Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

টয় ট্রেনের মহিলা চেকার

প্রথমবার গাড়ি চালিয়ে দার্জিলিং যাব, পাহাড়ে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা তার আগে ছিলই না। কোন পথে গেলে একটু সহজ হবে যাত্রা?

টয় ট্রেনের  মহিলা চেকার
  • ২৮ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ইউনেস্কোর হেরিটেজ, দার্জিলিং টয় ট্রেনের প্রথম মহিলা টিকিট চেকার সরিতা ইয়োলমো। কাজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন তিনি।

Advertisement

প্রথমবার গাড়ি চালিয়ে দার্জিলিং যাব, পাহাড়ে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা তার আগে ছিলই না। কোন পথে গেলে একটু সহজ হবে যাত্রা? অভিজ্ঞ অনেকেই বললেন, হিলকার্ট রোড। ন্যারো গেজ রেললাইনের পাশ দিয়ে আস্তে-ধীরে চলতে চলতেই গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম সেবার। হিলকার্ট রোডে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা চিরস্মরণীয় হয়ে থেকেছে। এ পথে বাঁক ঘুরলে মাঝেমধ্যেই দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার। রং, টুং, সোনাডা সহ বেশ কয়েকটা স্টেশন পেরিয়ে একসময় পৌঁছে গেলাম ঘুম। মেঘাচ্ছন্ন প্রকৃতির মাঝে ব্যস্ত রেল চত্বর। দার্জিলিং স্টেশন থেকে বাতাসিয়া লুপ ঘুরে ঘুম স্টেশনে রোজই পাড়ি জমায় টয় ট্রেন। স্টেশনটি তাই সদাই ব্যস্ত।
টয় ট্রেনের নাম শুনলে মানস ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন আমার মতোই অনেক মানুষ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবেও টয় ট্রেনের গরিমার শেষ নেই। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক মহিলার নাম যুক্ত হয়েছে দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনের সঙ্গে। তিনি পাহাড়ের কন্যা সরিতা ইয়োলমো। সম্প্রতি টয় ট্রেনের প্রথম মহিলা টিকিট চেকার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
সরিতার বাড়ি সোনাডায়। রেল প্রেস দিয়ে চাকরি জীবন শুরু হয়েছিল সরিতার। রেলের ব্রশিয়র, প্রেস বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি লিখতেন তিনি। তারপর কেরিয়ার বদলে হয়ে গেলেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের টিকিট চেকার। সেখানেই বহু বছর কাটিয়েছেন। এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর চাকরি জীবনে এল আর এক বদল। টয় ট্রেনের যাত্রাকালীন টিকিট চেকার হিসেবে যোগ দিলেন তিনি। ইতিহাস গড়লেন হেরিটেজ রেলের প্রথম মহিলা ট্র্যাভেলিং টিকিট চেকার হিসেবে।
কথা হল সরিতা ইয়োলমোর সঙ্গে। বললেন, ‘পাহাড়ে সন্ধ্যাগুলো বড়োই নির্জন। আর সোনাডার মতো ছোটো পাহাড়ি গ্রামে তো আরও নিঝুম হয়ে উঠত সন্ধ্যাগুলো। অনেক সময় এমনও হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে আলো চলে গিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছি আমরা। গ্রামের সরু পাহাড়ি রাস্তা ধরে তখন চলে যেতাম সোনাডা স্টেশনে। রেলগাড়ির ঝমঝম শব্দ শুনলেও মন শান্ত হয়ে যেত। সেই থেকেই ঠিক করেছিলাম রেলে কাজ করব। তাই বলে টয় ট্রেনের প্রথম মহিলা টিকিট চেকার হওয়ার স্বপ্ন আমার মনে লালিত হয়নি কখনো। তবে এই কাজটা পেয়ে আমি গর্বিত।’ 
ন্যারো গেজের পাহাড়ি রেলের সঙ্গে সরিতার বন্ধুত্ব সেই কোন শৈশবে। তাঁদের বাড়ি থেকে অল্পই দূরে ছিল রেল স্টেশন। পাহাড়ি পথে এঁকেবেঁকে রেল লাইন উঠে যেতে দেখে তিনি ভাবতেন, না জানি কোন দূর দেশে চলে যাওয়া যায় এই গাড়ি চড়ে। সেই অজানায় পাড়ি দেওয়ার সুযোগ ছোটোবেলায় পাননি। বরং রেল স্টেশন তাঁর কাছে ছিল এক অন্য অভিজ্ঞতা। কত অচেনা লোকের ভিড় জমত সেখানে, কত চেনা মানুষকে দিনের শেষে ওই রেললাইন ধরে বাড়ি ফিরতে দেখতেন। পর্যটকদের কতই না উল্লাস, ভালোলাগার সাক্ষী ন্যারো গেজের ওই রেললাইন। ট্রেন লাইনের পাশে সকাল বিকেল বাজার বসত। সরিতা মায়ের সঙ্গে সেখান থেকে সবজি কিনতে যেতেন অল্পবয়সে। হেসে বললেন, ‘সবজি বাছাই চলছে, হঠাৎ রীতিমতো হর্ন বাজিয়ে সশব্দে টয় ট্রেন এসে হাজির। তড়িঘড়ি পাততাড়ি গোটাতেন দোকানি। আমরাও খানিক পাশ কাটিয়ে রেলগাড়ির জন্য জায়গা করে দিতাম। আর তখনই রেলের কামড়ায় ভর্তি অচেনা হাসি মুখগুলো দেখে মনে মনে ভাবতাম কে জানে কোন অজানা রা঩জ্যে যাচ্ছে এরা সকলে।’ পরে যখন রেল স্টেশনেই নিজের কাজের সন্ধান করলেন তখনো টয় ট্রেন আর কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানিওয়ালা দার্জিলিং তাঁর কাছে এক অলীক স্বপ্ন হয়েই থেকে গিয়েছিল। সেই ট্রেনে চড়ে যাত্রীদের টিকিট চেকিংয়ের চাকরির সুযোগ তাই লুফে নিয়েছিলেন সরিতা ইয়োলমো। বললেন, ‘ছোটোবেলায় রেলগাড়ির টানে আমি যখন বিভোর হয়ে যেতাম তখন বড়োরা বলতেন, কোনো কিছু মন দিয়ে চাইলে তা পাওয়া যায়। আমার কাছে এই চাকরি সত্যিই স্বপ্নপূরণের মতো।’ 
দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনের বয়স ১৪৫ বছর। এই এতগুলো বছরে প্রথম একজন মহিলা টিকিট চেকার হলেন। তাও আবার এমন কেউ যাঁর যাত্রাকালীন টিকিট চেকিংয়ের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। সুযোগটা প্রায় পড়ে পাওয়া চোদ্দোআনার মতোই এসেছিল তাঁর কাছে, জানালেন সরিতা। হয়তো দীর্ঘদিন রেলে চাকরির অভিজ্ঞতার ফলেই এই সুযোগ পেয়েছেন। তবে এনজেপি স্টেশনের টিকিট পরীক্ষকের পদটি এখনও তাঁরই হেফাজতে রয়েছে। টয় ট্রেনের টিকিট পরীক্ষকের কাজটি তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সরিতা বলেন, ‘প্রথম যখন এই কাজের সুযোগ আসে তখন একটু ভয় লেগেছিল, ট্র্যাভেলিং টিকিট চেকার বা যাত্রাকালীন টিকিট পরীক্ষকের কাজ তো কখনো হাতেকলমে করিনি। যাই হোক, এই রেলের সঙ্গে ছোটোবেলার এত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, যে যাবতীয় দ্বিধা, শঙ্কা দূরে সরিয়ে সম্মত হয়ে গেলাম। অনেক যাত্রা এমন করেছি, যেখানে গোটা যাত্রাপথে আমি একাই টিকিট পরীক্ষকের ভূমিকায়। অসুবিধা কিছুই হয়নি। পর্যটকদের আনন্দে ভরা হাসিখুশি মুখগুলোই আমার এই কাজের বোনাস।’                   
কমলিনী চক্রবর্তী 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ