


মৃণালকান্তি দাস, কলকাতা: ‘নো বোট, নো ভোট’। অর্থাৎ নৌকা নেই, ভোটও নয়—এবারের নির্বাচনে এটাই ছিল নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের অবস্থান। দেশ ছেড়ে চলে আসা শেখ হাসিনাও অডিয়ো বার্তায় দলীয় কর্মীদের দিয়েছিলেন সেই বার্তাই। তবে দলের নেতাদের অনেকের ধারনা, ভোটকেন্দ্রে না যেতে বলা হলেও কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ ভোট দিতে গিয়েছেন। কারও রয়েছে মামলার ভয়, কেউ আবার ভোট দিয়েছেন প্রলোভনে পড়ে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় মূলত লড়াই ছিল বিএনপি এবং জামাত জোটের মধ্যে। ফলে ভোটের হারও ৫৯ শতাংশে আটকে গিয়েছে। এমনই মত শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভোট বিশেষজ্ঞদের থেকে সাধারণের মানুষের গলাতেও। গণঅভ্যুত্থানের পর বিপুল হারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। তারপেও প্রায় ৪১ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণই করল না কেন? এর পিছনে কি হাসিনার ছায়া? শুক্রবার দিনভর তা নিয়ে তুঙ্গে ছিল চর্চা।
নির্বাচন কমিশন ভোট নিয়ে যতই উচ্ছ্বাস দেখান না কেন, এই ভোটে আওয়ামি সমর্থকদের অধিকাংশ যে ভোটকেন্দ্রে যাননি, তা মোট ভোটের হারেই স্পষ্ট। ভোট ভণ্ডুলের কোনো পরিকল্পনা ছিল না আওয়ামি নেতাদের। তবুও নিজের দলের সমর্থকদের মধ্যে নেত্রী হাসিনার প্রতি আস্থা যে এতটুকু টলেনি, তা টের পাওয়া গিয়েছে আওয়ামি লিগের শক্ত ঘাঁটিগুলিতে। হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামি লিগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ায় লক্ষ লক্ষ সমর্থক প্রার্থীহীন হয়ে পড়েছেন এবং অনেকেই ভোট বয়কট করেছেন। নির্বাচনের আগে আওয়ামি লিগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে ভয় দেখানো হয়েছে। তবুও জনগণ এই ‘জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচন’ প্রত্যাখ্যান করেছে, যার প্রমাণ কম ভোটারের উপস্থিতি।
বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ভোটের হার সবচেয়ে বেশি ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে। সেবার ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩। ভোটের হার সবচেয়ে কম ছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ২৬.৫৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচন ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল যথাক্রমে ৭৪.৯৬ ও ৭৫.৫৯ শতাংশ। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে সেই হার ছিল ৮০.২০ শতাংশ। ভোট হারের বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের বড়ো অংশ যোগদানই করেনি। তাই স্পষ্টই বলা যায়, এই ভোটে হাসিনা না থাকলেও তাঁর ছায়া রয়ে গিয়েছে। ভোটার ব্যালটে বহু জায়গাতেই দেখা গিয়েছে, প্রার্থীদের নামের তালিকার শেষের ফাঁকা অংশে দেওয়া হয়েছে সিল। অথবা ‘নো বোট-নো ভোট’ লিখে জমা পড়েছে ব্যালট। এরা যে আওয়ামি সমর্থক, তা স্পষ্টই বলা যায়। অন্যদিকে, এবার আওয়ামি সমর্থকদের মধ্যে যাঁরা ভোট দিতে গিয়েছেন, তাঁরা গণভোটে ‘না’–এর পক্ষে রায় দিয়েছেন। আর তাই আওয়ামি ঘাঁটি গোপালগঞ্জের তিন আসনে ‘না’ ভোটের জয়জয়কার।