Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

জঙ্গল পাহাড় ঘেরা শৈবতীর্থ কপিলাস

কলকাতা থেকে ট্রেন বা বিমানে ভূবনেশ্বর পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঢেঙ্কানল যেতে পারেন। ভূবনেশ্বর থেকে ঢেঙ্কানল যাওয়ার ট্রেনও রয়েছে। ঢেঙ্কানল থেকে গাড়ি ভাড়া করে কপিলাস যাওয়া যায়। কলকাতার শালিমার থেকে ঢেঙ্কানলের সরাসরি একটি ট্রেনও পাবেন। এছাড়া কেওনঝড় রোড-এ নেমেও গাড়িতে ঢেঙ্কানল যেতে পারেন।

জঙ্গল পাহাড় ঘেরা শৈবতীর্থ কপিলাস
  • ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পাহাড়ি পথে চার কিলোমিটার উঠতে হবে। জঙ্গলে ঘেরা মনোরম পথ। আর পথের শেষে বিশাল মন্দির চত্বর। তারই নাম কপিলাস শৈবতীর্থ। প্রাকৃতিক শোভায় মুগ্ধ হয়ে যে পথচলার সূত্রপাত ঘটবে তা শেষ হবে মন্দির দর্শনে।

Advertisement

কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেন বা বিমানে ভূবনেশ্বর পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঢেঙ্কানল যেতে পারেন। ভূবনেশ্বর থেকে ঢেঙ্কানল যাওয়ার ট্রেনও রয়েছে। ঢেঙ্কানল থেকে গাড়ি ভাড়া করে কপিলাস যাওয়া যায়। কলকাতার শালিমার থেকে ঢেঙ্কানলের সরাসরি একটি ট্রেনও পাবেন। এছাড়া কেওনঝড় রোড-এ নেমেও গাড়িতে ঢেঙ্কানল যেতে পারেন।

কটক থেকে ঢেঙ্কানাল যাওয়ার রাস্তা ভীষণ সুন্দর। মার্চের শেষে কটক থেকে কপিলাস যাওয়ার বাসের খোঁজ করছিলাম। রোদ বেশ তীব্র। ওড়িশার নানা জায়গায় যাওয়ার বাস ছাড়ছে বাসস্ট্যান্ড থেকে। কপিলাস যেতে গেলে ঢেঙ্কানাল হয়ে তবেই যেতে হবে। তালচের আর আঙ্গুল যাওয়ার বাসও যায় এ পথেই। প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে পতিলা, শাল, পলাশ, আকাশমণি, মহুয়া, সেগুন, কেন্দু গাছের জঙ্গল। কোথাও ছোট ছোট গ্রাম, ছবির মতোই সুন্দর। বাস ভর্তি লোক। বেশিরভাগই আদিবাসী। চলেছে দূর দূরান্তে। এরা ওড়িশার পরিযায়ী শ্রমিক। দু’শো-তিনশো কিলোমিটার দূরে কলিয়ারি বা আয়রন অর মাইনস অথবা ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের কাজ করে। দু’-তিন মাস অন্তর বাড়ি ফেরে। এদের নিয়ে বাস চলেছে। থামছে, লোক তুলছে আবার চলছে। সন্ধ্যার মুখে ঢেঙ্কানাল পৌঁছে গেলাম। এটি ছোট্ট শহর, জেলা সদর বলে এর এত নামডাক।

নেমে একটু চা না খেলেই নয়। চায়ের দোকানের সন্ধান করি। বাসস্ট্যান্ডের অদূরেই চায়ের দোকান। পাশে গরম লুচি আর আলুর তরকারি হচ্ছিল। খিদেও পেয়েছিল খুব। তাই আগে লুচি তরকারি পরে গরম চা, এই দিয়ে খাওয়া সারলাম। বেশ পেটও ভরল। এবার কপিলাস যাওয়ার বাস বা গাড়ির খোঁজ শুরু করলাম। কিছুই নেই। সন্ধ্যার পর এই সব রাস্তা একদম খালি হয়ে যায়। আসলে তেমন যাত্রীও মেলে না। তাই ওই সময় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট রেখে লাভ নেই। মনে হচ্ছিল আমার আর আমার বন্ধুর আজ রাতটা ঢেঙ্কানালেই থেকে যেতে হবে। কাছাকাছি রাস্তার উপরে দু’-তিনটে হোটেল রয়েছে। সেগুলো নেহাত মন্দ নয়। তারই একটাতে জায়গাও পেয়ে গেলাম। সারাদিন ট্রেনে বাসে আসার ধকল, শরীরও ক্লান্ত। হোটেলের জানলা দিয়ে দূরের প্রকৃতি দেখা যায়।  ঢেঙ্কানাল শহরটাও বেশ সুন্দর। শহর থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরেই সপ্তশয্যা ইকো ট্যুরিজম। ঘন জঙ্গলে ঢাকা এই পথ।

পরের দিন খুব সকালে উঠে পড়েছিলাম। কোনওরকম দেরি যাতে না হয়। বাসস্ট্যান্ড থেকে গাড়ি যাচ্ছে কপিলাস মন্দির প্রাঙ্গণে। ঢেঙ্কানাল থেকে কুড়ি কিলোমিটার রাস্তা। পুরোটাই জঙ্গলে ঘেরা। খানিকক্ষণ চলার পরেই মন্দিরের নীচে পৌঁছে গেলাম। প্রায় হাজার ফুট উঁচুতে কপিলাস মন্দির নীচ থেকেই দেখা যাচ্ছে। অনেকে বলে এই নাকি মর্তের অন্যতম কৈলাস। কেউ বলে ওড়িশার কৈলাস। সোমবার ও শুক্রবার দূর দূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা আসেন কপিলাস মন্দিরে পুজো দিতে। ওড়িশার বিভিন্ন জেলা থেকে এমনকী প্রতিবেশী রাজ্য ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া থেকেও আদিবাসীরা আসেন এই মন্দিরে পুজো দিতে।

এখানে ওড়িশা সরকারের পান্থশালা আছে। আমাদের বুকিং নেই তাই থাকার অনুমতি পেলাম না। তবে সুন্দর একটা প্রাইভেট হোটেল পেয়ে গেলাম। আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম এসেই কপিলাস মন্দির দর্শন করব, তারপর অন্য কোথাও যাব। এবার উপরে ওঠার পালা। অটো যায় উপরে। একটা অটো যাচ্ছিল। তার ড্রাইভারের সঙ্গে রফা হল। আমাদের পৌঁছে দিলেন মন্দির চত্বরে। মোটামুটি চার কিলোমিটার পথ সোজা উঠে গিয়েছে। গিয়ে যা দেখলাম, তাতে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বিশাল শিবের মন্দির। বিরাট চাতাল। চারদিকে কিছু ছোট মন্দিরও আছে, প্রচুর তীর্থযাত্রী এর মধ্যেই এসে পড়েছেন দূর দূরান্ত থেকে। বাতাসা, লাড্ডু, নারকেল, ধূপ ও মালা দিয়ে পুজো দিলাম। এক অপার্থিব পরিবেশ। মন্দিরের ভেতর ইলেট্রিকের আলো নেই। কেরোসিনের ধুনি জ্বলছে। ভক্তেরা সবাই একসঙ্গে বলছে ‘ওম নমঃ শিবায়’। একটা জিনিস দেখে বেশ অবাক লাগল, এই পাহাড়ি জঙ্গলে এত নারকেল গাছ এল কোথা থেকে? গোটা মন্দির ঘিরে নারকেল গাছের সারি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এত উপরে নারকেল গাছ! কিন্তু ভক্তদের মাঝে এমন আশ্চর্য ঘটনা দেখেও কোনও বিস্ময় লক্ষ করলাম না। আমাদের কিন্তু বেশ অবাকই লাগল। তবে কোনও সদুত্তর পেলাম না। পুজো দিয়ে নীচে নেমে আসি। নামার সময় কিন্তু আর অটো নিলাম না। এবার সিঁড়ি দিয়েই নামলাম। কম নয়,  ১৩৫২টি সিঁড়ি। দশটা বাঁক। সিঁড়ি গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। পথের সৌন্দর্য মনোরম। মাঝে মাঝে বসার ব্যবস্থাও রয়েছে। একটু বসলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তারপর আবারও নামতে শুরু করা যায় নতুন উদ্যমে।

আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে একটা ছোটখাট প্রাইভেট হোটেলে। হোটেলেই খাবার ব্যবস্থা আছে। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই তীর্থযাত্রীরা কোথায় অদৃশ্য হয়ে যান। আর তাঁদের দেখা যায় না। অন্ধকার নেমে গিয়েছে। দীর্ঘ শালের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছি। শুক্ল পক্ষের চাঁদ উঠল। আকাশ থেকে যেন আলোর স্রোত নীচে নেমে আসছে। সেই আলোয় পথ দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। দূরে আদিবাসীদের গ্রাম। চাঁদনী রাতে মাদল নিয়ে উৎসবের মেজাজে ওরা। মাদলের শব্দে বনভূমি জেগে ওঠে। আরও একটা দিন থেকে যাই। ভালোলাগে এই নির্জন বনভূমি, ওই আদিবাসীদের মাদলের শব্দ। পরের দিন ঢেঙ্কানাল রওনা দিই।

সোমনাথ মজুমদার

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ