বাবার থেকেই রান্না শিখেছি
বাবার থেকেই রান্না শিখেছি
অংশু মল্লিক (এগজিকিউটিভ ডেপুটি চেয়ারম্যান অব এডব্লুএল এগরি বিজনেস লিমিটেড)_
বাবা আমার জীবনে বটগাছের মতো। আজ যা কিছু শিখেছি, সবেতেই বাবার অনেকখানি অবদান। বাবা বঙ্কুবিহারী মল্লিক আমার জীবনের আদর্শ পুরুষ। ছোটোবেলায় নাসিকে থাকতাম। ওখানেই জন্মেছি, বড় হয়েছি। প্রায় ৬৫ বছর আগে কর্মসূত্রে বাবা ওখানে চলে যান। বাবা পড়াশোনার উপর খুব জোর দিতেন। মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, এই বোধ তৈরি করে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন ভোর চারটে বাজলেই ঘুম থেকে তুলে দিতেন। তিন ভাইবোন পড়তে বসতাম। কোনো বিলাসিতা নয়, বরং হাতে সেলাই করে খাতা তৈরি করে দিতেন। বইখাতায় মলাটও দিয়ে দিতেন। বাবার কাছ থেকে যা শিক্ষা পেয়েছি, সেসব অন্য কোনো জায়গা থেকে পেতাম বলে মনে হয় না। বাবা খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। কোনো দেখনদারি দেখিনি। সাইকেল চালিয়ে বাজারে যেতেন। বাড়ির কাছেই অফিস ছিল। হেঁটেই যেতেন। নিয়মানুবর্তিতাও শিখেছি বাবার থেকে। ‘সময়ের মূল্য দিতে শেখো’— বাবার সেই শিক্ষা আমি আজও মেনে চলি। নিজের কাজ নিজে করতে হবে, ছোটো থেকে এটাই শিখিয়েছেন। আমরা তিন ভাইবোন স্কুলের ইউনিফর্ম নিজেরা কেচে ইস্ত্রি করতাম। প্রতি রবিবার জুতো পালিশ করে রোদে দিতাম। বাড়ি পরিষ্কার করার দায়িত্ব একদিন আমার, পরেরদিন দাদার। রান্নাও করতে শিখেছি বাবার কাছে। মায়ের অ্যালার্জির সমস্যা ছিল। তাই বাবা মাঝেমধ্যে রান্না করতেন। অফিস থেকে এসে আটা মাখতেন, রুটি করতেন। আমরা সবজি কেটে দিতাম। সবজি কাটাও তো একটা শিল্প! কোন সবজি কীভাবে কাটব, তিনি তা হাতে ধরে শিখিয়েছেন। চিংড়ি মাছ বেছে রাখা, ছোটো মাছের আঁশ ছাড়ানো সবই শিখেছি। কলকাতায় যখন কেরিয়ার শুরু করি, নিজেই রান্না করতাম। আজও নিজের সব কাজ নিজে করতে পারি। অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়েই জীবন কাটাতে শিখিয়েছেন। শৈশবের শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজও নিজের ব্যাগ নিজে নিয়ে অফিসে ঢুকি। সহকারীর প্রয়োজন হয় না। বাবার থেকেই জীবনের সব জরুরি শিক্ষা পেয়েছি ।
সন্তানের উপর খুব ভরসা করতেন
হর্ষবর্ধন নেওটিয়া (চেয়ারম্যান, অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপ)
বাবা। এই সম্পর্কের অনুভূতি, মায়া, আশ্রয়, স্নেহের কোনো তুলনা হয় না। এখন জীবনের প্রতি পদে বাবার মূল্য বুঝতে পারি। আমার বাবা বিনোদকুমার নেওটিয়া অত্যন্ত গুণী মানুষ ছিলেন। বাবার থেকে বেশি দয়ালু, বেশি ভালোবাসতে পারেন এমন মানুষ আমি আর দেখিনি। এটা শুধু আমি বলছি না। বাবার বন্ধু, কাজের জগতের মানুষ, আমাদের বৃহত্তর পরিবার— সকলেই একই কথা বলবেন। সকলের প্রতি বাবার সমান ভালোবাসা ছিল। এই মানুষটিকে ‘বাবা’ হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য। ছোটোবেলায় যত বকুনি খেয়েছি, সবই মায়ের কাছে। বাবা খুব একটা বকতেন না। শান্ত স্বভাবের ছিলেন। কোনো কিছু ভুল করলে, গল্প করে বোঝাতেন। বলতেন, এরকম না করলেই ভালো। বাবার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ চাইতাম। যখন কাজ শুরু করলাম, প্রথমদিকে অনেক পরামর্শ দিতেন। ধীরে ধীরে আমার উপর ভরসা তৈরি হল। বললেন, নিজের মতো করো। কোনো সমস্যা হলে আমি দেখিয়ে দেব। আমার উপর কোনোদিন কিছু চাপিয়ে দেননি। কখনো বলেননি, ‘এই বিষয় নিয়েই পড়তে হবে, না পড়লে সমস্যা হবে...।’ বরং বলতেন, নিজের মতো করে চেষ্টা করো। বরং মা জানতে চাইতেন, ভবিষ্যতে কী করব। যদিও মা-ও কখনো কিছু চাপিয়ে দেননি। বাবা সবসময় নিজের মতো ভাবার স্বাধীনতা দিতেন। দিলদরিয়া, খোলা মনের মানুষ ছিলেন। উনি ভাবতেন, সন্তানের উপর ভরসা করতে হবে। ওরা ঠিক নিজের মতো ভালো কিছুই করবে। বাবা আমার সঙ্গে যা যা করেছেন, আমি বোধহয় সন্তানদের জন্য তেমন আচরণ করতে পারিনি। । না, তাঁর সঙ্গে নিজের তুলনা করছি না। সেটা সম্ভবও নয়। তবে আমিও নিজের মতো সন্তানদের পারিবারিক মূল্যবোধ শেখানোর চেষ্টা করেছি। আর ‘ফাদার্স ডে’? এসব আগে জানতামই না। এখন ফ্যামিলি গ্রুপে বাচ্চারা পোস্ট করে। তখন খেয়াল হয়, আজ তবে ফাদার্স ডে! আসলে বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক এতই গভীর, একটা দিনের সেলিব্রেশনে কীই বা আসে যায়?
এখন বুঝি বাবার শাসন কতটা কাজে লেগেছে
ধীমান দাশ (কর্ণধার, কে সি দাশ)
ধীরেন্দ্রনাথ দাশ। আমার বাবা। শ্যুটিংয়ে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন। দারুণ পিয়ানো বাজাতেন। আর ব্যবসা তো ছিলই। সকলের সঙ্গে মিশতেন। যাকে বলে দিলখোলা মানুষ। ছোটো থেকেই দেখেছি বাবার প্রচুর বন্ধু। নামজাদা লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল। পিকনিকে যেতেন। উত্তর কলকাতার রাইফেল ক্লাবে আমাকে ছোটোবেলায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন। জানেন, বাবার কাছে প্রচুর মার খেয়েছি। এখনকার বাচ্চাদের বেলায় যদিও সেসব একেবারে বন্ধ। একমাত্র সন্তান, গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। আমাদের আবার উলটো ছিল। প্রচণ্ড মারধর খেয়েছি। বাবা বলতেন, তা না হলে মানুষ হওয়া যায় না। তখন রাগ হত। এখন বুঝি, ওই শাসন কতটা কাজে লেগেছে। ভয়ানক দুষ্টু ছিলাম। স্কুলে দুষ্টুমি করে পড়ে গিয়ে দাঁত-মুখ ফাটিয়ে এলাম। বাবা কী করলেন জানেন? তার উপরেই মারলেন। কেন ওটা হয়েছে? ডাবল আঘাত। আরে, মাও বাবাকে সাপোর্ট করতেন! এসব সময় আমাকে রক্ষা করতেন ঠাকুরমা। যত আবদার ছিল তাঁর কাছেই। বাবা মানেই নিয়মানুবর্তিতা, শাসন। তার মধ্যেই আবার বড়ো হয়ে ওঠার জন্য যা যা দরকার, তা করতেন। আমার দাঁতের সমস্যা ছিল। উঁচু ছিল দাঁত। প্রতিদিন সেটা ঠিক করতে নিয়ে যেতেন। খুব খেয়াল রাখতেন, কিন্তু কোনোদিন হাতে পকেটমানি দেননি। প্রথম থেকেই কে সি দাশ আমাদের যৌথ ব্যবসা ছিল। কিন্তু বাবার রেকটিফায়েড স্পিরিটের নিজস্ব ব্যবসা ছিল। আমাদের উৎপত্তি নবীনচন্দ্র দাশের হাত ধরে। সেই দোকান ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। আর খোলেনি। তারপর থেকেই কে সি দাশের পরিচিতি। আটের দশকের মাঝামাঝি বাবার মনে হল, নবীন চন্দ্র দাশের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর নাম দিয়েও একটা দোকান করা উচিত। ১৯৮৬ সালের ১১ মে, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন বাগবাজারে সেই দোকান করলেন। আমি তখন চোদ্দো। প্রথম দিন থেকেই আমাকে দোকানে বসিয়ে দিলেন। বছর খানেক পর থেকে দোকান আমার উপর ছেড়ে কলকাতার বাইরে কাজে চলে যেতেন। আমাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন। বাবা, ঠাকুরদা সকলকেই ডায়েট করতে দেখেছি। বাড়ির খাবার খেতেন। নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে শুধু জল! নীরবে বাবা যে কত মানুষকে সাহায্য করেছেন, আমরা অনেক পরে তার হদিশ পেয়েছি! উদয় শঙ্করের শেষজীবনটুকু বাবাই দেখাশোনা করেছেন। আর্থিক সাহায্য করেছেন। বাবা কখনো এসব বলেননি। তবে ডায়েরি লিখতেন। যা খরচ করতেন, তা ছোটো ছোটো স্লিপে লিখে রাখতেন। সেখান থেকে পরে আমরা জানতে পারি। কোনোদিন এসব নিয়ে গল্প করতে দেখিনি।
ব্যবসায় আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছেন
রচিতা দে (ডিরেক্টর, শ্রীলেদার্স লিমিটেড এবং হাউজ অব এসএল-এর প্রতিষ্ঠাতা)
আমার বাবা সত্যব্রত দে একেবারে শিশুর মতো। আমার আর ভাইয়ের জীবনে তাঁর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাজের বাইরে আমাদের সময় দিয়েছেন। কোনো পেরেন্ট টিচার মিটিং মিস করেননি। আমি নাচ করতাম। কোনো শো-এ বাবা যাননি, এমন হয়নি। আমাকে কখনো বকেননি। বরং আমি দুষ্টুমি করলে মায়ের বকুনির হাত থেকে রক্ষা করতেন। উল্টে দুষ্টুমি করতে উৎসাহ দিতেন। এখনও বছরে একটা ট্রিপ বাবা অর্গানাইজ করেন। সে সময়ে ব্যবসার কোনো কথা আমাদের হয় না। ব্যবসার জায়গায় বাবা আমার ‘বস’। ২০১৮-র পর এমবিএ করে আমি পুরোপুরি ব্যবসায় যোগ দিয়েছি। কিন্তু ছোটো থেকেই স্টোরে যেতাম। কারণ মা, বাবা দু’জনেই ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। আগে দায়িত্ব ছিল না। পরে দায়িত্ব এল। তখন অনেক অভিযোগ থাকত। অন্য কোম্পানির এত মার্কেটিং বাজেট, আমাদের নেই কেন? আমাদের এটা নেই, সেটা নেই। বাবা বলতেন, ‘যেটা নেই, সেটা ভুলে যাও। কী আছে, সেটা দেখো। তোমার কাছে অনেক কিছু আছে, যেটা অন্যদের কাছে নেই।’ আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছেন। আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন। ভাবতাম, এত সীমাবদ্ধতার মধ্যে কীভাবে কাজ করব? কিন্তু বাবার মতো অন্য কেউ অনুপ্রেরণা দিতে পারবে না। আমাদের কিন্তু মতবিরোধও হয়। তিনি একটা ধরন মেনে কাজ করতে চাইছেন, আমি হয়তো একই কাজ অন্যভাবে করতে চাইছি। তর্কও হয়। কিছুক্ষণ পরে বাবাই বোঝান। বলেন, ‘অনেকে পরামর্শ দেবে। সকলের কথা শোনো। কিন্তু নিজে যেটা চাও, সেটাই করো। যেটা ভালোবেসে করতে পারবে, সেটাই করো।’