Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ভাড়া করা বিয়ের পোশাক

সেটা ছিল একবিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিক। আমরা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ ক্লাসের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। হঠাৎই একদিন আমাদের এক সহপাঠী গৌরী এসে জানাল তার নাকি বিয়ে!

ভাড়া করা বিয়ের পোশাক
  • ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সেটা ছিল একবিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিক। আমরা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ ক্লাসের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। হঠাৎই একদিন আমাদের এক সহপাঠী গৌরী এসে জানাল তার নাকি বিয়ে! মুম্বইনিবাসী পাত্র, মাত্র এক মাসের ছুটিতে এসেছে কলকাতায়। বিয়েটা সেরেই ফিরবে। সেই প্রথম কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিয়ে, আমাদের মনেও তুমুল উত্তেজনা। কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া, স্ত্রী আচার সব গল্পই উপভোগ করতাম ক্লাসের ফাঁকে। বিয়ের দিন গৌরীর পরনে উঠেছিল একটা টুকটুকে লাল বেনারসি। গোটা শাড়িতে ভরাট জরির নকশা। সঙ্গে শাড়ি থেকে কাটা ম্যাচিং ব্লাউজ। গা-ভরা গয়না ও ফুলের সাজে রাজরানির মতো লাগছিল গৌরীকে। কিন্তু শাড়ির ভার সামলানোই দায় হয়ে যাচ্ছিল প্রায়। বিয়ের পর্ব মিটে গেলে ওই ভারী বেনারসিটা কি আর পরার সুযোগ হয়েছিল গৌরীর কখনো? আমার এই প্রশ্নটার সঠিক কোনো উত্তর পাইনি। তবে পরবর্তীতেও দেখেছি বিয়ে বা বউভাতের বেনারসি কনের পরনে ওঠে ওই একবারই। তারপর তা সযত্নে রেখে দেওয়া হয় আলমারির তাকে। তবু স্মৃতিতে মোড়া বেনারসি যে বিয়ের এক অনবদ্য অঙ্গ, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। হালে বিবাহযোগ্যারা হয়তো বউভাতের পোশাকে সামান্য বদল এনেছেন, কিন্তু বিয়েতে আজও চিরাচরিত বেনারসিই বাঙালি কন্যের পছন্দ।
রীতিমতো ব্যবসা  
তবে এখন আবার অনেকেই বিয়েতে পরার জন্য বেনারসি কিনছেন না। বরং তা ভাড়া করছেন। আর এই বিষয়টি নিয়ে এ যুগের আধুনিকাদের প্রশ্ন করলে তাঁরা বলেন, একটা ভারী বেনারসি যা বিয়ের ওই একদিনের বেশি পরাই হয় না, তার পিছনে পয়সা খরচ করে লাভ কী? বরং সেই টাকায় অন্য কিছুও কেনা যায়। আর বিয়ের শাড়ি এবং সেই সংক্রান্ত স্মৃতির প্রসঙ্গ তুললে তাঁরা আলগোছে বিষয়টা এড়িয়ে যান। কেউ বা বলেন স্মৃতি, সে তো মনের ব্যাপার। কিন্তু বিয়ের দিনের জন্য একটা জমকালো পোশাক চাই তো? সেই পোশাকই এখন ভাড়ায় পাওয়া যায়। শহর কলকাতার নানা অঞ্চলে এই ‘রেন্টাল ওয়েডিং ড্রেস’ বা ভাড়া করা বিয়ের পোশাকের বুটিক তৈরি হয়ে গিয়েছে। এবং তা রীতিমতো ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। 
লাল রঙের চাহিদা
এই প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল ভবানীপুরের ডেট দ্য র‌্যাম্প বুটিকের সঙ্গে। ম্যানেজার সাহবা জানালেন, ‘আমাদের এখানে বাঙালিরা আসেন বউভাতের লেহেঙ্গা ভাড়া করতে। আর অবাঙালিরা তো প্রি-ওয়েডিং থেকে রিসেপশন সব অনুষ্ঠানের জন্যই শাড়ি, কামিজ, গাউন, আনারকলি কুর্তা ‌ইত্যাদি ভাড়া করেন। আজকালকার প্রজন্ম খুবই হিসেবি এবং বাস্তববাদী। অযথা পয়সা খরচ তাঁদের ধাতে নেই। ফলে বিয়ের জাঁকজমক বজায় রাখতে তাঁরা ভাড়া করা পোশাকেই সাজছেন।’ কেমন ধরনের পোশাক পাবেন এই বুটিকে? মূলত ভারী কাজের লেহেঙ্গা, প্রি-ওয়েডিং গাউন, আনারকলি স্যুট ভাড়া পাওয়া যায়। খরচ মোটামুটি ৩০০০ টাকা থেকে শুরু। লেহেঙ্গার ক্ষেত্রে ব্লাউজে ভরাট স্টোন ওয়ার্ক ও তুলনায় প্লেন সিল্কের স্কার্ট নিলে ভাড়া তিন থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া ওড়না সহ লেহেঙ্গার সেট নিলে ভাড়া ৫০০০ টাকা থেকে শুরু। বিয়ের উপযুক্ত লেহেঙ্গার মধ্যে লাল রঙের কদর সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও আছে গোলাপি, নীল ইত্যাদি। বিয়ের জন্য মেয়েরা লেহেঙ্গা, চোলি এবং ওড়না সবেতেই স্টোনওয়ার্ক, জরির নকশা পছন্দ করছেন। ভারী সিল্কের উপর জরির কাজও ব্রাইডাল পোশাকের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়। মূলত লাল রঙের সিল্কই পছন্দ করেন এ যুগের কনেরা। তবে আধুনিক নকশার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে ফ্লোরাল ডিজাইনের তুলনায় স্ট্রাইপ, বা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নকশার কদরই এখন বেশি। 
প্রি-ওয়েডিং ড্রেস
ফুলবাগান অঞ্চলের ড্যাজলিং ড্রেসেস বুটিকে বিয়ের পোশাকের চেয়ে প্রি-ওয়েডিং পোশাকই বেশি পাওয়া যায়। এখানে শাড়িও পাবেন বিভিন্ন ধরনের। আবার এথনিক গাউনও রয়েছে অলওভার কাজ করা। শাড়ির ক্ষেত্রে প্রি-ওয়েডিং হলে জর্জেট, স্যাটিন সিল্ক, শিফন ইত্যাদিরই চাহিদা বেশি। বিয়ের আগে যে ফোটোশ্যুট হয় তাতে অনেক কনেই একাধিক লুক চান। সেই মতো পোশাকও ভাড়া করেন নানারকম। তার মধ্যে একরঙা জর্জেট শাড়ি আর এথনিক গাউনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে শাড়ির ক্ষেত্রে ব্লাউজটা ডিজাইনার হওয়া চাই। স্টোন ওয়ার্ক, জরির কাজ, স্ট্র্যাপ স্লিভস, বেল স্লিভস, অফ শোল্ডার ইত্যাদি নকশায় বানানো হয় ব্লাউজ। আরও আছে এথনিক গাউন। ফুলহাতা গাউনের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। অনেকে আবার তার সঙ্গে সরু ওড়নাও নিতে চান। যাঁরা এথনিক গাউন পছন্দ করেন তাঁরা অনেকেই গোটা গাউনে কাজ চান না। একরঙা গাউনের নীচের দিকে ভারী স্টোনওয়ার্ক, মিরর ওয়ার্ক ইত্যাদি চান। নেকলাইনও একটু ডিজাইনার চাইছেন অনেক কনে। কেউ হয়তো নীচে এবং নেকলাইনে একই ধরনের নকশা পছন্দ করেন। 
স্টোন ওয়ার্ক ও জরির নকশা
বাঙ্গুর অ্যাভিনিউয়ের ওড়নি বুটিকেও ভাড়া পাবেন বিয়ের পোশাক। এখানে শাড়ি এবং লেহেঙ্গার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। শাড়ির মধ্যে টিস্যু, হেভি সিল্ক ইত্যাদির চাহিদা তুঙ্গে। তাঁদের কথায়, প্রি-ওয়েডিং এবং ওয়েডিং এই দুই ভাগে এখানে পোশাক ভাড়া পাওয়া যায়। তার মধ্যে প্রি-ওয়েডিংয়ের ক্ষেত্রে আনারকলি কুর্তা, গাউন বেশি জনপ্রিয়। এছাড়াও ড্রেপ শাড়ি বা কোমরে ইলাস্টিক দেওয়া রেডি টু ওয়্যার শাড়িও পাবেন এখানে। এগুলোও বউয়ের বন্ধু, দিদি, বোন ভাড়া নিতে চান। অল্পবয়সিরা বিশেষত এই ধরনের শাড়ি পছন্দ করে। এগুলো টিস্যু, শিফন, জর্জেট ইত্যাদিতে বেশি পাওয়া যায়। শাড়ির পাড় ও আঁচলে খানিকটা কাজ থাকে আর ব্লাউজে ভারী কাজ থাকে। এই ধরনের শাড়ি কনট্রাস্ট ব্লাউজ দিয়েই পরার চল। স্টোন, সিকুইন আর ভরাট জরির কাজের ব্লাউজ সঙ্গে একরঙা রেডি টু ওয়্যার শাড়ি, এটাই এখন কনের আত্মীয়রা চাইছেন। শাড়ির ভাড়া ২৫০০ টাকা থেকে শুরু। কাজ এবং ফ্যাব্রিকের উপর ভাড়া নির্ভর করে।  
বিয়ের কনের পোশাকের কথাই শুধু বলেছি, বরের পোশাকের কথা বলাই হয়নি। বরের পোশাকও ভাড়া পাবেন এই ধরনের বুটিকে। তবে তাতে খুব একটা বৈচিত্র্য নেই। বাঙালি ধুতি পাঞ্জাবি কেউই ভাড়ায় দেন না। এখানে বিভিন্ন ধরনের শেরওয়ানি স্যুট পাবেন। ভাড়া মোটামুটি ১০০০ টাকা থেকে শুরু। শেরওয়ানি সেট, শেরওয়ানি পাঞ্জাবি, দুপাট্টা সহ শেরওয়ানি সবই পাবেন ভাড়ায়। আপনার পছন্দের উপর নির্ভর করবে দাম। পকেট বুঝে ভাড়া করা পোশাকেই সারতে পারেন বিয়ে।   

Advertisement

কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ