Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

বেসিনের গা ছমছমে দুর্গ

সেই কবে কোন এক ইতিহাসের বইতে পড়েছিলাম বেসিনের গা ছমছম করা পরিত্যক্ত দুর্গের কথা। সাড়া জাগিয়ে ছিল মনে। কেন এই দুর্গ পরিত্যক্ত, আছেই বা কোথায়? অনেকদিন অতিক্রান্ত হয়েছে।

বেসিনের গা ছমছমে দুর্গ
  • ৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সেই কবে কোন এক ইতিহাসের বইতে পড়েছিলাম বেসিনের গা ছমছম করা পরিত্যক্ত দুর্গের কথা। সাড়া জাগিয়ে ছিল মনে। কেন এই দুর্গ পরিত্যক্ত, আছেই বা কোথায়? অনেকদিন অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই পরিত্যক্ত দুর্গের কথা ভুলতেই বসেছিলাম প্রায়। অফিসের কাজে কয়েকবার মুম্বই যেতে হয়েছিল। যত দূর মনে পড়ে মুম্বইয়ের আশপাশে এই পরিত্যক্ত পর্তুগিজ দুর্গটির অবস্থান। প্রতিবার ঠিক করি, কিন্তু সময় সুযোগ হয়ে ওঠে না। কাজের তাড়া থাকে। কাজ শেষ হলে বাড়ি ফেরার তাড়া। তাই বেসিনের দুর্গ আর দেখা হয় না কোনওবারই। শেষবার যখন এলাম, কাজ শেষ করার পর ট্রেনে ফেরার রিজার্ভেশন আগামী তিনদিনের আগে পেলাম না। সুতরাং হাতে তিনটে দিন সময় রয়েছে। হোটেলে বসে থাকার চেয়ে বেসিনের দুর্গ খুঁজে বের করার ইচ্ছে আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নভেম্বরের শুরু। মেঘমুক্ত মুম্বই। প্রকৃতি আলো ঝলমলে। ঠান্ডা এখানে তেমন পড়ে না, তবে পরিবেশ ভারী উপভোগ্য। আমার হোটেলের অবস্থান চার্চগেট স্টেশনের অদূরেই। প্রথমে ভাবলাম মুম্বই ছত্রপতি শিবাজি রেল টার্মিনাস যাব। নানা লোককে জিজ্ঞেস করে নিশানা পাই না। অটোয় করে উপস্থিত হই চার্চগেট স্টেশনে। সামনে একটা রেস্তরাঁ, কিছু খেয়ে নিয়ে বাইরে এসে ফের জিজ্ঞেস করি, দোকানের বৃদ্ধ খানিকক্ষণ কী যেন ভেবে জবাব দেন— ‘আপ যাইয়ে ভাসাই স্টেশন। উঁহাসে অটো, প্রাইভেট ট্যাক্সি মিলেগা। স্রেফ দশ কিলোমিটার দূর হ্যায় বাসান ফোর্ট।’ ধন্যবাদ জানিয়ে ভাসাইগামী লোকাল ট্রেনের টিকিট কাটলাম। চার্চগেট থেকে ভাসাইয়ের দূরত্ব সত্তর কিলোমিটার। মুম্বইতে লোকাল ট্রেন দু’ধরনের, ফাস্ট ট্রেন আর স্লো ট্রেন। ফাস্ট ট্রেনের সামনে গিয়ে জানতে পারলাম এই ট্রেনই ভাসাই যাবে। মুম্বইতে প্রধান পরিবহণ লোকাল ট্রেন। তাতে সবসময় বাদুড়ঝোলা ভিড় থাকে। আমার ভাগ্য ভালো বসার জায়গা পেলাম জানালার ধারেই।
দশ মিনিট পরে ট্রেন ছেড়ে দেয়। মুম্বইয়ের দৃশ্য বড় অদ্ভুত। চারদিকে পাহাড়, নদীর খাঁড়ি, আরব সাগরের তীরে আকাশছোঁয়া কংক্রিট আর কারখানা। গতি নিয়েছে ট্রেন। কংক্রিটের জঙ্গল ফাঁকা হয়ে সবুজ দেখা যাচ্ছে। লোকাল ট্রেনের মাইক্রোফোনে ভাসাই রোডের নাম বললে নেমে পড়ি। ছোট স্টেশন। অজস্র অটো দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কিছু ট্যাক্সিও চোখে পড়ল। এক অটো ড্রাইভারের সঙ্গে চুক্তি হল ফোর্ট ঘুরিয়ে নিয়ে এসে স্টেশনে ছেড়ে দেবে। দ্রুত অটো চলেছে হাইওয়ে দিয়ে। রাস্তার ধারে জলাজমি কোথাও সাদা ঢিবির মতো— কৌতূহল সামলাতে না পেরে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি, সে বলে সমুদ্রের জল শুকিয়ে নুন তৈরি হচ্ছে। গাড়ি বড় রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকে সরু রাস্তায় প্রবেশ করে। কিছু দূর এগতেই দেখা যায় ভাঙা ভাঙা পাঁচিল। নোনাধরা পাঁচিলে বিস্তর খেজুর গাছ গজিয়েছে। কোথাও ঘন গভীর বট অশ্বত্থের ঝুরি নেমেছে। দু’-একটা ভাঙা চার্চ দেখতে পাই। কয়েকবার বাঁক নিয়ে সেই দীর্ঘ পাঁচিলের সামনে উপস্থিত হই। চারিদিকে উলুখাগড়ার বন, বিস্তর খেজুর আর বাবলার ঝোপ আর তার মাঝখানে বিরাট দুর্গ। সামনে বিরাট ফটক। পর্তুগিজ স্থাপত্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। নোনা ধরা ইটের পাঁচিলের ডানদিকে খানিকটা খোলা অংশ। সেইখান দিয়ে কোনওরকমে একজন যেতে পারে। আমি ও অটোওয়ালা ফুয়েদ আলি স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারময় গলি পেরিয়ে যাই। হঠাৎ একঝাঁক বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শুনতে পাই। চমকে উঠে দেখি, চার পাঁচটা বাদুড় এই অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে জায়গা দিয়ে উড়ছে। ফুয়েদ আমাকে বলতে আরম্ভ করে বাণিজ্য করতে এসে গোয়া যাওয়ার আগে, ১৫৩০ সাল নাগাদ এখানে ভাসাইয়ের কাছে থাকতে আরম্ভ করে পর্তুগিজরা। সেই সময়ের কিছু আগে গুজরাতের রাজা বাহাদুর শাহ এখানে একটা অস্থায়ী কেল্লা তৈরি করেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে পর্তুগিজরা তা দখল করে নিয়ে এখানে একটি স্থায়ী দুর্গ তৈরি করে। তৈরি হয় পরিখা, বন্দুক রাখার জন্য অস্ত্রাগার, দীর্ঘ দেওয়াল আর পর্তুগিজ স্থাপত্যে তৈরি ফটক। বটগাছের ঝুরি নেমেছে, অন্ধকার চারদিক। দিনের ঝলমলে আলোর বিন্দুমাত্র নেই। কোনও আওয়াজ নেই, শুধু গলি পার হচ্ছি। সামান্য মোবাইলের টর্চ ব্যবহার করতে হচ্ছে। হঠাৎ বাঁকের মুখে কুয়াশায় চারদিক দেখা যায় না। এবার ভয় পেয়ে যাই। অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে গলির মাঝে পথের ঠিকানা খুঁজে পাই না। ভয়ে এক গলি থেকে আর এক গলি পেরই। হঠাৎ মনে হয় কে যেন কাঁধের উপর হাত রাখল! মনে হয়, ভয়ে জ্ঞান হারাব। শুনি ফুয়েদ বলে, ‘ডরিয়ে নেহি। এইখানে মারাঠি যোদ্ধা চিমাজি আপ্পানের সঙ্গে টানা দু’সপ্তাহ যুদ্ধ চলেছিল। মারা গিয়েছিল দু’-পক্ষের অজস্র সৈন্য। তাদের নীরব কান্না এই অতৃপ্ত পাথরের আশপাশে সন্ধ্যার পর এখনও শোনা যায়।’ ফুয়েদ জানায়, হাত পা কাটা ভীষণ আহত সৈনিকরা কোনও চিকিৎসা, এমনকী জল পর্যন্ত পায়নি। তাই অভিশপ্ত এই দুর্গ। সামনে এক বিরাট চাতাল। সেখানে থেকে খানিকটা আকাশ দেখা যাচ্ছে, হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেল এই দুর্গে এসেছি। বেরবার কোনও পথ দেখতে পাই না। সঙ্গের অটো ড্রাইভার ফুয়েদ আলিকে কয়েকবার বলেছি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে। ওর হাবভাব একটুও ভালো লাগছে না। দুর্গ থেকে বেরতে চাইছে না কেন! বারবার ভয়ে কাঁটা হয়ে যাই। সরু গলি থেকে বড় একটা হলঘরে প্রবেশ করলাম। দেওয়ালের স্থাপত্য দেখার মতো। কিন্তু অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো। দেওয়ালের ফাটলের পাশ দিয়ে আকাশের আলো এসে পড়ে। সেই আলোয় ভয়ঙ্কর সুন্দর স্থাপত্য দেখতে পাই। ভয়ে অসুস্থ লাগছে। গলা শুকিয়ে কাঠ, বড় জল তেষ্টা পেয়েছে। সামনের ঘরে প্রবেশ করে প্রায় মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা। কয়েকশো চামচিকের কানফাটা আওয়াজে ভয়ে সিঁটিয়ে যাই। পরে বুঝতে পারি চামচিকের দল ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাঙাচোরা ঘরে ফুয়েদকে অনুসরণ করে এগতে গিয়ে আঁতকে উঠি। পাশের ভাঙা থামটার গা বেয়ে নেমে আসছে বাদামি রঙের রোমওঠা বিরাট এক মাকড়সা। গা গুলিয়ে যায়। মনে মনে ভাবি, একেই কি ট্যারেন্টুলা মাকড়সা বলে? এক ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম পরিত্যক্ত কবরে, ভাঙা পোড়োবাড়িতে, দুর্গের ফাটলে এই মাকড়সা দেখা যায়। প্রধানত পচা মাংস, ফার্ন, শ্যাওলা খেয়ে বাঁচে। ডিম ফুটে বাচ্চা হলে স্ত্রী ট্যারেন্টুলা নিজেই অধিকাংশ বাচ্চা খেয়ে নেয়। এর সামান্য কামড়ে মানুষের শরীরে পচন অবধারিত। পরিণতি মৃত্যু। ফুয়েদের হাত চেপে ধরি। বলি, ‘ফুয়েদ চলো বাহার চলা যায়। ডর লাগতা হ্যায়।’ ফুয়েদ বলে, ‘চলো মেরে সাথ।’ 
ভাগ্য ভালো কিছু দূর গিয়ে আরব সাগরের কূল দেখতে পেলাম। আকাশ দেখতে পেলাম। কেন ফুয়েদ এই ধরনের আচরণ করল তা আমার কাছে বিস্ময়ের। সামনে সমুদ্রের তট, সানন্দা বিচ নামে পরিচিত। মহারাস্ট্র সরকার এই বিচটিকে সাজানোর চেষ্টা করছে। অটোয় উঠে পড়ি। স্টেশনের দিকে এগতে থাকে অটো। 

Advertisement

সোমনাথ মজুমদার

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ