সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: দোষী সাব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। শুধুমাত্র এমন অভিযোগে গ্রেপ্তার করতে হবে, যে অপরাধের শাস্তি কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাবাস। আর তারপর মাত্র ৩০ দিন জেল হেফাজতে থাকলেই সরিয়ে দেওয়া যাবে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, এমনকী কেন্দ্র-রাজ্যের যে কোনও মন্ত্রীকে। এমনই নিদান দিতে তিনটি সংবিধান সংশোধন বিল নিয়ে এসেছে মোদি সরকার। আর তা ঘিরেই বুধবার ধুন্ধুমার বাধল লোকসভায়। সোচ্চার বিরোধীদের নেতৃত্ব দিলেন তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘ড্যাক্রোনিয়ন বিল ওয়াপস লো...’, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলল তৃণমূল এমপি ব্রিগেড। যোগ দিলেন কংগ্রেস, সপা, ডিএমকে সাংসদরাও। বিলের প্রতিলিপি ছিঁড়ে অমিত শাহের দিকে ছুড়ে দিলেন মহুয়া মৈত্র। তাতেই যেন দপ করে লেগে গেল আগুন! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রক্ষা করতে ছুটে গেলেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, রেল রাষ্ট্রমন্ত্রী রভনীত সিং বিট্টু সহ বিজেপি সাংসদরা। প্রায় হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। শেষপর্যন্ত তিনটি বিলকেই অবশ্য পাঠানো হয়েছে যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে।
এদিন সকাল থেকে উত্তাপ বাড়ছিল সংসদে। কারণ, আগাম কোনও আভাস না দিয়েই মঙ্গলবার অনেক রাতে ‘এমপি পোর্টালে’ আপলোড করা হয় বিতর্কিত তিন বিল—১৩০তম সংবিধান সংশোধনী, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকার (সংশোধনী) এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন (সংশোধনী) বিল। তাই রাত গড়াতেই প্রতিবাদের পারদ চড়াতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন বিরোধী সাংসদরা। তারই পরিণতি লোকসভার ওয়েলে বচসা। স্পিকারের ডায়াস থেকে দৌড়ে এসেও দু’পক্ষকে সামলাতে পারেননি মার্শাল। সরকার পক্ষের অভিযোগ, তৃণমূল অমিত শাহকে মারতে উদ্যত হয়েছিল। যদিও তৃণমূলের পাল্টা দাবি, এমন কিছুই ঘটেনি। বরং তাদের দুই মহিলা সাংসদ শতাব্দী রায়, মিতালি বাগকে ধাক্কা দিয়েছেন দুই মন্ত্রী রিজিজু এবং বিট্টু। মিতালি বলেন, ‘বাঁ হাতের কব্জিতে প্রবল আঘাত পেয়েছি।’ আজ, বৃহস্পতিবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে এব্যাপারে লিখিত অভিযোগও জমা দেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।
এদিন সকাল ১১টায় লোকসভা অধিবেশন বসে। কিন্তু প্রবল হট্টগোলে দু’মিনিটেই সভা মুলতুবি করে দিতে বাধ্য হন স্পিকার। ১২টায় অধিবেশন বসলেও ১৬ মিনিটের মাথায় ফের মুলতুবি। ওই সময়টুকুতেই পেশ হল অনলাইন গেমিং সংক্রান্ত বিল। দুপুর ২টোয় সভা শুরু হতে হাজির হন অমিত শাহ। তাঁকে দেখেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিরোধী এমপিরা। আসাদউদ্দিন ওয়েইসি, মণীশ তিওয়ারি, কে সি বেণুগোপাল, এম কে প্রেমচন্দ্রনরা সাফ জানান, এই বিল অসাংবিধানিক। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। গণতান্ত্রিক দেশটাকে ক্রমশ পুলিস স্টেটে পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে। এই বিল আইনে পরিণত হলে রাজনৈতিক অপব্যবহার হবে। অমিত শাহ গুজরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় জেলে গিয়েছিলেন, সেসব কি ভুলে গিয়েছেন? এই প্রশ্ন উঠতেই দৃশ্যত ক্ষিপ্ত দেখায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। পাল্টা বলেন, ‘নৈতিকতার কথা মাথায় রেখে মন্ত্রিপদে আগেই ইস্তফা দিয়েছিলাম। তারপর জেলে গিয়েছি। পদ ধরে রাখার মতো নির্লজ্জ নই।’
এরপর অমিত শাহ বিল পেশের চেষ্টা করতেই শুরু হয়ে যায় হট্টগোল। কাগজ ছোড়ার ঘটনার পর তড়িঘড়ি সভা মুলতুবি করে দেন স্পিকার। বেলা তিনটেয় সভা বসল বটে। তবে প্রথম সারিতে নয়, শাহ বসলেন চার নম্বর সারিতে। মাত্র ছ’মিনিটে পেশ করলেন তিন বিল। জানিয়ে দিলেন, এগুলি পাঠানো হচ্ছে যৌথ সংসদীয় কমিটিতে। ৩১ সদস্যের কমিটি শীত অধিবেশনের শেষ সপ্তাহের প্রথম দিন রিপোর্ট জমা দেবে। বিরোধীরাও ছুড়ল চ্যালেঞ্জ, বিজেপির ২৪০ সাংসদের সংখ্যালঘু সরকারকে এই সংবিধান বিল পাশ করাতে দেব না।