‘অন্দরমহল’ নতুন করে সেজে উঠেছে। শুরু হয়েছে এই নতুন বিভাগ। সেখানে কলম ধরলেন ‘ওল্ডিস কিচেন’ খ্যাত ঊষা বিষয়ী। প্রতি মাসের একটি শনিবার তিনি পাঠকদের হদিশ দেবেন বাংলার একটি প্রাচীন রান্নার, যা মা-ঠাকুরমাদের হাতের গুণে হয়ে উঠত অনবদ্য। সঙ্গে থাকবে সেই রান্না নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু স্মৃতি ও রেসিপি।
বাঙালির রান্নাঘরে চিংড়ি মানেই যেন স্বাদের এক আলাদা অধ্যায়। সরষে, নারকেল, পোস্ত কিংবা মশলার নানা মিশেলে চিংড়ি বারবার পেয়েছে নতুন রূপ। সেই পরিচিত স্বাদের ভিড়েই কিছু পদ আজও বহন করে চলেছে পুরানো দিনের রান্নার স্মৃতি। তেলানি চিংড়ি তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী পদ— সহজ উপকরণ, স্বতন্ত্র রান্নার কৌশল আর চিংড়ির নিজস্ব স্বাদকে সামনে রেখে তৈরি এই রান্না। সময়ের সঙ্গে রান্নাঘরের ধরন বদলেছে, মশলার ব্যবহার বদলেছে, কিন্তু তেলানি চিংড়ির মতো পদে বাঙালির ঘরোয়া রন্ধন ঐতিহ্যের সেই পুরানো স্বাদ এখনও টিকে রয়েছে।
আগেকার দিনে আমাদের বাড়িতে রান্নার জন্য মাটির বিভিন্ন ধরনের পাত্র ব্যবহার করা হত। তারই মধ্যে একটি ছিল মাটির তেলানি। দেখতে অনেকটা কড়াইয়ের মতো, কিন্তু তার কোনো হাতল থাকত না।
আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় এই মাটির পাত্রকেই বলা হয় ‘তেলানি’। চিংড়ির মালাইকারি কিংবা চিংড়ির আরও চেনা-পরিচিত রান্না এতে হত। কিন্তু একই স্বাদের রান্না বারবার খেতে খেতে একসময় একঘেয়েমি চলে আসত। তখন আমার ঠাকুরমা-শাশুড়ি একটু অন্যরকমভাবে চিংড়ি রান্না করতেন। একই চিংড়ি, একই সংসারের রান্নাঘর, অথচ স্বাদে একটু বদল আনার ইচ্ছা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই রান্না। আর সেই রান্নাটি বিশেষভাবে তৈরি হত মাটির তেলানিতে। মাটির পাত্রে ধীরে ধীরে রান্না হওয়ার কারণে এর স্বাদে একটা আলাদা মাধুর্য তৈরি হত। সেই মাটির পাত্রটিকে ঘিরেই রান্নাটির নাম হয়ে উঠেছিল তেলানি চিংড়ি।
আজ সেই পুরানো দিনের মাটির তেলানিতে রান্না করার অভ্যাস অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই পাত্রে তৈরি রান্নার স্মৃতি এবং স্বাদ আমাদের পরিবারের মধ্যে রয়ে গিয়েছে। পুরানো দিনের রান্নাটিকে তাই আমরা নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিতে চাই। তাই এবার চিংড়ির এই রেসিপি দিলাম। চেনা ছকের চিংড়ি রান্নার মতো এই রান্নাটি তেমন প্রচলিত না হলেও গ্রামগঞ্জে এর কদরই আলাদা।
তেলানি চিংড়ি
উপকরণ: বড়ো গলদা/বাগদা চিংড়ি ৬টি (প্রায় ৫০০ গ্রাম), নারকেল ১টি ছোটো, পেঁয়াজ কুচি ২টি মাঝারি, টম্যাটো কুচি ১টি মাঝারি, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রশুন বাটা ১ টেবিল চামচ, গোটা গরমমশলা ১ চা চামচ, লংকা গুঁড়ো ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি চা চামচ, সরষের তেল ৪ টেবিল চামচ, জল ১ কাপ।
প্রণালী: চিংড়ি ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন। সামান্য নুন ও হলুদ মাখিয়ে রেখে দিন। নারকেল ফাটিয়ে ভিতরের শক্ত অংশ থেকে ছোটো ছোটো পাতলা টুকরো করে কেটে রাখুন। কড়াই বা তেলানিতে সরষের তেল গরম করে গোটা গরমমশলা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা বাদামি করে ভেজে নিন। এরপর আদা বাটা, রশুন বাটা ও টম্যাটো কুচি দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিন। টম্যাটো নরম হয়ে এলে লংকা গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো ও নুন দিয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়া পর্যন্ত কষিয়ে নিন। মশলা ভাজা হয়ে গেলে নামিয়ে, সামান্য ঠান্ডা করে মিক্সিতে অল্প জল দিয়ে মিহি পেস্ট করে নিন। এবার তেলানিতে সামান্য সরষের তেল দিয়ে নারকেলের পাতলা কুচিগুলো হালকা লালচে করে ভেজে তুলে রাখুন। তেলানিতে তৈরি মশলার পেস্ট দিয়ে তার মধ্যে নুন-হলুদ মাখানো চিংড়িগুলো সাজিয়ে দিন। মশলার সঙ্গে মাছ ভালোভাবে মিশিয়ে ঢেকে কম আঁচে প্রায় ১০ মিনিট রান্না করুন। এরপর ঢাকনা খুলে প্রয়োজন মতো সামান্য জল দিয়ে ঝোলের পরিমাণ ঠিক করে নিন। সবশেষে ভেজে রাখা নারকেল কুচি ও সামান্য চিনি ছড়িয়ে দিন। আরও কিছুক্ষণ হালকা আঁচে ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন ঐতিহ্যবাহী তেলানি চিংড়ি।