Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

স্কুল-কলেজে মেয়েরা কীভাবে বড় হচ্ছে?

আজ, ২৪ জানুয়ারি ‘জাতীয় কন্যাসন্তান দিবস’। সেই উপলক্ষ্যে কলকাতার দু’টি নামজাদা স্কুল ও কলেজের প্রধানদের কলমে উঠে এল বর্তমান সময়ের ছাত্রীদের ভালো-মন্দ, বেড়ে ওঠার নানা দিক।

স্কুল-কলেজে মেয়েরা কীভাবে বড় হচ্ছে?
  • ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আজ, ২৪ জানুয়ারি ‘জাতীয় কন্যাসন্তান দিবস’। সেই উপলক্ষ্যে কলকাতার দু’টি নামজাদা স্কুল ও কলেজের প্রধানদের কলমে উঠে এল বর্তমান সময়ের ছাত্রীদের ভালো-মন্দ, বেড়ে ওঠার নানা দিক।

Advertisement

মোবাইলের হাতছানি ক্ষতি করছে

পার্থ প্রতিম বৈদ্য, প্রধান শিক্ষক, যাদবপুর বিদ্যাপীঠ

ছাত্রীদের মনস্তত্ত্বকে আমি এখন দু’ভাগে ভাগ করি। ১) কোভিডের আগের মনস্তত্ত্ব, ২) কোভিড যুগ পেরনোর পরের মনস্তত্ত্ব। একটা সময় ছিল যখন বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো মেয়েদের সমস্যাগুলো প্রায় একই ধরনের ছিল। কিন্তু কোভিডের পর, ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে মোবাইল বেশি পরিমাণে উঠে যাওয়ায় এই সমস্যাগুলোতেও বহুল পরিবর্তন এসেছে। এখন এক একজনের প্রকাশ এক একরকম। কেউ যেমন ডেসপারেট হয়ে উঠছে, কেউ আবার অন্তর্মুখী হয়ে পড়ছে। এই দু’টিই ক্ষতিকর। তবে স্কুলের গাইডেন্স আর বাবা-মায়ের সচেতনতা একসঙ্গে যুক্ত হলে এই বয়সেও খুব একটা সমস্যা তৈরি করে না, এমন বহু ছাত্রীও দেখছি। আসলে কন্যাসন্তানকে বড় করে তোলা বেশি কঠিন। আমি নিজেও এক কন্যার পিতা। তাই ছাত্রীদের বুঝতে ও তাদের সমস্যাগুলোর গভীরে যেতে আমার সুবিধা হয়। এখনকার দিনে ছাত্রীদের জীবনে মোবাইল একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ওটিটি, নানা রিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত বিখ্যাত হয়ে যাওয়া এগুলো ছাত্রীদেরও খুব প্রভাবিত করছে। তাই মোবাইল ব্যবহারে রাশ টানা জরুরি। ছোট থেকেই খানিক নজরে রাখলে ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিলে, উঠতি বয়সের নানা সমস্যা অনেকটা সহজে কাটিয়ে তোলা যায়। তারপরেও যাদের সমস্যা থাকে, তাদের জন্য আমাদের স্কুলে কাউন্সিলিংয়ের চল রয়েছে। আমাদের ছাত্রীরা লেখাপড়া ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও তুখোড়। বোর্ডের পরীক্ষায় র‌্যাঙ্ক করে। তাই তাদের সার্বিক উন্নতির সঙ্গে মনের দিকেও আমাদের নজর থাকে। স্কুলের শিক্ষকরা প্রয়োজনে একটু-আধটু শাসন করতে পারলে বোধহয় ছাত্রসমাজের আরও উন্নতি হতো।

লাগামছাড়া ছাত্রীদের জন্য আমার আলাদা ট্রিটমেন্ট

সুমিতা সরকার, প্রধান শিক্ষিকা, শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুল

এই সময়ের মেয়েদের বড় হওয়া দেখতে দেখতে একটা বিষয় খুব উপলব্ধি করতে পারি। একটা সময় ছিল, যখন কেউ ৮৫ বা ৯০ পেলে, তাকে যদি বলতাম, ‘কেন আর একটু মন দিলি না রে, কোথায় কী ভুল করলি যে ৯৫ বা ১০০ হল না, খেয়াল করেছিস?’ তাহলে তারাও সমান আগ্রহ নিয়ে সিরিয়াসলি বিষয়টি ভাবতে বসত। কিন্তু বছর পাঁচ-ছয়েক ধরেই দেখছি, মেয়েরা খুব অল্পেই খুশি! উল্টে বলে, ‘ঠিকই তো আছে দিদি, আর কত ভালো হবে!’ পড়াশোনা নিয়ে বাড়তি টেনশন করে না এই প্রজন্ম। বুঝি, ওদের জীবন দেখার ধরন এখন আলাদা। কোভিডের পর থেকেই এই বদল বেশি করে টের পাচ্ছি। একসময় মেয়েদের দেখতাম, স্কুল-শিক্ষকদের নিয়ে তাদের মনে আলাদা এক সম্ভ্রম কাজ করত। এখন সেটা কম। উল্টে শিক্ষকদেরও খুঁটিনাটি ভুলত্রুটি নিয়ে সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা তারা বলতে পারে। এতে তাদের সচেতনতা বাড়ছে হয়তো, কিন্তু মূল্যবোধ ও শালীনতার পাঠ বোধহয় কম পড়ছে। অভিভাবকদের একাংশও আজকাল শিক্ষকদের ‘ওই টিচার’, ‘অমুক মাস্টার’ এসব বলেন। ছাত্রীরাও সেভাবেই বলতে শেখে। যুগের হাওয়া হয়তো! তবে আমাদের স্কুলে ছাত্রীদের মূল্যবোধ নিয়ে সর্বতোভাবে সচেতন করা হয়। উঠতি বয়সের একটু লাগামছাড়া মেয়েদের জন্য আমার আবার অন্য ‘ট্রিটমেন্ট’। শাসন না করে বরং সামনে ডেকে কথা বলে, একটু ভালোবাসা ও আদর দিয়ে বোঝালে দেখেছি তারা খুব সহযোগিতা করে। অভিভাবকরাও আজকাল অধৈর্য। ওদের কেউ বুঝতে চায় না। ওদের কথা শুনতে চায় না। সমস্যা সেখানেও থাকে।

উপার্জন ও ক্ষমতায়নের দিকেই ঝোঁক বেশি

শিউলি সরকার, অধ্যক্ষা, লেডি ব্রেবর্ন কলেজ

সমাজকে পাল্টে দেওয়ার জন্য মেয়েদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। আর সেই ক্ষমতায়ন যখন শিক্ষার মাধ্যমে আসে তখন তা আরও সম্মানজনক হয়ে ওঠে। তাই বাড়ির পরিচারিকারা যখন রোজগার করে সংসার চালান, তাঁরা সমাজে সম্মান পান না। কারণ সেই অর্থটা শিক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত নয়। বিপরীতে কোনও মহিলা যখন শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, তখন তিনি পরিবারে এবং সমাজে সম্মানিতও বটে। ফলে তাঁর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় যা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাবলম্বন শুধু নিজের নয়, সমাজেরও প্রয়োজন। সংসার ও সন্তানের মধ্যে তিনি নিজের অর্জিত শিক্ষা ছড়িয়ে দেন। ফলে সমাজ অগ্রসর হয়।

মেয়েদের এই স্বাবলম্বী হওয়ার একটা স্বাদ আছে। এখনকার মেয়েরা সেই স্বাদ বেশি মাত্রায় উপভোগ করছেন। আমার তিন দশকের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আগে মেয়েরা ভালো রেজাল্টের জন্য পড়াশোনা করত। এখন তারা রোজগার করতে হবে এই মনোভাব নিয়ে পড়াশোনা করে। তাই ক্লাস কেটে আগে যেমন ছাত্রীরা সিনেমা দেখতে যেত বা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটাত, এখন সেখানে তারা পেশাদারি ট্রেনিং নেয়, কোর্স করে, পার্ট টাইম রোজগার করে। এই তফাতটা খুবই চমকপ্রদ এবং উল্লেখযোগ্য। মেয়েদের উপার্জনক্ষম হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে।

তবু আজও ‘জাতীয় কন্যাসন্তান দিবস’ পালন করা জরুরি। কারণ এর মাধ্যমে সমাজে একটা সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বাবা মায়ের কাছে এখনও একটি বার্তা পৌঁছানো দরকার যে পুত্র অপেক্ষা কন্যা কোনও অংশে কম নয়। এই প্রচেষ্টায় সরকারি উদ্যোগে নানা ধরনের স্কিম চালু করা হয়েছে ঠিকই, কন্যাশ্রী, স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ ইত্যাদি। তবু এই ভাবনা সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মহিলাদের আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এবং তার জন্যই এই ধরনের দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।

মেয়েরা এখন অনেক সাহসী ও স্পষ্টবক্তা

তানিয়া চক্রবর্তী, অধ্যক্ষা, শ্রীশিক্ষায়তন কলেজ

শিক্ষকতার জগতে দুই দশকেরও কিছু বেশি কাটানোর পর বলতে পারি মেয়েরা এখন অনেক বেশি সাহসী, স্পষ্টবক্তা। পাশাপাশি তারা ভীষণ টেকস্যাভি। এতে অনেকখানি লাভ আর খানিকটা ক্ষতিও হচ্ছে। এই প্রযুক্তি নির্ভরতার ফলে মনোযোগের অভাব ঘটছে। তবে এই প্রযুক্তির মাধ্য঩মেই আবার নানা দিক দিয়ে তারা এগিয়ে যেতেও সক্ষম হচ্ছে। মনোভাবগত যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রবণতা খুবই উল্লেখযোগ্য। এখনকার মেয়েরা একটা নির্দিষ্ট চাহিদা নিয়ে পড়াশোনা করে। সেই পড়াশোনার পর তারা একটা লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়। নিজেদের রোজগার তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন মেয়েরা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থে঩঩কেই রোজগারের সন্ধনে লেগে পড়ে। আগে তারা পড়াশোনা শেষ করে তবেই চাকরির খোঁজ করত।

এই চাকরি বা রোজগারের বিষয়টাও অনেকটাই বদলেছে। যেমন প্রথম যখন মহিলারা চাকরির সন্ধানে বেরলেন, তখন তাঁদের কাছে স্টেবিলিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সরকারি চাকরির প্রাধান্য বেশি দেখা যেত। এরপর সরকারি ও বেসরকারি চাকরির চাহিদা ভাগ হয়ে গেল মেয়েদের মধ্যে। কেউ সরকারি নির্ভরযোগ্য চাকরিতে গেলেন, কেউ বা টাকা বেশি ভেবে বেসরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকলেন। এখন কিন্তু নির্ভরযোগ্যতা আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফ্রিলান্সিংয়ের গুরুত্ব বাড়ছে। একইসঙ্গে মেয়েরা একাধিক রোজগারের পথ বেছে নিতে আগ্রহী। এর পিছনেও একটা অন্য ধরনের আত্মবিশ্বাস কাজ করে। এখনকার মেয়েদের মধ্যে ‘আমি পারব’ এই বিশ্বাসটা ক্রমশ বাড়ছে।

মানসিকভাবে মেয়েদের এই উন্নতি হলেও জাতীয় কন্যাসন্তান দিবস পালন করা দরকার। কারণ এখনও কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়, আজও মহিলারা পারিবারিক হিংসার শিকার, আজও রাস্তাঘাটে মেয়েদের হেনস্তা হতে হয়। ফলে মেয়েদের জন্য ‘দিবস’ পালন এখনও প্রয়োজন।

অনুলিখন: মনীষা মুখোপাধ্যায় ও কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ