কীভাবে যাবেন
কলকাতা নেতাজি সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানযোগে লন্ডন পৌঁছতে হবে। সাধারণত দিল্লি, মুম্বই, দোহা, আবু ধাবি বা দুবাই দিয়ে লন্ডন পৌঁছতে পারেন। কানেক্টিং ফ্লাইট এবং মূল ফ্লাইট মিলিয়ে মোটামুটি পনেরো থেকে কুড়ি ঘণ্টা সময় লাগে লন্ডন পৌঁছতে। তবে কিছু বিমান এর চেয়ে তাড়াতাড়িও পৌঁছে দিতে পারে। সাধারণত বিমানের ভাড়ার উপর যাত্রার সময় নির্ভর করে। যত বেশি ভাড়া তত কম সময়ে পৌঁছবেন। সব নামি কোম্পানিরই লন্ডন পৌঁছনোর জন্য বিমান পরিষেবা রয়েছে।
লন্ডন। ইউনাইটেড কিংডমের রাজধানী এই শহরের নামটা শুনলেই মনে হয় যেন এক ছুটে সেখানে পৌঁছে যাই। এমনই দুর্নিবার আকর্ষণ এই শহরের। টেমস নদীর গায়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন এই শহরের আনাচে-কানাচে ফিসফিস করে ইতিহাস আজও কথা বলে। শহরটা বেশ মায়াময়। রোমানদের হাতে তৈরি এই আভিজাত্যপূর্ণ শহর পরবর্তীকালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অধীনে আসে। বছরভর এখানে পর্যটকদের যাতায়াত লেগেই থাকে। নিউ ইয়ারে এই শহর সেজে ওঠে এক নতুন রূপে। রাজপথ জুড়ে ঝলমলে রঙিন আলোকসজ্জা শহরটাকে আরও মায়াবী করে তোলে। কনকনে শীতের চাদর জড়িয়ে থাকে এইসময় লন্ডনের প্রকৃতি। উৎসবের আমেজে পর্যটকদের নিয়ে মেতে ওঠে এই বিলেত ভূমি।
কলকাতা থেকে বিমানে দোহা বা দুবাই হয়ে বিমান বদলে লন্ডন যাওয়া যায়। দিল্লি, মুম্বই থেকে পাবেন লন্ডনগামী সরাসরি বিমান। লন্ডনে দেখার জায়গা অনেক। পায়ে হেঁটে, কন্ডাকটেড ট্যুরের বাসে, ছাদখোলা দোতলা বাসে চেপে নিজের ইচ্ছামতো শহরের নানাপ্রান্তে ঘুরে বেড়ান। প্রথমেই চলুন টেমস নদীর তীরে। এই নদীর দু’পাড় সযত্নে সাজানো। অনেকগুলো সেতু রয়েছে নদীর উপর যার মধ্যে সবথেকে দৃষ্টিনন্দন টাওয়ার ব্রিজ। নদীর ধারেই রয়েছে আকাশছোঁয়া নাগরদোলা লন্ডন আই। এতে চেপে পাখির চোখে দেখুন শহরটাকে। কাছেই ওয়েস্ট মিনস্টার প্রাসাদে হাউজ অব পার্লামেন্ট। শহরের ল্যান্ডমার্ক বিগ বেন টাওয়ার। সেটিও স্থাপত্যময়। কাছেই ওয়েস্ট মিনস্টার অ্যাবে চার্চ। সেখানে রাজপরিবারের নানা অনুষ্ঠান হয়। ভিতরের কারুকাজ দেখার মতো। সেন্ট জেমস পার্কের গায়েই বাকিংহাম প্রাসাদ। রাজপরিবারের বাসভূমি। প্রাসাদের সামনেই কুইন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। প্রাসাদের বাইরে নিয়মিত চেঞ্জ অব গার্ড প্যারেড হয়।
শহরের বৃহত্তম পার্ক সবুজে সাজানো হাইড পার্ক। এখানে রয়েছে সারপেনটাইন হ্রদ, প্রিন্সেস ডায়না ফাউন্টেন, কেনসিংটন প্রাসাদ, অ্যালবার্ট মেমোরিয়াল। ঘুরতে ঘুরতে চলে আসুন বিখ্যাত বেকার স্ট্রিটে। এখানেই রয়েছে শার্লক হোমস মিউজিয়াম। এখান থেকে খানিকটা এগলেই পৌঁছবেন মাদাম তুসো ওয়াক্স মিউজিয়ামে। লন্ডনে রয়েছে বিখ্যাত কয়েকটি সংগ্রহশালা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সায়েন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ন্যাশনাল গ্যালারি। দুর্দান্ত লাগে লন্ডনের পরিচ্ছন্ন পথঘাটে, অলিগলিতে, পুরানো পাড়ায় হেঁটে বেড়াতে। শহরে মাটির নীচে ছড়িয়ে থাকা টিউব রেল চেপে নানা প্রান্তে সহজেই যাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতকে নির্মিত দুনিয়ার প্রাচীনতম পাতালরেল এটি। এক ফাঁকে বিখ্যাত লর্ডস ক্রিকেট খেলার মাঠের স্টেডিয়াম ট্যুরটিও করে নিতে পারেন।
লন্ডনের প্রাণকেন্দ্র ট্রাফালগার স্কোয়ার। বিগ বেনের অনতিদূরেই এর অবস্থান। জমজমাট চত্বর। এখানেই পালিত হয় বর্ষবরণ উৎসব। ক্রিসমাস ট্রি, রঙিন আলোয় সেজে ওঠে এই স্কোয়ার। এখানে রয়েছে শিল্পমণ্ডিত ফোয়ারা, নেলসন স্তম্ভ। চারপাশে ঘিরে আছে একাধিক গথিক স্থাপত্য। যার মধ্যে নজর কাড়ে ন্যাশনাল গ্যালারি আর সেন্ট মার্টিন চার্চ। শহরের আর একটি জমজমাট চত্বর পিকাডিলি সার্কাস। এর মধ্যমণি সাফসকারি ফাউন্টেন। বড়দিন আর নববর্ষের রঙিন আলোয় সেজে ওঠে অক্সফোর্ড স্ট্রিট। পাথর বাঁধানো পথের দু’পাশে অজস্র দোকানপাট, শপিংমল। এই জায়গাটা শহরের জনপ্রিয় শপিং স্ট্রিট। দিনভর পর্যটক আর স্থানীয়দের ভিড় এই পথে। লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালটিও দেখার মতো। এটি শহরের বৃহত্তম চার্চ। সপ্তদশ শতকে নির্মিত।
টেমস নদীর ধারে রয়েছে দুর্ভেদ্য টাওয়ার অব লন্ডন দুর্গ। চারপাশে ঘিরে রয়েছে সুউচ্চ প্রাচীর আর গোলাকার বুরুজ। দুর্গের মধ্যে রয়েছে একাধিক মিউজিয়াম। যার মধ্যে সবথেকে আকর্ষণীয় ক্রাউন জুয়েলস মিউজিয়ামটি। রাজপরিবারের বহুমূল্য অলঙ্কার, মুকুটসহ নানা চোখ ধাঁধানো সামগ্রী সেখানে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে সাজানো। এখানেই রয়েছে ভুবন বিখ্যাত কোহিনুর হীরে। দুর্গের মধ্যে রয়েছে ছোট একটি চার্চ। একটি সাজানো বাগানও রয়েছে। টাওয়ার অব লন্ডন দুর্গ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। দুর্গের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে টেমস নদী। দুর্গ দেখে চলে আসুন সেই নদীর তীরে বাঁধানো চত্বরে। জায়গাটা পর্যটকদের ভিড়ে জমজমাট। সুন্দর বসার জায়গাও করা আছে। জলে ভেসে চলেছে নানা ধরনের জলযান। নদীতে রিভার ক্রুজও হয়। রাতে হয় ডিনার ক্রুজ। টাওয়ার অব লন্ডন দুর্গের কাছেই নদীর উপর গথিক স্থাপত্যের টাওয়ার ব্রিজ। সন্ধেবেলা আলোকমালায় সেজে ওঠে সেটি।
শহরের বাইরে প্রায় ২৫ মাইল দূরে উইন্ডসর জনপদ। এর কাছ দিয়েও বইছে টেমস নদী। চারপাশে ঘিরে আছে সবুজ প্রকৃতি। এখানেই রয়েছে রাজপরিবারের বিখ্যাত দুর্গ-প্রাসাদ উইন্ডসর ক্যাসল। কয়েক একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিশাল এই দুর্গ। দুর্গের একাংশে মিউজিয়াম আর আরেক অংশে রাজপরিবারের বসবাস। দুর্গে ঘুরে দেখুন একাধিক প্রাসাদ, রয়্যাল গার্ডেন, সেন্ট জর্জ চ্যাপেল। প্রাসাদ-দুর্গের স্থাপত্যশৈলী আর অন্দরসজ্জা দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। দুর্গটি ভালোভাবে দেখতে অনেকক্ষণ সময় লাগবে। পায়ে পায়ে ঘুরে দেখুন প্রাচীন জনপদটিও।
রাতের আলোয় সেজে ওঠা লন্ডন ঘুরে দেখাও এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। আলোকময় শহরের পাথর বাঁধানো পথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান স্বপ্নের জগতে।
অয়ন গঙ্গোপাধ্যায়