কুমুদিনীর মাছের দম
কিছু রান্না শুধুই রসনাতৃপ্তির উপকরণ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যের নানা অধ্যায়। তেমনই এক বিশেষ পদ কুমুদিনীর মাছের দম। এই রান্নার সূত্র ধরে আসে বিশিষ্ট সমাজসেবী রণদাপ্রসাদ সাহার জীবন, তাঁর কর্মযজ্ঞ এবং কুমুদিনী গোষ্ঠীর ইতিহাস। মানুষের সেবা ও সমাজকল্যাণের আদর্শকে সামনে রেখে তিনি যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক পরিবারের আত্মত্যাগ ও লড়াইয়ের কাহিনিও।
১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রণদাপ্রসাদ সাহা ও তাঁর পুত্র ভবানীপ্রসাদ সাহাকে গ্রেপ্তার করে। তারপর থেকে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এমন এক কঠিন সময়ে কুমুদিনী গোষ্ঠীর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন ভবানীপ্রসাদ সাহার স্ত্রী। একদিকে সন্তানকে বড় করে তোলা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া— দুই দায়িত্বই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সংস্থার কাজ থেমে থাকেনি। বর্তমানে তাঁর পুত্র রাজীব সাহা ও তিনি কুমুদিনী গোষ্ঠীর দুই প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কুমুদিনীর মাছের দমও যেন এক বিশেষ ঐতিহ্যের স্বাদ বহন করে। বড়ো কাতলা কিংবা রুই মাছের পেটি, দই, মৌরি বাটা ও শুকনো লংকা বাটার মেলবন্ধনে তৈরি হয় এই পদ। রান্নায় ঝালের মাত্রা ও মশলার ভারসাম্য বজায় রাখাই এর বিশেষত্ব। সবশেষে ঘি ছড়িয়ে ঢেকে দমে বসালে মাছ ও মশলার স্বাদ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। তৈরি হয় সুগন্ধি, মশলাদার এমন এক পদ, যা সাদা ভাতের সঙ্গে যেমন উপাদেয়, তেমনই পোলাওয়ের সঙ্গেও দিব্য মানিয়ে যায়।
উপকরণ: বড়ো কাতলা বা রুই মাছের পেটি ৬টি, আলু ২টি, সরষের তেল পরিমাণ মতো, ঘি ২ টেবিল চামচ, নুন ও হলুদ পরিমাণ মতো, এলাচ ৪-৫টি, লবঙ্গ ৬-৭টি, দারচিনি ২ ইঞ্চি, তেজপাতা ২-৩টি, শুকনো লংকা বাটা ২ চা চামচ, মৌরি বাটা ২ চা চামচ, টক দই ১ কাপ, মিষ্টি দই আধ কাপের একটু বেশি, কাঁচালংকা কয়েকটি, শুকনো লংকা কয়েকটি, সামান্য জল।
প্রণালী: মাছের পেটিগুলিতে নুন ও হলুদ মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। কড়াইয়ে সরষের তেল ও সামান্য ঘি গরম করে মাছের পেটিগুলি হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে গোল করে ও সামান্য চ্যাপ্টা করে কাটা আলু নুন-হলুদ মাখিয়ে লালচে করে ভেজে নিন। এবার এলাচ, লবঙ্গ ও দারচিনি একটু থেঁতো করে নিন। কড়াইয়ে অবশিষ্ট তেল ও ঘিয়ের মধ্যে তেজপাতা এবং থেঁতো করা গরমমশলা ফোড়ন দিন। সুগন্ধ বেরলে শুকনো লংকা বাটা, সামান্য হলুদ ও মৌরি বাটা দিয়ে অল্প জল ছিটিয়ে ভালো করে কষুন। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে আগে থেকে ভালো করে ফেটিয়ে রাখা টক দই ও মিষ্টি দই দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে অনবরত নাড়তে থাকুন, যাতে দই কেটে না যায় এবং মশলার সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যায়। মশলা কষানো হলে ভেজে রাখা আলু দিয়ে দিন। ঝোল ফুটতে শুরু করলে আলতো করে মাছের পেটিগুলি সাজিয়ে দিন। স্বাদমতো নুন মিশিয়ে চেরা কাঁচালংকা ও ইচ্ছেমতো কয়েকটি শুকনো লংকা যোগ করুন। আঁচ কমিয়ে কড়াইয়ের ঢাকা বন্ধ করে ৫-৭ মিনিট দমে বসিয়ে রাখুন। এতে মাছ, আলু ও মশলার স্বাদ একসঙ্গে মিশে যাবে। নির্দিষ্ট সময় পরে ঢাকা খুলে উপর থেকে বাকি ঘি ছড়িয়ে দিন। তৈরি কুমুদিনীর মাছের দম। গরম সাদা ভাত কিংবা সুগন্ধি পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন এই ঐতিহ্যবাহী পদ।



