সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখবেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে চঞ্চল চৌধুরি।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখবেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে চঞ্চল চৌধুরি।
মা আমার মাটির মানুষ। কারও দুঃখ-কষ্ট একদম সহ্য করতে পারেন না। অপরকে আপন করে নিতে মায়ের জুড়ি নেই। এই নব্বই বছর বয়সেও। এমন স্নেহময়ী মায়ের সন্তান হতে পেরে আমি ধন্য। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছিলাম। আমি মায়ের কোলের সন্তান। মানে পরিবারের ছোট ছেলে। ফলে আমার প্রতি মায়ের আদর-যত্ন, প্রশ্রয়-পক্ষপাত একটু বেশিই। এখনও। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠাও। ওই যে বললাম, আমাদের পরিবার ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত। বাবা শিক্ষকতা করতেন। কষ্টের সংসারের কঠিন দিনগুলো মা শক্ত হাতে সামলেছিলেন বলেই আজ আমি এই জায়গায়। মায়ের জন্য পৃথিবীর আলো দেখেছি। অভাবের সংসারে যাবতীয় ঝড়-ঝাপটা, বিপদ-আপদ থেকে আমাদের আগলে রেখে বড় করেছেন। মানুষ করেছেন।
২০২২ সালে বাবা চলে গেলেন। পিতাহীন পৃথিবী শূ্ন্য মনে হতো। মা শক্ত মনে সবাইকে সাহস জোগালেন। কাজের জগতে ফের মনোনিবেশ করালেন। এখন মায়ের বয়স হয়েছে। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা শরীরে দানা বাঁধছে। মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি ঢাকার বাড়িতে নিয়ে আসি। ওই যে শুরুতেই বলেছি, মা আমার মাটির মানুষ। একটু সুস্থ বোধ করলেই গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য ছটফট করেন। আমাদের জন্মভিটে পাবনার নাজিরগঞ্জে। পদ্মার পাড়ে আমাদের গ্রাম। ওখানকার প্রকৃতি- পরিবেশ, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন ছেড়ে মা বেশিদিন শহরে কংক্রিটের জঙ্গলে থাকতে পারেন না। এদিকে আমি কাজের সূত্রে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াই। কিন্তু মায়ের জন্য বড় মনকেমন করে। দেশের বাইরে বা দূরে কোথাও গেলে মাকে আমার ঢাকার বাড়িতে নিয়ে এসে রাখি। অসাধারণ কিছু সময় কাটে মায়ের সান্নিধ্যে। আমি মায়ের সঙ্গ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকি। আমিও ফাঁক পেলেই গ্রামের বাড়ি চলে যাই।
আমার মা নমিতা চৌধুরি কোনও সন্তানের প্রতিই কোনও দিন কড়া ছিলেন না। আজও নন। অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পিছনে মায়ের পূর্ণ সমর্থন ছিল। স্ট্রাগলের দিনগুলোয় সবচেয়ে ভরসাস্থল ছিলেন মা। আমার সৌভাগ্য বাবা-মা দু’জনেই জ্ঞানত আমার সাফল্য উপভোগ করেছেন। মা আমাকে নিয়ে খুব গর্বিত। মুখে যদিও সেটা কখনও প্রকাশ করেন না। মা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাঁর মুখে যে আমি হাসি ফোটাতে পেরেছি, তাতেই আমি ধন্য। সারা পৃথিবীর বাঙালির কাছে আমি যতটুকু পৌঁছতে পেরেছি, তার সবটাই মায়ের আশীর্বাদে। যা করেছি, আজও যা করে চলেছি, সবই মায়ের মুখের হাসি আর তৃপ্তি দেখার জন্য।
অনুলিখন: প্রিয়ব্রত দত্ত