শহরের গায়ে পুজোর গন্ধ এখন ম্লান। তাতে জুড়ে আছে বিষাদ। উৎসবের মরশুম শেষের পথে। বছরভর আনন্দ জমিয়ে রাখা ফানুসের এবার দম শেষ। চেনা রুটিনে ফিরেছে জীবন। উৎসবের আবহে অনিয়মটাই যেন ছিল নিয়ম। তার জের পড়বে ত্বক এবং চুলেও। এখন যত্ন জরুরি। নিজেকে তরতাজা করে তুলতে একটু সময় দিন। কিছু ঘরোয়া রুটিন মেনে চলুন। তাহলেই শরীর, মন আবার দৌড়বে আপন ছন্দে।
কীভাবে নিজের পরিচর্যা করবেন, তার সুলুক সন্ধান দিলেন কসমেটোলজিস্ট এবং এসথেটিক কনসালট্যান্ট সায়ন্তন দাস। তাঁর কথায়,‘উৎসবের মরশুমে আমরা নিয়ম ভাঙতে ভালোবাসি। ত্বকের যত্ন হয় না। প্রচুর বাইরের খাবার খাই। ঘুমোই না। উৎসব শেষে ফের ক্লান্তিহীন ত্বকের খোঁজে থাকি। মনে রাখবেন, ত্বক এবং চুলকে শ্বাস নিতে দিতে হবে। এটাকে প্রাধান্য দিতেই হবে। নিয়মের মধ্যে না থাকলে ত্বক এবং সারা শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে যায়। কারণ পুজো পার্বণে বাইরে প্রচুর খাওয়া হয়। পরিমাণমতো জল খাওয়া হয় না। একটু ইলেকট্রলের জল, ওআরএস খেতে পারেন। এতে শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় থাকবে। সোডিয়াম পটাশিয়ামের ভারসাম্য শরীরে বজায় থাকবে।’
ক্লান্তিহীন ত্বক পেতে প্রথমেই পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দিন। অর্থাৎ ত্বকের সঠিক ক্লেনজিং প্রয়োজন। এমনিতেই প্রতিদিনের দূষণে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎসবের সময় অতিরিক্ত মেকআপ ব্যবহারের ফলে ত্বকে ধুলো, মেকআপের গুঁড়ো জমে থাকে। প্রতিদিন মেকআপ তুলে তবে ঘুমোতে যাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তা সত্ত্বেও পরপর কয়েকদিন অতিরিক্ত মেকআপ ব্যবহার করলে এই সমস্যা হতে পারে। ফলে ক্লেনজিংয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিলেন সায়ন্তন। একইসঙ্গে একদিন অন্তর শ্যাম্পু করে মাথার তালু পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ঘরোয়া কিছু স্ক্রাবার ক্লিনজিংয়ের পাশাপাশি ত্বকের মরা কোষ তুলতেও সাহায্য করে। আপনার ত্বক অনুযায়ী স্ক্রাবার ব্যবহার করে দেখুন।
ঘরোয়া স্ক্রাবার
• বেসন, চন্দনের গুঁড়ো, গোলাপের পাপড়ির গুঁড়ো, ওটমিল্ক, আখরোটের খোলা গুঁড়িয়ে নিয়ে গোলাপ জলে মিশিয়ে নিন। ১০ মিনিট লাগিয়ে হালকা করে ধুয়ে নিলে ভালো স্ক্রাবারের কাজ করে। এসব উপকরণ বাড়িতে না থাকলেও অন্তত বেসন এবং চন্দন গুঁড়ো মিশিয়ে স্ক্রাব করতে পারেন।
• রাইস পাউডার, কফি বিন পাউডার, লেবুর রসের সঙ্গে মিশিয়ে অথবা অ্যালোভেরা জুসের সঙ্গে মিশিয়ে লাগালে ব্রণপ্রবণ ত্বকের ক্ষেত্রে ভালো স্ক্রাবারের কাজ করে। বাইরের তেল-মশলাযুক্ত খাবার ত্বকে ব্রণর প্রবণতা বৃদ্ধি করে। দুর্গাপুজোর সময় বাইরের খাবার খাওয়া তো হয়। অনেকে তৈলাক্ত ত্বকে ময়লা জমার ফলেও ব্রণর সমস্যায় ভোগেন। সেসব ক্ষেত্রে এই স্ক্রাবার ভালো কাজ করবে।
• কফি বিন পাউডার, শুকনো নারকোল, গোলাপ জল, যেকোনও এসেনশিয়াল অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করুন। শুষ্ক ত্বকে এই মিশ্রণ ভালো স্ক্রাবারের কাজ করবে। সায়ন্তন বললেন, ‘স্ক্রাবিংয়ের পর সেরাম ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ হালকা কিছু ব্যবহার করতে হবে। যাতে রোমকূপ বন্ধ না হয়ে যায়। তবেই ত্বক শ্বাস নিতে পারবে। সেক্ষেত্রে হায়ারুলোনিক অ্যাসিডযুক্ত বা ভিটামিন সি-যুক্ত সেরাম ব্যবহার করতে পারেন। নায়াসিনামাইডও ব্যবহার করতে পারেন।’ স্ক্রাবিং হল ত্বকের যত্নের শুরুর ধাপ। ত্বক পরিচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার পর যা ক্ষতি হয়েছে, তার শুশ্রষা প্রয়োজন। সূর্যর অতিবেগুণি রশ্মির ফলে ট্যান পড়ে ত্বকে। আবার ক্লান্তির কারণে বলিরখো স্পষ্ট হতে পারে। এসবের সমাধান রয়েছে ঘরোয়া উপকরণে তৈরি প্যাকে। একইসঙ্গে চুলের যত্নেও ঘরোয়া তেল ব্যবহার করুন।
ঘরোয়া প্যাক
• মুসুর ডাল বাটা, কাঁচা হলুদ সঙ্গে চন্দনের গুঁড়ো, জাফরান, দুধের সর মিশিয়ে লাগালে ত্বকে ক্লান্তির ছাপ দূর হবে। ত্বক উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
• আপনার ত্বক তৈলাক্ত হলে মুলতানি মাটি, অ্যালোভেরা পাউডার, চন্দনের গুঁড়ো, অ্যালোভেরা জুস বা অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করুন। মুখ, হাত, গলার মতো শরীরের খোলা অংশে লাগিয়ে রাখুন। শুকিয়ে গেলে সাধারণ জলে ধুয়ে ফেলুন।
• নারকেল তেলের মধ্যে কালোজিরে, কারিপাতা, জবা ফুলের পাপড়ি, ছাঁচি পেঁয়াজ মিশিয়ে তেল বানিয়ে নীল কাচের বোতলে রেখে রোদ্দুরে দিন। এতে ওই তেল সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা পায়। এই তেল সপ্তাহে একদিন মাথায় হালকা মাসাজ করে শ্যাম্পু করে নিন। এতে চুল কম পড়বে। পাশাপাশি পিএইচ ব্যালেন্সও ঠিক থাকবে।
ঘরোয়া উপায়ের পাশাপাশি ক্লান্তি দূর করতে পেশাদারের সাহায্যও নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে স্যালোঁয় যেতে হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কী করাবেন, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকে অনেকের। আপনার ত্বক এবং চুলের প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। তবে বেশিরভাগ মানুষের কথা ভেবে সায়ন্তনের পরামর্শ, ‘দীর্ঘ একমাস উৎসবের আবহের পর লিমপ্যাথেটিক ড্রেনেজ স্কিন ট্রিটমেন্ট করাতে পারেন। আমাদের ত্বকে প্রচুর ল্যাকটিক অ্যাসিড জমে। এই ট্রিটমেন্টে ত্বক থেকে টক্সিন বের করে দেয়। ফলে ত্বক ফোলা ফোলা লাগবে না। অনুজ্জ্বল লাগবে না। এর সঙ্গে বডি পলিশ করিয়ে নিন। আর পায়ের যত্নের কথা ভুলে গেলে ক্ষতি আপনারই। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফুট মাসাজ বা ফুট পেডিকিওর করে নিন।’ উৎসবমুখর বাঙালি। বছরভর নানা উৎসবে শামিল হতে নিজেকে তরতাজা রাখতেই হবে। সেই পথচলা শুরু হোক আজ থেকেই।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য