Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

প্রয়াত সাহিত্যিক শংকর, চৌরঙ্গী, জন-অরণ্যের স্রষ্টার মৃত্যুতে যুগাবসান

‘কর্পদকহীন সংসার, এতগুলো পেট। বাধ্য হয়ে বালক বয়সেই কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলাম কলকাতা শহরের রাস্তায়।... সেই সময়টা শুধু পেট চালানোর জন্য রাজপথে ফেরি করা থেকে কত রকমের কাজ ও অকাজ যে করেছি তার হিসেব নেই।’

প্রয়াত সাহিত্যিক শংকর, চৌরঙ্গী, জন-অরণ্যের স্রষ্টার মৃত্যুতে যুগাবসান
  • ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘কর্পদকহীন সংসার, এতগুলো পেট। বাধ্য হয়ে বালক বয়সেই কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলাম কলকাতা শহরের রাস্তায়।... সেই সময়টা শুধু পেট চালানোর জন্য রাজপথে ফেরি করা থেকে কত রকমের কাজ ও অকাজ যে করেছি তার হিসেব নেই।’ একাশি বছরে পৌঁছে জীবনের অসম লড়াইয়ের দিনগুলির এভাবেই স্মৃতিচারণা করেছিলেন। অবশেষে থামল লড়াই। মৃত্যুর কাছে হার মানলেন ৯২ বছর বয়সি শংকর! সেই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে একটা যুগের অবসান হল। শুক্রবার শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন-অরণ্য’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’র স্রষ্টা। তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডলে মমতা লিখেছেন, ‘বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল।’ শোকপ্রকাশ করে শিল্পপতি ডঃ সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা অসাধারণ। তাঁকে হারানো আমার কাছে একটা ব্যক্তিগত ক্ষতি।’

Advertisement

১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের যশোর জেলার বনগ্রামে জন্ম শংকরের। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। ভাগ্যানুসন্ধানে তিনি চলে আসেন হাওড়ায়। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পড়তেন হাওড়া বিবেকানন্দ স্কুলে। ১৯৪৭ সালে বাবার অকাল প্রয়াণে পালটে যায় জীবন। মা অভয়ারানির কঠিন লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ান মণিশংকর। ফেরিওয়ালা থেকে টাইপরাইটার ক্লিনার— ক্ষুণ্ণিবৃত্তির জন্য যে কোনো পেশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তবে, লেখাপড়া থামেনি। সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আইএ পাশ করে বঙ্গবাসী ইভিনিং কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয় ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘কত অজানারে’। মণিশংকর হয়ে ওঠেন শংকর। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হল ‘চৌরঙ্গী’। এই উপন্যাস অবলম্বনেই তৈরি হয় পিনাকী মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘চৌরঙ্গী’ ছবিটি। সেখানে স্যাটা বোসের চরিত্রে উত্তম কুমারের অভিনয় আজও বাঙালি মনে রেখেছে। শংকরের কাহিনি ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন-অরণ্য’ অবলম্বনে ছবি তৈরি করেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর কাহিনি নিয়েই তৈরি হয় মঞ্চ সফল নাটক ‘সম্রাট ও সুন্দরী’।
স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা বাংলা সাহিত্যে অমূল্য সম্পদ। দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে পেয়েছেন বহু সম্মান ও পুরস্কার। ‘একা একা একাশি’ রচনার জন্য ২০২০ সালে পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। সাহিত্যসৃষ্টির পাশাপাশি সামলেছেন বেসরকারি সংস্থার মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিকের দায়িত্ব।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন শংকর। গত বছর ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভাঙে তাঁর। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু জানুয়ারি মাসের শেষে ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভরতি করা হয় হাসপাতালে। শুক্রবার দুপুরে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন শংকর। প্রকাশক সুধাংশুশেখর দে জানিয়েছেন, বছর তিনেক আগে একটি ‘উইল’ করেছিলেন এই বর্ষীয়ান সাহিত্যিক। ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন, মা ও স্ত্রীকে যেখানে দাহ করা হয়েছিল, সেই কেওড়াতলাতেই যেন তাঁকে দাহ করা হয়। সাহিত্যিকের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে এদিন শংকরের নিথর দেহ হাসপাতাল থেকে বন্ডেল রোডের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ