কী কী বদল আনলে নতুন বছরে সাফল্য হাতের মুঠোয়? কোন স্বভাব নতুন করে আয়ত্ত করলে জীবন অনেক সহজ হবে? রইল সেই তালিকা।
কী কী বদল আনলে নতুন বছরে সাফল্য হাতের মুঠোয়? কোন স্বভাব নতুন করে আয়ত্ত করলে জীবন অনেক সহজ হবে? রইল সেই তালিকা।
জীবনে ঝকঝকে একটা নতুন বছর। প্রতি বছরের ছোটখাট নানা ভুলে অনেক সাফল্যই অধরা থেকে যায়। অফিসের প্রোমোশন আটকে যায়, বাড়িতে দেওয়া কথা হয়তো রাখতে পারেন না। কখনও আবার নিজের লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথেই ব্যর্থতা ঘিরে ধরে। জীবনের এমন নানা ওঠাপড়া সামলাতে চাইলে প্রয়োজন নিজেকে চেনা ও সেই মতো পরিকল্পনা করা। অন্যজন যে পথে সফল হয়েছে, হয়তো আপনার পথ সেটা নয়। নিজের পথ কী, তা খুঁজে বের করার আগে নিজের দোষ ও গুণ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখুন। তবেই জীবনে উন্নতির ছোট-বড় কৌশল সহজে রপ্ত হবে। কিছু স্বভাব আয়ত্তে আনলেই ব্যর্থতা ভুলে উন্নতির শিখরে উঠবেন। খেয়াল রাখুন কয়েকটি দিকে।
• ডিজিটাল ডিটক্স-এ অভ্যস্ত হওয়া: হাতের মুঠোয় একটা মোবাইল ফোন। সারাদিন তাতে দেশ-দুনিয়ার নানা খবর, ঘটনা, কতশত রিল, বিভিন্ন অ্যাপ। মোবাইলে তাকিয়েই দিন কাবার। এতেই বাদ পড়ে যায় অসংখ্য দরকারি কাজ। ওটিটি ও সিনেমার ভিড়ে ঘুমও দফারফা। তাই নতুন বছরে স্ক্রিন টাইম কমানোর দিকে নজর দিন। প্রথম চেষ্টাতেই সফল হবেন এমন নয়, তবে ধীরে ধীরে সময় কমানোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমদিকে ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগেই মোবাইল দেখার অভ্যাস বন্ধ করুন। তারপর দিনের মধ্যে অনেকটা সময় অকারণ মোবাইল ঘাঁটার পরিমাণে রাশ টানুন। এতে নিজের অন্যান্য শখের প্রতি যত্নবান হবেন। ঘুমের রুটিনেও বড়সড় বদল হবে। সৃজনশীলতা বাড়বে।
• কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: জীবনে চলার পথে ভালো-খারাপ নানা দিক থাকে। ভালো দিকগুলি নিয়ে অধিক চিন্তা করলে মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন তাজা থাকে। দিনের সবচেয়ে ভালো তিনটি ঘটনা নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন প্রকৃতি বা আরাধ্যের কাছে। এই সাধারণ অভ্যাস মস্তিষ্ককে জীবনের ভালো দিকগুলো দেখতে শেখাবে। জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো ভুলতে শিখিয়ে আনন্দ বাড়ায়।
• দম্ভ নয়: কিছু কাজে হয়তো যোগ্যতম আপনিই। হয়তো শিক্ষার বহরও বেশি। তবে সেসব নিয়ে দম্ভ করতে বসলেই পতন অনিবার্য। প্রাজ্ঞরা বলেছেন, মাটির কাছাকাছি থাকুন। নিজের পদমর্যাদা ও ক্ষমতার চেয়ে একটু নীচে অবস্থান করুন, এতে মান যেমন বাড়ে, তেমনই নিজের সম্পর্কে বড় ধারণা তৈরি হয় না। অহঙ্কার আয়ত্তে রাখতে পারলে তবেই সাফল্য ধরে রাখা যায়। উন্নতির কোনও সীমা হয় না। তাই মনকে নত করতে পারলে, নিজেকে ঘষেমেজে আরও প্রস্তুত করা যায়।
• আলস্য ঝেড়ে ফেলুন: সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে না পারার বদভ্যাস অনেকের থাকে। এর অন্যতম কারণ আলস্য। ‘পরে করছি’ বা ‘আজ থাক, কাল হবে’— এমন ভাবনা থেকেই কাজের পাহাড় তৈরি হয়। বরং সময়ের কাজ সময়ে শেষ করার ক্ষেত্রে ‘ডু ইট নাউ’ নীতিতে বিশ্বাসী হোন। এতে সময় বাঁচবে, কাজের চাপও সহজে কমবে।
• ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির: দীর্ঘমেয়াদি কোনও পরিকল্পনা থাকলে বড় লক্ষ্য স্থির না করে বরং লক্ষ্যকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিন। ছোট লক্ষ্য সহজে অর্জন করা যায়। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। শুরুতেই পিছিয়ে আসার প্রবণতা কমে। তখন আর বড় লক্ষ্যকেও অসম্ভব বলে মনে হয় না।
• ‘না’ বলতে শিখুন: সকলকে খুশি করা অসম্ভব। তাই সবকিছুতে ‘হ্যাঁ’ বলার বদভ্যাস থাকলে তা বদলে ফেলার সময় এসে গিয়েছে। এতে অনেক গুরুত্বহীন কাজ করা থেকে সময় বাঁচবে। নিজের ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে ও নিজের উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিতে পারবেন। নিজের সমস্যা ও বিপর্যয়ের সময় নিজের ও পরিবারের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন। শুনতে স্বার্থপরের মতো মনে হলেও বিষয়টা আদপে তা নয়। আপনি ‘না’ বলেন না বলেই হয়তো বহু লোক আপনার সময় বা উপস্থিতিকে ‘অবশ্যপ্রাপ্ত’ বলে ধরে নেন। নিজেদের যে কোনও কাজের ভার আপনার উপর ছেড়ে নিজস্ব জীবনে ব্যস্ত থাকেন। তাই ‘না’ বলা খুব জরুরি।
• ঘুমে কার্পণ্য নয়: ভালো ঘুমই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। এমন কোনও কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবেন না, যা ঘুমের থেকে সময় চুরি করে নিচ্ছে। মেজাজ, মনোযোগ ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির অন্যতম সেরা উপায় ভালো ঘুম। তাই রাত জেগে সিনেমা, বই পড়া বা আড্ডা কিছুই চলবে না। অনেকেই সারারাত সিনেমা, আড্ডা, টুকটাক পেশাদার কাজ সারেন, সকালে ঘুমোন। কিন্তু আমাদের শরীরে রাতের ঘুমই বেশি উপকারী। আজ কম ঘুমিয়ে কাল বেশি ঘুমিয়ে নিলেও ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা যায় না। যাঁরা নাইট ডিউটি করেন, তাঁদেরও ঘুমের ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকেই যায়। একান্ত উপায় না থাকলে সেটা মেনে নিয়েই নাইট ডিউটি করতে হবে। নচেত রাতে একটানা সাত ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
• নিয়মানুবর্তী হওয়া: রুটিন ও নিয়ম মেনে চলা জীবনে জরুরি। কবে, কোন কাজ, কতক্ষণ ধরে করবেন তার রুটিন না থাকলে সেই কাজ পণ্ড হতে বাধ্য। কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবন সর্বত্রই নিয়ম মেনে চলুন। এর মধ্যেই কাজের ছন্দ ও সাফল্য লুকিয়ে থাকে। রুটিন যেমন থাকবে, তেমনই পরিস্থিতি অনুযায়ী রুটিন বদলের জায়গাও রাখুন। এতে জীবন যন্ত্রে পরিণত হবে না।
• ব্যর্থতাকে ভয় নয়: জীবনে ব্যর্থতা আসবেই। সেই ব্যর্থতা কাটিয়েই সাফল্যে পৌঁছতে হয়। ব্যর্থতার হতাশায় না ডুবে ভুল কোথায় হচ্ছে, সেটা বুঝতে হবে। তাহলে একদিন সব ভুল সংশোধিত হয়ে সাফল্যের নিশান উড়বে।
• টাকাপয়সার মর্ম: কৃপণ হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমন বেহিসেবি খরচ করাও খুব একটা কাজের কথা নয়। বেতন বেশি হোক বা কম, নিজের প্রয়োজনের জিনিসপত্র কেনার সময় সচেতন হোন। অপ্রয়োজনীয় জিনিস ‘কেনার ঝোঁকে’ কিনবেন না। প্রয়োজনীয় জিনিসও অকারণে প্রচুর টাকা দিয়ে কেনার দরকার নেই। নিজের বাজেটে ভালো জিনিস কোথায় পাবেন সেটা দেখতে পারেন। সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করুন। ডিজিটাল লেনদেনে সচেতন হোন। আর্থিক জালিয়াতি নিয়ে সজাগ থাকুন।
• রোজ এক্সারসাইজ: সারাদিনে নিজের জন্য অন্তত ৪৫ মিনিট সময় বরাদ্দ করুন। হাঁটা, সাইক্লিং, যোগাসন, জিম, সাঁতার ইত্যাদি যে কোনও একটি এক্সারসাইজ রোজ রুটিনে রাখুন। এতে ডোপামিন ক্ষরণ বাড়ে, মন ভালো থাকে। ।
• মূল্যায়ন করুন: ঘুমাতে যাওয়ার আগে মাত্র কয়েক মিনিট সময় নিজেকে দিন। সারাদিনে কী কী হল, আরও কী কী করতে পারতেন তা ভাবুন। প্রয়োজনে ভুলগুলি এক জায়গায় লিখে ফেলুন। আগামী কালের পরিকল্পনাও করে নিন। এই বিশ্লেষণ শেখার মানসিকতা গড়ে তুলবে এবং ভুল-ঠিক বুঝে এগতে সাহায্য করবে। নিজের অনুভূতি ও লক্ষ্যগুলোও ভালোভাবে বুঝতে শেখাবে। এতে আপনি আরও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
মনীষা মুখোপাধ্যায়