ঐতিহ্য, বনেদিয়ানা, ইতিহাস— দুর্গাপুজোর সঙ্গে মিলেমিশে থাকে এসব শব্দ। সারা বছর যে রীতি পালন করা হয়ে ওঠে না হয়তো, পুজোর দিনে সেসব আচার পালনেই মন বসে। সাজপোশাকও ব্যতিক্রম নয়। কাজের সুবিধে, আরামের কথা মাথায় রেখে পোশাক বেছে নেন সকলে। তার সঙ্গে হালকা গয়নার সাজ। কারও আবার গয়না পরতে ভালো লাগে না। তাই জোর দেন রকমারি সানগ্লাস, ব্যাগ, বেল্টের উপর। কিন্তু পুজো মানেই শিকড়ে ফেরার গল্প। শাড়ির সাজ। সালোয়ার কুর্তা, ড্রেসও থাকে। রকমারি গয়নাও সাজে যোগ্য সঙ্গত করে। কিন্তু কোন পোশাকে কেমন গয়না মানায় ভালো? টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে স্টাইলিস্ট তথা ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন নিশ্চিতা সেনগুপ্ত। তিনি অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, ব্যক্তিত্বের উপর সাজ অনেকটাই নির্ভরশীল। যদিও পুজোর দিনে ঐতিহ্যবাহী সাজের কথা মাথায় রেখে গয়না বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি। প্রথমেই মনে রাখতে বললেন, ‘পোশাক জমকালো হলে গয়না হালকা হতে হবে। এর উল্টোটাও সত্যি। একটি অন্যটিকে যেন ছাপিয়ে না যায়। বরং পোশাক ও গয়নাকে একে অপরের পরিপূরক করে তোলাই সাজের লক্ষ্য।’
পুজোর সকালগুলোতে নানা ধরনের সুতির শাড়ি পরতে স্বচ্ছন্দ অনেকেই। ধনেখালি তাঁত, চেক বা স্ট্রাইপড হ্যান্ডলুম, একরঙা ইঞ্চিপাড় শাড়ি, বাংলার ঢাকাই— পছন্দ আপনার যেমনই হোক তার সঙ্গে রূপোর গয়না পরতে পারেন বলেন জানালেন নিশ্চিতা। ‘সুতির অনেক ধরন হয়। রুপোর গয়নাও নানা ধরনের হয়। ব্যক্তিগত ভাবে সুতির সঙ্গে রুপোর মিশেল আমার ভালো লাগে। এবছর পুজোয় রুপোর সাজ ট্রেন্ডিং। আর বাঙালিদের সাধারণত ত্বকের যেমন রং, গড় উচ্চতা সব মিলিয়ে রুপোর গয়না ভালো মানাবে। গুঁড়ো টিপ বা উঁচু করে টিপ পরুন। ঘন কাজল দিলেই আপনি তৈরি’, বললেন ডিজাইনার।
গলাবন্ধ ব্লাউজ আপনার পছন্দ হলে তার সঙ্গে বড় রুপোর কানের দুল পরুন। অথবা বড় গলার হার পরুন, সঙ্গে কানের ছোট দুল। সেক্ষেত্রে হাতে কিছু পরবেন না। অথবা বড় একটা আংটি দিয়ে সাজতে পারেন। নিশ্চিতার কথায়, ‘অনেকের গলা লম্বা। যাকে আমরা মরাল গ্রীবা বলি। তেমন চেহারা হলে ঝোলা কানের দুল পরুন। তাহলে রোগা দেখতে লাগে। গলাবন্ধ ব্লাউজের সঙ্গে চোকারও ট্রাই করতে পারেন। লম্বা গলার সঙ্গে চুল খুলে রাখলে দেখতে ভালো লাগবে।’
ডিপ নেক ব্লাউজে আপনি স্বচ্ছন্দ হলে শুধু কানের গয়না পরুন। গলা খালি রাখতে অসুবিধে হলে গলার সঙ্গে লেগে থাকা হার পরুন। লম্বা হার এই সাজের সঙ্গে একেবারেই মানাবে না। বরং গলাবন্ধ পোশাক পরলে লম্বা গলার হার পরুন। নিশ্চিতা বুঝিয়ে দিলেন, পোশাক দিয়ে গলা ঢাকা থাকলে লম্বা গলার গয়না মানাবে। কটন ড্রেসের সঙ্গে ব্রাসের কানের দুলও বঙ্গতনয়ারা পছন্দ করেন। প্রজাপতি, মাছ, হাতির ডিজাইনে পাওয়া যায় এই গয়না। আপনার পছন্দমতো বেছে নিন। শাড়ি বা ড্রেসের পাড়ে সোনালি সুতোর কাজ থাকলে টেম্পল জুয়েলারি ব্যবহার করুন। নিশ্চিতার পরামর্শ, ‘সাউথ কটনের শাড়ি বা কুর্তার সঙ্গে সোনার গয়না পরতে পারেন। তবে সাজ যেন কখনও ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে না যায়, তা খেয়াল রাখবেন।’
দিনের বেলা ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা থাকলে হাইনেক পোশাক পরুন। সুতির ড্রেস হতে পারে। শাড়ি পরলে হাইনেক ব্লাউজ ট্রাই করুন। ক্যারি করতে পারলে হাত রাখুন ফুল স্লিভ। এতে রোদ্দুরে পুড়ে ত্বক কালো হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবেন। হাইনেকের সঙ্গে বড় ডায়ালের ঘড়ি পরুন। সেটাই হতে পারে আপনার স্টাইল স্টেটমেন্ট। গলা ফাঁকা রাখুন। শুধু কানের দুল মানাবে ভালো। পোশাক অনুযায়ী মুক্তো বা পাথরের স্টাড পরতে পারেন। অবশ্যই ডার্ক লিপস্টিক ক্যারি করুন। ফুলস্লিভ পোশাকের সঙ্গে বড় আংটি পরেই ভিড়ের মধ্যে আলাদা হয়ে ওঠা যায়।
শাড়ি সামলাতে যাঁরা স্বচ্ছন্দ নন, তাঁরা ঝুঁকি নেবেন না। বরং স্কার্ট টপ, পালাজো, জিন্স শার্টে স্বচ্ছন্দ থাকুন। কারণ পোশাক আরামদায়ক নাহলে সাজলেও সামলাতে পারবেন না। এই ধরনের পোশাকের সঙ্গে লম্বা দুল ট্রাই করুন। গোল, চৌকো, ত্রিভুজ আকারের স্টেটমেন্ট রিংও পরতে পারেন। আর মানানসই হবে নাকছাবি। আম কলকা, চাঁদ, পাতাবাহার, ত্রিশূল, ডমরু, পাখি— নানা ডিজাইনের নোজ রিং এখন কিনতে পাওয়া যায়। সোনা, রুপো ট্রাই না করলেও অক্সিডাইজ পরতে পারেন।
পুজোর দিনে সোনা শুভ। গুরুজনেরা অনেকসময় একথা বলেন। আপনিও সোনার সাজে সাজতে পারেন দুর্গাপুজোয়। অষ্টমীর অঞ্জলিতে শাড়ির সঙ্গে কানপাশা পরতে পারেন, সঙ্গে মফচেন। অথবা হাতের একটা বালাতেই সাজ কমপ্লিট হতে পারে। যদি কুর্তা সালোয়ারে সাজতে চান, সেক্ষেত্রে ছোট্ট ঝুমকো, সরু হার মানাবে। হাতে ব্রেসলেট পরতে পারেন। নবমীর সন্ধের সাজে সিল্কের পোশাকের সঙ্গে কুন্দন জুয়েলারি ট্রাই করুন। ঠাকুর দেখতে বেরনোর পরিকল্পনা থাকলে কম গয়নায় সাজুন, আরামদায়ক হবে। প্যান্ডেলে বা বাড়িতে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় শামিল হলে সুতি, সিল্ক, তসরের পোশাকের সঙ্গে রুপো, সোনা বা ব্রাস জুয়েলারি পরুন। চিরচেনা ব্লাউজের বদলে ট্যাঙ্ক টপ, শার্ট দিয়ে শাড়ি পরলে কড়ি, উল, গামছা দিয়ে তৈরি হ্যান্ডমেড জুয়েলারি পরুন। উল দিয়ে তৈরি চেন খোঁপায় জড়িয়ে নিন। হেয়ারস্টাইল এতটাই আলাদা হবে যে, গয়না পরার প্রয়োজন হবে না।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য