জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যবসা করে সাফল্য পেয়েছেন আসমা খান। বিদেশে ভারতীয় রেস্তরাঁ চালান তিনি। আর তাঁর হেঁশেলের কর্মচারী সবাই মহিলা।
জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যবসা করে সাফল্য পেয়েছেন আসমা খান। বিদেশে ভারতীয় রেস্তরাঁ চালান তিনি। আর তাঁর হেঁশেলের কর্মচারী সবাই মহিলা।
আসমা খান— রেস্তরাঁ জগতে নামটা এখন বেশ পরিচিত। লন্ডনে তাঁর রেস্তরাঁ ‘দার্জিলিং এক্সপ্রেস’-এ ঘুরে গিয়েছেন ব্রিটেনের রাজা চার্লস! পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে জীবনটা বদলে ফেলার ইচ্ছে হয় আসমার। ছিলেন উকিল, হয়ে গেলেন রেস্তরাঁর মালকিন। তাঁর রেস্তরাঁয় কিচেনের দায়িত্ব সামলান একদল মহিলা। বাড়ির হেঁশেল ঠেলার কাজে মহিলারা যতই স্বচ্ছন্দ হোন না কেন, রেস্তরাঁর কিচেনে এখনও পুরুষদেরই আধিপত্য। ফলে ‘অল উইমেন’স কিচেন’ আজও রেস্তরাঁ জগতে নতুন কনসেপ্ট। ওকালতি থেকে রেস্তরাঁর মালকিন— যাত্রাপথের গল্পটা উঠে এল তাঁর মুখেই।
একলা চলো রে
‘রবি ঠাকুরের এই গানই আমার অনুপ্রেরণা’, বলছিলেন আসমা। পথ যখন কঠিন হয়ে ওঠে, কোথাও কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না, তখনই এই গানটা মন্ত্রের মতো জপতে থাকেন মনে মনে। বললেন, ‘এটা আমার জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। ওকালতি নিয়ে গবেষণা করার পর হাউস অব লর্ডস-এ চাকরির সুযোগ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করি। জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসটা নিজের মতো করে গড়তে চেয়েছিলাম। আর সেই যাত্রাপথে সঙ্গে ছিলেন আমারই কিছু প্রতিবেশী। বিদেশের ‘ইন্ডিয়ান কমিউনিটি’-র মহিলারা। আমরা বাড়ির রান্নাঘরে চমক দিতে পেরেছিলাম। নিত্যনতুন পদ বানিয়ে হোম ডেলিভারি করতাম। আমার প্রতিবেশী মহিলারা আমার কাছেই রান্নার পাঠ নিয়েছেন। তারপর ভাবলাম রান্নার ব্যবসাটাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা। আর তখন তাঁদেরই আমার সহকারী করে তুললাম।’ রান্নার ব্যবসা যতদিন বাড়ির হেঁশেলে সীমাবদ্ধ ছিল, মহিলা সহকারীতে কারও আপত্তি ওঠেনি। যেই না রেস্তরাঁর তকমা লাগালাম ব্যবসায়, তখনই গেল গেল রব তুললেন সবাই। বিদ্বজ্জনরা বললেন রেস্তরাঁর কিচেনের ভারী কাজ মহিলাদের দিয়ে চালানো অসম্ভব। এ ব্যবসা সাতদিনও টিকবে না। কিন্তু তাঁদের সকলের মুখে ছাই দিয়ে এক যুগ পেরিয়েও আসমা খানের দার্জিলিং এক্সপ্রেস প্রবাসীদের মধ্যে তো বটেই, এমনকী বিদেশি খাদ্যরসিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
মহিলাচালিত কিচেন
পাশ্চাত্য দুনিয়া কিছু বাঁধাধরা ধারণা নিয়ে চলে। অমুক কাজের জন্য তমুক লোকটিই শ্রেষ্ঠ, তার বাইরে কিছু ভাবতে গেলেই কটাক্ষের মুখে পড়তে হবে। আসমার কথায়, ‘বিদেশি রেস্তরাঁয় মহিলাদের কখনওই হেড শেফ হতে দেখবেন না। তাঁদের প্রথম থেকেই সাইডলাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। পেস্ট্রি শেফ পর্যন্ত তাঁদের দৌড়। ওই বিভাগেই তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নাহলে ওয়েট্রেস। রেস্তরাঁর ম্যানেজার পদে মহিলাদের দেখা যায় না বিশেষ।’ ফলে ছক ভাঙা সহজ ছিল না। কিন্তু আসমার উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা বলছিল হেঁশেল ঠেলতে মহিলাদের জুড়ি মেলা ভার। তাঁরা কোনও কাজে পিছপা হন না, তা নিয়ে দশরকম প্রশ্ন তোলেন না, যে কোনও কাজ করতেই এগিয়ে আসেন হাসিমুখে। ঘরে বাইরে চুপচাপ কাজ করেন, কোনও প্রশংসার আশাও করেন না। ফলে রেস্তরাঁর রান্নাঘর সামলাতেও এহেন মহিলাদের কেন নেওয়া হবে না? প্রশ্নাতীতভাবে তিনি নিজের মহিলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে কাজে নেমে পড়লেন। বললেন, ‘আমার কিচেনে মহিলাদের প্রথম রাঁধুনির সম্মান দিলাম। তাঁদের শেফ’স কোট বানিয়ে দিলাম। ওই নাম লেখা কোটটাই তাঁদের পরিচয় হয়ে উঠল। রেস্তরাঁর ভিতরে এবং বাইরে লোকে তাঁদের চিনতে শুরু করল। যোগ্য সম্মান পেলেন আমার ‘কিচেন কুইন’রা। ‘রাঁধুনি’ থেকে ‘শেফ’ হয়ে উঠলেন।
কাজটা সহজ ছিল না
আসমার কথায়, ‘পুরুষশাসিত সমাজে মহিলা ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা নেহাত সহজ কাজ ছিল না। যেদিন ব্যাঙ্কে লোনের জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলাম, ব্যাঙ্ক ম্যানেজারটি বাঁকা হাসি হেসে পুরুষালি গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ‘এই বয়সে ট্র্যাক বদলাবেন না মিসেস খান। তার চেয়ে বরং এটাকে একটা হবির মতোই পাশে রাখুন। আমাদেরও একদিন ডাকুন না আপনার বাড়িতে চায়ের আড্ডায়...।’ অপমানে চোখে জল এসেছিল। কিন্তু ওঁর কটাক্ষই আমার শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।’ নিজের এই দ্বিতীয় ইনিংসটিকে সফল করার শপথ নিয়েছিলেন আসমা। তা তিনি সম্পূর্ণ করেছেন। বিদেশের মাটিতে ভারতীয় রেস্তরাঁ চালিয়ে যেদিন স্বয়ং রাজামশাইকে খাওয়ানোর বরাত মিলল সেদিন বাঁধনছাড়া আনন্দ হয়েছিল। এই সাফল্য এসেছিল আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে। কিং চার্লস বিরিয়ানি ভালোবাসেন। সেই মতো তাঁর মেনুতে বিরিয়ানি ছিলই। সঙ্গে কষা মাংস, চিংড়ির মালাইকারির মতো কিছু ভারতীয় পদও পরিবেশন করেছিলেন আসমা। আর ছিল মোমো। ওটা চার্লসের ‘কমফোর্ট ফুড’। শেষপাতে ছিল শাহী টুকরা ও ভাপা দই।
নারীবাদ ও নারী ক্ষমতায়ন
আসমার কথায়, ‘নারীবাদকে জ্বালাময়ী বক্তৃতা, বা তত্ত্বকথায় সীমাবদ্ধ রাখলে তার কোনও গুরুত্ব নেই। বরং তা যখন মহিলাদের জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, তখনই তার গুরুত্ব বাড়ে। মহিলা হিসেবে আমাদের সবার উচিত সমাজের বিভিন্ন স্তরে গিয়ে কাজ করা। সেখানকার মহিলাদের সমস্যাগুলো শোনা, বোঝা এবং সেইমতো তাদের সমাজে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। একাধারে অনেকের জন্য হয়তো একজন কিছু করতে পারবেন না, কিন্তু নিজের মতো করে যদি শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মহিলারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলেই একমাত্র নারীবাদ সম্পূর্ণ মর্যাদা পাবে। নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে।’ এই লক্ষ্যেই নিজের মহিলা চালিত কিচেন শুরু করেন আসমা। নারী ক্ষমতায়নকে নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। মহিলা হিসেবে নারীকে স্বনির্ভর ও সচেতন করে তোলাই তাঁর জীবনের ধর্ম। মহিলাদের প্রতিবাদ করতে শেখানো, নিজের মনের কথা নির্ভয়ে বলার সুযোগ দেওয়াই নারী ক্ষমতায়ন। নিজের মতো করে সেই কাজটাই করতে চান আসমা।
কমলিনী চক্রবর্তী