পক্ষে
পক্ষে
দিশা বিশ্বাস
এখন যত পরিমাণে পুরনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে, তা দেখে নিশ্চিত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ফ্ল্যাটই সম্বল। এখন নিজেদের কাজের সুবিধার্থে অনেকেই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অথবা কিনে সেখানে বসবাস করছে। বাড়ি বানানো দীর্ঘ সময়ের কাজ। জমি কিনে বাড়ি বানানো অনেক ব্যয়বহুল। তার থেকে স্বল্প খরচে ফ্ল্যাটই বিকল্প। নিজেদের সুবিধার্থে আমরা নিজেরাই এই বিকল্প গ্রহণ করেছি।
স্কুল ছাত্রী
অরুণ গুপ্ত
নতুন প্রজন্মের কাছে নিজস্ব বাড়ির থেকে ফ্ল্যাট বেশি পছন্দের। এর কারণ একান্নবর্তী পরিবারের অবসান ও অণু পরিবারের জন্ম। বর্তমানে শহরে জমির অভাব ও আকাশছোঁয়া দাম, তুলনায় ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সহজ কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনার সুবিধা। নিজস্ব বাড়ির তুলনায় ফ্ল্যাট রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কম, সাধারণত ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী
সোহিনী রায়চৌধুরী
একসময় নিজের জমিতে বাড়ি নির্মাণ ছিল মানুষের বড় স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তব বদলেছে। আজকের প্রজন্মের কাছে ফ্ল্যাটই নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত আশ্রয়। শহরে জমির দাম বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্তের পক্ষে আলাদা বাড়ি তৈরি করা কঠিন, তাই ফ্ল্যাটই তুলনামূলক সাশ্রয়ী সমাধান। নিউক্লিয়ার পরিবারের বৃদ্ধি ও কর্মজীবনের কারণে ফ্ল্যাটের চাহিদা বেড়েছে। আধুনিক প্রজন্ম বড়ো বাড়ির চেয়ে স্বাধীনতা, সুযোগ ও সম্ভাবনাকেই বেশি মূল্য দেয়।
শিক্ষিকা
সুদীপ কর
নতুন প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। জমি কিনে বাড়ি বানানোর সময় ও ধৈর্য নেই। শরীর বিশ্রাম চাইলেও যেমন ঘুম থেকে উঠে একটুও না হেঁটে ল্যাপটপ নিয়ে বসতে হয়, তেমনই নির্দিষ্ট মাপের ফ্ল্যাটে আবেগ ও অনুভূতিকে সংযত রাখতেই তারা অভ্যস্ত। পুরনো বাড়ি প্রোমোটারকে দিয়ে অনেকের কাছে এখন ফ্ল্যাটই সম্বল। যা শখের হোক বা না হোক— আভিজাত্যের পরিচায়ক। তাছাড়া নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া কঠিন। তুলনায় ফ্ল্যাট পরিবর্তন করা সহজ।
মনোবিদ
বিপক্ষে
আম্রপালি দত্ত
শিকড়ের টানকে অস্বীকার করা দুঃসাধ্য। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের একজনকে সুপ্রতিষ্ঠিত, সুশিক্ষিত ও সামাজিক সুরক্ষায় আবৃত করতে এখন অণুপরিবারগুলো পরমাণুতে পর্যবসিত হয়। বটবৃক্ষের মতো বাড়ির ছত্রছায়া থেকে হঠাৎ করেই নির্বাসন হয় দু’কামরার ছোট্টো ফ্ল্যাটে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আত্মীয়তা ও যৌথ পারিবারিক সংস্কৃতি। তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার’ পরিবার আপাতদৃষ্টিতে সুখী হলেও বড্ড নিঃসঙ্গ। বর্তমান প্রজন্ম সুসজ্জিত ফ্ল্যাটে থাকলেও মানসিক নিরাপত্তা পায় কি? নিজ বাসগৃহর তাই কোনো বিকল্প নেই।
প্রধান শিক্ষিকা
আয়ুষ দাস
স্মৃতি আর শিকড় দিয়ে তৈরি হয় ঘর। ঠাকুরমার গল্প, রোদে দেওয়া মায়ের আচার, বারান্দায় বাবার সাইকেল — এই চেনা জিনিসগুলো ফ্ল্যাটে নেই। সেখানে শুধু নিষ্প্রাণ দেওয়াল আর নিয়মের কড়াকড়ি। শৈশব মানে স্কুল ফেরত ধুলো মাখা ক্রিকেট মাঠ, যা ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে বিলুপ্ত। স্থানাভাব বা টাকার সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু ফ্ল্যাটকে ‘সম্বল’ বলা যায় না। বাড়ি মানে স্বপ্ন, যা বাঁচার রসদ জোগায়। স্বপ্ন বেচে দিলে আত্মিক বিকাশ থেমে যায়। ফ্ল্যাট ভবিতব্য হতে পারে, সম্বল নয় — এক কঠিন বাধ্যতা।
নবম শ্রেণির ছাত্র
ইন্দ্রাণী দাস
ফ্ল্যাটে যে যার মতো বন্দি, যেন একটা আস্ত জেল। নেই খোলা হাওয়া, নেই পাড়ার বন্ধু। অতিথি এলে জবাবদিহি করতে হয়। সোসাইটির নিয়ম আর মেইনটেন্যান্সের খরচ লেগেই থাকে। অথচ নিজের বাড়িতে কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই, আছে অনেকটা আনন্দ। ছাদ, বাগান, স্বাধীনতা সবই নিজের। বাড়ি মানে শিকড়। আজও বহু তরুণ বাড়ির স্বপ্ন দেখে। তাই ফ্ল্যাটকে ‘সম্বল’ বলা নতুন প্রজন্মের ইচ্ছাকে অপমান করা।
বিউটিশিয়ান
শংকর সাহা
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন বদল হয়েছে অনেক কিছুর। তবে তার মাঝেও হয়তো আমাদের শেকড়কে আমরা আজও ভুলিনি। আজ শহরে বড়ো বড়ো ফ্ল্যাট গড়ে উঠেছে। হয়তো এখনও সকলের মনে এই ছোট্ট শব্দটি সেভাবে স্পর্শ করতে পারেনি। এখনও অনেকে বাড়িকেই বেছে নিয়েছেন। নিজের স্বপ্নের বাড়ি বানানোর ইচ্ছে অনেকেরই থাকে যা তারা ‘ফ্ল্যাট’ এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যে খুঁজে পান না। শহরের বুক চিরে মস্ত বড়ো বড়ো ফ্ল্যাট গড়ে উঠলেও আজও বাড়ির সুখকর অনুভূতিটুকু হারিয়ে যায়নি।
শিক্ষক