়েছে। ডায়েরিতে ছিল একটি চিঠি। সেই চিঠিতে, মা তাঁর মাকে লিখছেন, ‘শ্রীচরণেষু মা, আমি ভালো আছি, আমার আর সব ভালো আছে, কিন্তু মনু খুব কষ্ট পাইয়া চলিয়া গেল। তোমার সঙ্গে তার দেখা হইয়াছে ঠিক। মা, তুমি মনুকে কোল দিও, মনু তোমার কোলে গিয়া ভালো থাকিবে ঠিক...।’
মা আমার জন্য উদ্বিগ্ন থাকতেন খুব। কলকাতার বাইরে দূর মফস্সলে চাকরি করি, মা রোজ অনেক রাত্রি অবধি ভাবতেন ছেলেটা ভালো আছে তো? তখন যোগাযোগ বলতে পোস্ট কার্ড। চিঠি দিলে দশদিন। স্পিড পোস্ট ছিল না। কলকাতা ফিরলে মায়ের হাসিমুখ, এই তো এলি। আমি ছোট ছেলে, আমিই বাইরে থাকি, মেসে খাই। কী খাই, কখন খাই, তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন মা। দেশভাগে মা তাঁর বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি, দুই বাড়িই ছেড়ে এসেছিলেন। সেই যে তাঁর বাপের বাড়ি, খুলনা জেলার বাঁকা ভবানীপুর গ্রাম, সেই গ্রাম ছিল কপোতাক্ষ নদের ধারে। বাড়িতে শুয়ে ইস্টিমারের ভোঁ শুনতে পাওয়া যেত। ভোরবেলায় মা তাঁর মা বাবা, তাঁদের দেশের বাড়ি, কপোতাক্ষ নদের কথা বলতেন। হাহাকার করতেন নিজের ফেলে আসা গ্রামের জন্য। আমি শুনেছি, আমাদের সকলের উপরে, কিংবা আমার বড়দার ঠিক পরে একজন ছিল। তার নাম ছিল সায়েব। সে খুব সুন্দর ছিল। সেই সায়েব এক বছরও বাঁচেনি। এক সকালে দেখা যায় তার শ্বাস পড়ছে না। সেই আমলের রীতি অনুসারে তাকে কলার মান্দাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। আশি-পঁচাশি বছর আগের কথা বলছি। তারপর দেশভাগ। নিজেদের গ্রাম ছেড়ে সকলে এপারে চলে এল। মা বিশ্বাস করতেন না, সায়েব মারা গিয়েছে। সায়েব কলার মান্দাসেই জেগে উঠেছিল। গাঙের ধারের কেউ তাকে দেখতে পেয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে সন্তানের মতো প্রতিপালন করেছিল হয়তো। অন্য কারও ঘরে বড় হচ্ছে সায়েব। দেশভাগ হয়ে গেলে সায়েবকে রেখেই চলে আসতে হল। আর সায়েবকে তিনি পাবেন না। আমি ছোটবেলায় সায়েব আর ডিলডিল নামে এক দিদির জন্য মায়ের কান্না শুনেছি। ডিলডিল এপারে এসে মারা যায় অসুখে। সব মনে পড়ে যাচ্ছে। শ্রীচরণেষু মা, ‘তোমার বড় খোকা আর বাবলুর সঙ্গে দেখা হইয়াছে। গত বছর কয়েক মাসের তফাতে দুইজনই তোমার কাছে চলিয়া গিয়াছে।’